অজুহাতের দরকার ছিল না। দীপ সবই জানে। এও জানে লাবু হচ্ছে প্রীতমের প্রাণের প্রাণ। সেই লাবু পাশের ঘরে মার খেয়ে কাদছে এটা শরীর বা মন দিয়ে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না প্রীতম। কিন্তু এই একটা জায়গা ছাড়া প্রীতমেব আশ্চর্য সহনশীলতার কোনও তুলনা নেই। নিজের বোন হলেও বিলুকে কোনওদিন তেমন পছন্দ করে না দীপ। ওর ধৈর্য বলতে কিছু নেই, অল্প কারণেই ভয়ংকর রেগে যায়, তাছাড়া অলস, অগোছালো এবং বেশ কিছুটা স্বার্থপর। অরুণের সঙ্গে ও বহুকাল ধরে একটা ব্যাখ্যাহীন রহস্যময় সম্পর্ক রেখে চলেছে। এসব মিলিয়ে প্রীতমের বিবাহিত জীবনটা খুব সুখের নয় নিশ্চয়ই। তবু প্রীতমকে কদাচিৎ দুঃখিত বা বিষণ্ণ দেখেছে দাপ।
বিলু ঘরে নেই, তাই ফাঁক বুঝে দীপ চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করে, শিলিগুড়িতে যাবি প্রীতম?
প্রীতম উদাস চোখে তাকিয়ে বলে, গিয়ে কী হবে?
তোর ইচ্ছে করে না যেতে?
আগে করত। এখন হচ্ছে-টিচ্ছে কিছু নেই।
বিলু বলে, কলকাতা ছাড়া চিকিৎসা ভাল হবে না।
আমি আসার আগে শতমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
ও।
বলে চুপ করে থাকে প্রীতম। দীপের কথায় ওর মন নেই। পরদার ওপাশ থেকে এখনও লাবুর হেঁচকি তোলার শব্দ আসছে। কান খাড়া করে সেই শব্দ শুনছে প্রীতম। যেন কিছুক্ষণ চুপ করে শুনে প্রীতম আস্তে করে বলা, আমি যে ভাল হয়ে উঠব এটা ওরা বিশ্বাস করে না।
কারা?-দীপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
আমার বাড়ির সবাই। ওদের ধারণা আমি শিগগিরই মরে যাব। তাই আমাকে শিলিগুড়িতে নিয়ে যেতে চায়। বিলুকে এরকম ধরনের চিঠিও লিখেছিল বাবা। আবার তুমিও শিলিগুড়ি যাওয়ার কথা বলছ!
দীপ একটু মুশকিলে সড়ে গিয়ে বলে, দুব বোকা! তোর অসুখ সাববে না বলে শিলিগুড়ি য, ওয়ার কথা বলেছি নাকি? আসলে ওখানকার জলহাওয়া তো ভাল, আত্মীয়স্বজনদের কাছে মনটা ভাল থাকে।
খুব যে অভিমনিভরে মাছ না শ্রী তম বলে, ওসব কথার কথা। আসলে তোমরা বিশ্বাসই করে না যে, আমি আর বেশিদিন বাঁচব।
প্রীতমকে এ ধরনের কথা কোনওদিন বলতে শোনেনি দীপ। তাই অবাক হয়ে কী বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকে। বিলু নিঃশব্দে ঘরে এসে দীপের হাতে এক কাপ চা দিয়ে চলে যায়।
ধীরে ধীরে প্রীতম শুয়ে চোখ বুজল।
দীপ চায়ে চুমুক দিয়েই হরিণঘাটার স্ট্যান্ডার্ড দুধের বোটকা গন্ধ পায় এবং মুখ বিকৃত করে। সে প্রাণপণে প্রীতমের অসহায়তা, তার রোগভোগের যন্ত্রণা, মৃত্যুচিন্তা এবং বেঁচে থাকার ইচ্ছের অহর্নিশ লড়াই, লাবুর প্রতি তার প্রগাঢ় ভালবাসা ইত্যাদি বুঝবার চেষ্টা করতে থাকে। ভাবতে গেলে প্রীতমের সমস্যার শেষ নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, মরবার আগে প্রীতম কিছুতেই নিশ্চিন্তে জেনে যেতে পারবে না যে, বিলু শেষ পর্যন্ত বিধবা থাকবে, না কি অরুণকে বিয়ে করে বসবে। যদি তাই হয় তবে লাবুর দশা কী হবে! ভেবেচিন্তে প্রীতমের জন্য এক বুক দুঃখ উথলে উঠছিল দীপের। তাই সে চায়ে দুধের বোঁটকা গন্ধটা আর তেমন টের পেল না।
পরদা সরিয়ে মেয়ে কোলে বেরিয়ে এসে বিলু বলল, তুমি একটু বোসো মেজদা। আমি পাশের ফ্ল্যাট থেকে ঘুরে আসছি।
বিলু চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ বাদে প্রীতম চোখ খুলে বলে, মেজদা, আমি খুব বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।
দীপ আত্মবিশ্বাসহীন গলায় বলে, তুই বাঁচবি নাই বা কেন?
