একদিক দিয়ে বিচার করলে এটা তো রং নাম্বারই, মিসেস বোস।
তার মানে?
সেদিন বৃষ্টিতে বাগবাজারে আটকে পড়ে আপনার ফোন করা উচিত ছিল মিস্টার বোসকে। আপনি তা না করে একটা রং নাম্বারে ডায়াল করেছিলেন। মনে আছে?
মণিদীপা একটু সময় নেয়। এত সময় নেয় যে, দীপনাথের একবার সন্দেহ হয় লাইনটা কেটে গেছে। মণিদীপা অবশ্য লাইন ছাড়েনি। খানিক বাদে একটু গম্ভীর গলায় বলে, আপনি মাইন্ড করবেন জানলে আপনাকে ফোন করতাম না।
মাইন্ড করিনি। বরং আনন্দে শিহরিত হয়েছিলাম। তবু সেটা কিন্তু রং নাম্বার।
আমি রং নাম্বার বলে ভাবি না। ভাবলে এত সহজে আপনার কাছে আজ টাকার কথা বলতে পারতাম না।
একটা কপট শ্বাস ছেড়ে দীপনাথ বলল, আমার মেজোবউদি ঠিকই বলে।
কী বলে?
সে আপনাকে বলা যাবে না।
মেজোবউদি মানে রতনপুরের সেই বউদি?
হ্যাঁ। এই সেদিনও মেজোবউদি বলছিল—
থামলেন কেন?
থামাই ভাল। সে বলা যায় না।
তবু শুনি!
কী শুনবেন? শোনার মতো নয়। টাকাটা রেডি রাখছি, এলেই পেয়ে যাবেন।
শুনুন। টাকাটা যখন পাওয়া যাচ্ছেই তখন মেক ইট এ থাউজ্যান্ড।
আপনার সঙ্গে ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলা দেখছি বিপজ্জনক।
কেন?
আর পাঁচ মিনিট পরে তো আরও পাঁচশো টাকা বাড়িয়ে দেবেন।
খুব অসুবিধে হবে নাকি?—গলাটা একটু করুণ শোনায় মণিদীপার। বলে, বোস কবে ফিরবে কিছুই বলে যায়নি। অথচ আমাকে তো এস্টাব্লিশমেন্টটা চালাতে হবে!
এস্টাব্লিশমেন্ট যে মণিদীপা চালায় না তা দীপনাথ ভালই জানে। তবুবুঝদারের মতো ভালমানুষি গলায় বলল, অলরাইট। ইট উইল বি এ থাউজ্যান্ড।
ছাড়ছি তা হলে?
ঠিক আছে।
ফোন রেখে দীপনাথ ওঠে। বুড়ো অ্যাকাউন্ট্যান্ট অবনীবাবুর টেবিলে গিয়ে বোস সাহেবের পে-অর্ডারগুলো উলটে-পালটে দেখে। পৃথিবীতে উচ্চতম হারে ট্যাক্স কেটে নেওয়া হয় একমাত্র ভারতবর্ষেই। তা ছাড়া অফিস থেকে বোস সাহেবের প্রচুর টাকা অ্যাডভান্স নেওয়া আছে। সেইসব বকেয়া কর এবং অ্যাডভান্স কেটে নেওয়ার পরও বোস সাহেবের অ্যাকাউন্টে বড় কম জমা হয় না। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে টেবিলে ফিরে এসে বোস সাহেবের ব্যক্তিগত আয়করের রিটার্ন যে জমা দেয় সেই মিত্রকে ফোন করল। আর-একটু কুঁচকে গেল তার।
খুব কম করেও জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে হাজার দশেক টাকা থাকার কথা। মাস এখনও শেষ হয়নি। দীপনাথ ক্ষান্ত হল না। ফোন করল ব্যাংকে। দীপনাথের খুবই পরিচিত ব্যাংক। বোস সাহেবের হরেক চেক বহুবার জমা দিতে এসেছে। কাজেই সে অনায়াসে জেনে নিতে পারল, বোস সাহেব দিল্লি যাওয়ার পর মণিদীপা কম করেও তিন হাজার টাকা তুলেছে। মাত্র দু-তিন দিনে। এবং আজই আবার টাকা চাইছে?
