ওই যে তখন ফোনে বললেন, বউদি ঠিকই বলে!
বলেছি? ও হ্যাঁ। কিন্তু সে তো বলা যাবে না।
কেন বলা যাবে না?
কথাটা টপ সিক্রেট।
আমি শুনতে চাই।
কেন শুনতে চান?
নাই যদি বলবেন তবে বউদির রেফারেন্স দিলেন কেন?
সাধারণ মেয়েদের গোপন কথা শোনার অনভিপ্রেত কৌতূহল থাকে। কিন্তু আপনি তো সাধারণ
নন।
মণিদীপা একটা কাচের পেপারওয়েট গ্লাসটপ টেবিলের ওপর কাত করে গড়িয়ে দেয়। ধরে। আবার গড়িয়ে দিয়ে একটু খেলা করে। গোমড়া মুখে বলে, কারও আড়ালে তাকে নিয়ে আলোচনা করাটাও তো উচিত নয়।
যারা আলোচনার যোগ্য তাদের নিয়েই আলোচনা হয়। সাধারণ মানুষকে নিয়ে কে আলোচনা করে বলুন!
উঃ। বলুন না বউদি কী বলেছেন।
দীপনাথ টেবিলের ড্রয়ার খুলে টাকাটা একটা লম্বা খামে ভরে এগিয়ে দেয়। বলে, নিন।
নেব না। আগে বলুন।
দীপনাথ মৃদু হেসে বলে, বউদি বলেছে, তোমার বসের বউয়ের মাথায় একটু ছিট আছে, ঠাকুরপো।
মোটেই না। আপনার বউদি আপনাকে ঠাকুরপো বলে ডাকেন না, নাম ধরে ডাকেন।
এতও মনে রেখেছেন।
মেয়েরা রাখে।
আপনি কি মেয়ে?
তবে কী?
না, না, ঠিক তা বলিনি।–দীপনাথ হেসে ফেলে বলে, আমি বলছিলাম, আপনি তো সাধারণ মেয়ে নন। ওসব খুঁটিনাটি লক্ষ করে অতি সাধারণ মেয়েরা, যাদের আই কিউ ভীষণ লো।
বারবার আমাকে অসাধারণ বলছেন কেন? আমি কিছু অসাধারণ নই।
আপনি মনে-প্রাণে প্রোলেতারিয়েত তা জানি। কিন্তু ঈশ্বর তো সবাইকে সমান গুণ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি। ওরকম অ্যান্টিকমিউনিস্ট দুনিয়ায় দুটো হয় না। আর বোধ হয় তাই কমিউনিস্টরাও অ্যান্টিগড।
কমিউনিস্টরা অ্যান্টিগড নয়। অ্যান্টিগড হচ্ছে ডেভিল। আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসই করি না, তাই তার অ্যান্টিও হতে পারি না। ঈশ্বরের বিরুদ্ধতা করতে গেলেও তার অস্তিত্ব মানতে হয়।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। বুঝেছি। দীপনাথ হাত তুলে বলে, কিন্তু এটা তো মানবেন দুনিয়ার সবাই সমান নয়। সাধারণ আছে, অসাধারণ আছে।
মানি। কমিউনিস্টরা তো গাধা নয়।
আমি সেইটিই বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম আপনাকে।
ঠিক করে বলুন তো, বউদি কী বলেছেন!
আমার বউদি অতি সাধারণ। তিনি তার মতো করে বলেছেন, ওসব আপনার শুনে কাজ নেই।
মণিদীপা মাথা নেড়ে বলে, আপনার বউদি খুব কমন মহিলা নন। শি নোজ হোয়াট ইজ হোয়াট।
দীপনাথ বিজ্ঞের মতো হেসে বলে, তা হলে বলছেন বউদি যা বলেছে তা সত্যি?
না জেনে বলি কী করে?
অ্যাসাম্পশন থেকে! বউদি নোজ হোয়াট ইজ হোয়াট!