খুব কষ্টে প্রীতম উঠে বালিশে ঠেস দিয়ে বসে। বলে, এগুলো খুব বাজে ব্যাপার। এই অসুখ-টসুখ মোটেই ভাল জিনিস নয়। মন দুর্বল হয়ে যায়, মাথার ঠিক থাকে না। এই সময়ে তোমরা আমার কাছে এসে এমন কোনও কথা বোলো না যাতে মরবার কথা মনে হয়। আমি দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টা বেঁচে থাকার চিন্তা করি। কাজটা সোজা নয়, তবু করি।
দীপ একটা ঢোক গিলে বলে, আমি তোর অনেক ইমপ্রুভমেন্ট দেখছি প্রীতম।
প্রীতম বড় বড় চোখে চেয়ে বলে, ইচ্ছাশক্তিকে খুব কম জিনিস বলে মনে কোরো না। উইল পাওয়ার অনেক অঘটন ঘটাতে পারে।
নিশ্চয়ই।—দীপ তেমনি আস্থাহীন গলায় বলে।
আমি কখনও কাউকে বলিনি যে, আমি মরে গেলে লাবু আর বিলুকে দেখো। কেন বলব? ওসব তো হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা! আমার তো মনে হয় না কখনও যে, আমি মরে যাব!
সে কথা কেউই ভাবছে না। তুই অকারণে সবাইকে সন্দেহ করিস।
তবে বাড়ির লোক আমাকে শিলিগুড়ি নিয়ে যেতে চায় কেন? ওরা কি জানে না, সেখানে কলকাতার মতো চিকিৎসা হবে না?
এ কথাটা প্রীতম খুব আস্তে করে গাঢ় স্বরে বলল। কোনও রাগ বা অভিমান নিয়ে নয়। নিষ্পলক কয়েক সেকেন্ড দীপের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ কয়েক পরদা নিচু স্বরে বলে, শোনো মেজদা, আমি শিলিগুড়ি গেলেও বিলু কিছুতেই যাবে না। শ্বশুরবাড়ির কাউকেই ও দু’চোখে দেখতে পারে না। জানো তো?
জানি।
কিন্তু আমি বিলুকে কলকাতায় একা রেখে যেতে ভয় পাই।
দীপু জুয়াড়ির মতো মুখের ভাব ঢেকে রাখার চেষ্টা করে বলে, কেন?
কেন তা আর বলল না প্রীতম। সামান্য একটু বিচিত্র সুন্দর হাসি হাসল মাত্র। দীপ জানে, মরে গেলেও কথাটা আর প্রীতমের মুখ দিয়ে বেরোবে না। ও কেবল সুন্দর করে হাসবে।
দীপ তাই চাপাচাপি না করে বলল, ইচ্ছে না হলে যাবি না। কেউ তো জোর করছে না!
তা ঠিক। তবে জোর করছে আমার ভিতরের একটা ইচ্ছে। মাঝে মাঝে আমি ডানপাশের ওই জানালাটা দিয়ে শিলিগুড়ির পাহাড় দেখতে পাই। প্রায় ডাকঘরের অমলের অবস্থা। কিন্তু জানি শিলিগুড়িতে গেলে আমি আর বাঁচব না। চিকিৎসার অভাবে নয়, শিলিগুড়িতে গেলেই আমার মন নরম হয়ে গলে যাবে, ইচ্ছার শক্তি যাবে কমে।
