বলে চুপ করে রইল দীপনাথ। কলকাতায় প্রীতম ছিল। অশক্ত, শয্যাশায়ী, পঙ্গু হলেও ছিল। কিন্তু এখন, আজ থেকে আর নেই। কলকাতা এখন তো অনেক বিবর্ণ লাগবে দীপনাথের কাছে।
অরুণ বিলুদের বাসার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে গেল।
নিঃশব্দে ফ্ল্যাটে উঠে এল দীপনাথ আর বিলু। লাবু ঘুমিয়ে পড়েছে। খোলা জানালা দিয়ে হুঁ হু করে হাওয়া এসে ফাঁকা ঘরে হুটোপুটি খাচ্ছে। প্রীতমের বিছানার বেডকভারের কোণ বাতাসে উলটে আছে। ওষুধের ফাঁকা শিশিগুলো দাড় করানো বিছানার পাশের টেবিলে।
বিলু বাথরুমে গেছে। দীপনাথ দাঁড়িয়ে প্রীতমহীন ঘরখানা খুব মন দিয়ে দেখে। ঘরের কোণে প্রীতমের হুইল চেয়ার বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতম চলে গেছে, এটা কি বুঝতে পারছে প্রীতমের বিছানা, টেবিল বা হুইল চেয়ার!
রাতে খেতে বসে কিছুই প্রায় খেতে পারল না দীপনাথ। বমি আসছে। মুখ ধুয়ে এসে বলল, প্রীতমের বিছানায় একটা ফর্সা চাদর পেতে দে। আমি আজ এই বিছানায় শোব।
বিলু আপত্তি করল না।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে বিলু এসে প্রীতমের বিছানায় দীপনাথের পাশে বসল।
পান খাবে সেজদা?
না।
এক্ষুনি শুয়ে পড়বে নাকি?
দীপনাথ অসহায়ভাবে হেসে বলে, শুয়ে লাভ নেই। আজ রাতে ঘুম আসা শক্ত।
তবে আমাকে প্রীতমের গল্প বলো। তোমাদের ছেলেবেলার গল্প।
শুনতে চাস?
চাই। আজ প্রীতমের কথা শুনতেই তো তোমাকে ডেকে আনা।
কথাটা হয়তো সত্যি নয় বিলুর। প্রীতমের কথা শুনতে তার হয়তো ততটা ইচ্ছে হচ্ছে না, কিন্তু সে জানে, সেজদা প্রীতমের কথা বলতে পারলে খুশি হবে।
প্রীতম। প্রীতমের কথা বলতে গেলেই বিশাল পাহাড়, বনশ্রেণি চোখে ভেসে ওঠে। ছেলেবেলার শিলিগুডির জনবিরল রাস্তাঘাট, উদোম মাঠ, অবারিত প্রসার মনে পড়ে যায়। প্রীতম তো কোনও বিচ্ছিন্ন মানুষ নয়। সে যেন এই ছেলেবেলার এক অবধারিত শর্ত।
অনেক অনেক কথা জমা হয়েছিল বুকে। বলতে বলতে ফাঁকা হয়ে গেল বুক। হাঁটু মুড়ে ভিখিরির মতো করুণ ভঙ্গিতে বসে যতদূর সম্ভব মন দিয়ে শোনে বিলু।
৪৩. পরদিন ভাইবোনে অফিসে বেরোল
পরদিন ভাইবোনে অফিসে বেরোল একসঙ্গে। ভিড়ের বাসে রড ধরে দাঁড়িয়ে তোতির মধ্যেও দীপনাথ লেডিজ সিটে বসা বিলুকে লক্ষ করে। আজ সকালে বিলুর মুখে একটু বিষণ্ণতা এসেছে, একটু অন্যমনস্কতা। দুইয়ে মিলে ওর কাঠ কাঠ মুখটাকে কোমল লাবণ্যে মেখেছে বুঝি। চোখদুটো ভার ভার। রাতে হয়তো কেঁদেছে।
খুব ভাল, খুব ভাল।–মনে মনে বলে দীপনাথ।
বিলুকে ব্যাংকে পৌঁছে দিয়ে সে অফিসে যায়। মনটা আজ খুব গভীর এবং স্থির। দুঃখ নেই, আনন্দও নেই। তবু কী একটা গভীরতর ভাব থানা গেড়ে আছে।
অনেকক্ষণ সে কাজে মন দিতে পারল না। টেবিলে বসে রইল চুপচাপ। বোস সাহেব একটা ঘোট কাজে দিল্লি গেছেন। কার্যত এখন অফিস চালাতে হচ্ছে দীপনাথকে। অফিসকে অবশ্য চালানোর কিছু নেই। আপনি চলে। কিন্তু বিস্তর কাজ জমে আছে।
মনটাকে জড়ো করতে সময় লাগল একটু। দুপুর পর্যন্ত একটানা কাজ করে গেল সে।
লাঞ্চে ফোন এল।
দীপনাথবাবু!-মণিদীপার গলা।
বলছি। কী খবর? সেদিন শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাড়ি ফিরলেন?