মণিদীপা ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে বলো, মে বি। আগে তো শুনি।
টাকাটা নিন।
আগে বলুন।
বড় জ্বালাচ্ছেন তো! বউদি কিছু বলেনি। আমি আপনাকে টিজ করছিলাম।
মণিদীপা গাঢ় তীক্ষ্ণ চোখে দীপনাথের দিকে সরাসরি চেয়ে থাকে একটুক্ষণ। তারপর ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে এক প্যাকেট দামি বিদেশি সিগারেট আর একটা লাইটার বের করে। সিগারেট ধরিয়ে রাজস্থানি পোশাকের কোমরে একটা ডোরে বাঁধা দুটো চাকতি আয়নার একটা তুলে নিজের মুখটা মন দিয়ে দেখে।
দীপনাথ সামান্য অবাক হয়। মণিদীপাকে সে সিগারেট খেতে আগে দেখেনি। কী বলবে তা ভেবে না পেয়ে একটু চুপ করে থাকে সে। তারপর বলে, এটা কবে থেকে ধরলেন?
অবান্তর প্রশ্ন।
মেয়েদের সিগারেট খেতে দেখলে আমার রিঅ্যাকশন হয়।
আমি মদও খাই।
ভাল করেন না।
বেশ করি।
বউদি ঠিক বলে।
মণিদীপ জ্বালাতন হয়ে চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকে একটুক্ষণ। তারপর বলে, ইয়ারকি হচ্ছে? আজ আমার কিন্তু ইয়ারকির মুড নেই।
বসের বউ ইয়ারকির পাত্রী নয়। ইয়ারকি করছি না।
আমি কারও বউ-টউ নই। বউদি কী বলেন?
বউদি বলেন—
বলে দীপনাথ একটু থামে। তারপর আচমকা বলে, বলব। ঠিকই বলব। তার আগে সিগারেটটা ফেলে দিন।
মণিদীপা প্রায় আস্ত সিগারেটটা মেঝেয় ফেলে স্যান্ডালে পিষে দিল। যেন সিগারেটটা ফেলে দেওয়ার একটা ছুতো সে নিজেও খুঁজছিল।
এবারে বলুন।
বলছি, বলছি। আর-একটা কথা।
কী?
প্রমিস করতে হবে, মদও খাবেন না।
মণিদীপা তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে, আমাকে কী পেয়েছেন বলুন তো! অ্যানাদার স্লেভ লাইক ইউ?
ভালবাসা জিনিসটা তো স্লেভারি। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আপনি আমার না হলেও নিশ্চয়ই আর-কারও স্লেভ।
অনেক জানেন তো! বলুন তবে কার?
ধরুন স্নিগ্ধদেব!
স্নিগ্ধদেবের কথায় হঠাৎ মণিদীপা নাক কোঁচকায়। তারপর কয়েকটা ঘন শ্বাস ছেড়ে বলে, স্নিগ্ধর কথা আমি ভুলে যেতে চাই। ও নামটা আর আমার সামনে প্লিজ উচ্চারণ করবেন না।
বিস্মিত দীপনাথ বলে, সে কী? স্নিগ্ধদেব কী করলেন হঠাৎ?
হি ইজ নাউ এ ফলেন গাই।
তার মানে?
বিশ্বাস করবেন? স্নিগ্ধদেব আমেরিকায় যাচ্ছে!
দীপনাথ ব্যাপারটা ধরতে পারল না। বলল, তাতে কী?
তাতে কিছুনয় বুঝি? আমেরিকান গভর্নমেন্টের টাকায় তাদের স্কলারশিপ নিয়ে ও চলে যাচ্ছে। মুখে বলছে, ওখানে গিয়ে মার্কিন ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট নিয়ে রিসার্চ করবে। কিন্তু আমি জানি, তা নয়।
আপনি কী জানেন?
আমি জানি, হি হ্যাজ অ্যাবানডনড দি রিভলিউশন। ও যাচ্ছে সুখে থাকবে বলে।
কী করে বুঝলেন?
স্নিগ্ধদেবকে আমি যত গভীরভাবে বুঝি আর-কেউ তা বোঝে না। হি হ্যাজ এ চামিং পার্সোনালিটি। সবাইকে হিপনোটাইজ করে রাখতে পারে। এ বর্ন-লিডার। আমেরিকান এজেন্টরা ওকে সেই কারণেই পিকআপ করেছে।
সি আই এ?
মে বি। কিন্তু ও এখন সম্পূর্ণ ওদের ট্র্যাপে।
বুদ্ধিমান লোকেরা সহজে ট্র্যাপে পড়ে না মিসেস বোস।