দীপনাথ সমস্যাটা সরিয়ে রেখে অফিসের কাজ টেনে বসল। বোস সাহেবের অনুপস্থিতিতে কার্যত সে-ই কর্তা।
কাজ করতে করতে হুঁশ ছিল না দীপনাথের। হঠাৎ হাতঘড়ি দেখে অবাক হল। বেলা পৌনে পাঁচটা। মণিদীপা এখনও আসেনি। অ্যাকাউন্ট্যান্টকে বলে টাকার ব্যবস্থা করে রেখেছে দীপনাথ। সাড়ে পাঁচটায় অফিস ছুটি।
ক্যাশিয়ারকে ডেকে ভাউচারে সই করে টাকাটা নিজের টেবিলের টানায় রেখে চাবি দিল দীপনাথ। আগে তার এত ক্ষমতা ছিল না, এত স্বাধীনতাও নয়। আজকাল সে নিজের নামে অনেক টাকা অফিস থেকে নিতে পারে। মাইনের সঙ্গে হিসেব করে কেটে নেবে।
মণিদীপার কথা কয়েক মিনিট ভাবল দীপনাথ। তারপর আবার কাজ টেনে বসল।
অফিস ছুটি হয়ে যাওয়ারও প্রায় পনেরো মিনিট বাদে বেয়ারা এসে বলল, মেমসাহেব এসেছেন।
কোথায়?
করিডোরে।
ভিতরে নিয়ে এস।
পৌনে ছটা ছাড়িয়ে ছ’টার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটা। দীপনাথ টেবিলের কাগুজে জঞ্জাল সরিয়ে দরজার দিকে চেয়ে অপেক্ষা করছিল। বুক কাঁপছে, গলা শুকোচ্ছে।
খুব ছাপছক্করওলা রাজস্থানি ঘাঘরা আর কামিজে রঙের একটা ঘূর্ণি তুলে মণিদীপা শূন্য অফিসঘরটায় ঢোকে। চারদিকে মরা টেবিল, প্রাণহীন ক্যাবিনেট, বিশুষ্ক কাগজের ক্রুপের ভিতর বসন্তের হাওয়া এল। সঙ্গে সুগন্ধ।
আমার জন্যই বসে আছেন? না কি কাজ ছিল?
কাজ ছিল।
যাক তা হলে বসিয়ে রাখিনি। রাখলে তো দোষ ধরতেন।
ধরতাম। কিন্তু তার চেয়েও খারাপ হত, আমি চলে গেলে আপনি টাকাটা আজ আর পেতেন না।
পেতাম।
কী করে?
আপনি পৌঁছে দিতেন।
তাই নাকি? কী করে বুঝলেন?
আই নো ইউ। ইউ আর ফেথফুল লাইক এ—
ডগ?–বলে হাসে দীপনাথ।
কুটি করে মণিদীপা বলে, তাই বলছি?
বললেও দোষ হত না। কুকুরের কিছু গুণ পেলে মানুষও বর্তে যেত।
এখনও বসতে বলেননি। বসুন।
মণিদীপা বসে। চোখেমুখে সামান্য টেনশন। চনমন করছে। রোজ যেমন দেখায় তেমনি ভাল দেখাচ্ছে তাকে। মুখে খুব একটা রং মাখেনি। স্নিগ্ধ কোমল মুখশ্রী। একটু গম্ভীর, একটু করুণ।
চা খাবেন? সামনেই একটা ভাল দোকান আছে। বেয়ারা এনে দেবে।
আমার চায়ের নেশা নেই।
তা হলে কী দিয়ে আপ্যায়ন করি আপনাকে?
আপ্যায়ন-টন এখন থাক। আপনি এখন এই অফিসের একজন বস, তাই না?
ছোট মাপের।
বস হতে কেমন লাগে?
মন্দ না।
মণিদীপা সুযোগ পেয়েও কোনও চিমটি কাটল না। এমনকী সেই বিষ-হাসিটাও হাসল না। বলতে পারত, একজন বিপ্লবীর মৃত্যু ঘটেছে। জন্ম নিয়েছে একজন শশাষণকারী বা ওই গোছের কিছু।
আপনাকে একটু ডিসটার্বড দেখাচ্ছে।
মণিদীপা চোখ না তুলে বলল, না তো। আপনার বউদি কী বলেছে, এবার বলুন।
বউদি!–বলে একটু অবাক হয় দীপনাথ, বউদি কী বলবে?