থাক। জানতে যে চাইলেন সেটাই ভাগ্যি।
দীপনাথ হাসল। বলল, সেদিন কিছু করার ছিল না।
জানি। কিন্তু তা বলে একটু সিমপ্যাথিও দেখাতে নেই?
কেন? দেখাইনি?
আমি অবশ্য সিমপ্যাথির কাঙাল নই।
সেটা আর বলতে হবে না। হাড়ে হাড়ে জানি।
শুনুন, আমি একটু মুশকিলে পড়েছি।
কী মুশকিল?
হাতে টাকা নেই। মিস্টার বোসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যে এত ফাঁকা তা জানতাম না।
কত টাকা?
পাঁচশো হলেই চলবে। অ্যারেঞ্জ করা যাবে অফিস থেকে?
দীপনাথ বলল, আপনি কিছু ভাববেন না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনার কবে দরকার?
আজই। এক্ষুনি।
এক্ষুনি কী করে হবে? আমি বরং বিকেলে–
না, অত দেরি করা অসম্ভব। আমি এসপ্ল্যানেড থেকে ফোন করছি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমি। আপনাদের অফিসে যাচ্ছি।
ঠিক আছে। আসুন।
কেমন আছেন? ভাল?
আপনি কেমন?
চমৎকার। ফ্রি লাইক এ বাটারফ্লাই।
ফ্রিডম ফ্রম হোয়াট?
এভরিথিং। হাজব্যান্ড হাউজহোল্ড অ্যান্ড হেডেক।
অনেকটা আমার মতোই, তাই না?
তার মানে?
আমি যেমন ফ্রি ফ্রম ওয়াইফ ওয়েলথ অ্যান্ড ওরিজ।
এটাও কি রং নাম্বার?
কেন বলুন তো!
আমি দীপনাথ চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা বলছি, না অন্য কারও সঙ্গে?
নম্বর ঠিকই আছে।
আপনি এত স্মার্ট হলেন কবে থেকে? খুব বোল ফুটছে দেখছি। দিব্যি তো সরল সোজা পেঁয়ো লোকটি ছিলেন। বোল ফোটাচ্ছে কে?
কেউ হবে।—দীপনাথ হাসছিল না। ভ্রু কোঁচকানো। চিন্তিত মুখ। একটু সময়ের ফাঁক দিয়ে বলল, বোস সাহেবের সঙ্গে আপনার একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ছিল না?
হ্যাঁ। একমাত্র সেটাই আমার অ্যাকসেসিবল অ্যাকাউন্ট।
আপনার নিজের অ্যাকাউন্টও তো আছে!
আছে। কিন্তু তাতে বহুকাল টাকা নেই।
বোস সাহেবের বেতন, যতদূর জানি, জয়েন্ট অ্যাকাউন্টেই জমা হয়।
মণিদীপা একটু চুপ করে থাকে। তারপর একটু ঝাঁঝালো গলায় বলে, জেরা করার মানে কী?
জেরা নয় মিসেস বোস। কেবল সেফ-সাইডে থাকা। বোস সাহেব ফিরে এলে হয়তো কৈফিয়তটা আমাকেই দিতে হবে।
আমার কথা বলবেন। কৈফিয়ত যেন আমার কাছেই চায়।
রাগ করলেন? আসলে টাকা-পয়সার ব্যাপারটাই এত বিচ্ছিরি যে, এই একটা ব্যাপারে কিছুতেই আব্রু রাখা চলে না।
আপনি আজকাল খুব প্র্যাকটিক্যাল হয়েছেন। এত প্র্যাকটিক্যাল যে আমার আবার মনে হচ্ছে এটা রং নাম্বার।
