একটু বাদে কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে দার্জিলিং মেল মাঠঘাটের অন্ধকার ভেঙে যখন দৌড়োচ্ছ ঊর্ধ্বশ্বাসে তখনও প্রীতম কিছু টের পেল না। শতম শিয়রে বসে দাদার কপালে হাত রাখল। রোগা, পাণ্ডুর মুখখানার দিকে চেয়ে রইল গভীর দৃষ্টিতে। অনেকক্ষণ তার মুখে রাগ, অভিমান, দুঃখ খেলা করে গেল। তারপর শান্ত হল শতম।
দাদা!
উঁ।
ওদের কথা বিশ্বাস কোরো না।
কাদের কথা?
ডাক্তারদের কথা, বউদি বা অরুণদার কথা। ওরা কি দুনিয়ার সব কিছু জানে?
দুনিয়ায় সব কথা কেই-বা জানে!
শোনো দাদা, আমি বলছি, এ অসুখ ভাল হয়ে যাবে। তোমাকে এত সহজে মরতে দেব নাকি? ওরা তোমাকে মেরে ফেলছিল বলে আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।
ভাল করবি? শুনিসনি, মোটর নিউরো ডিজেনারেশনের কোনও চিকিৎসা নেই?
রাখো তো! নাম চিকিৎসায় সব ভাল হয়।
প্রীতম মুখে কিছু বলল না। শুধু একটু প্রশ্রয়ের হাসি হাসল।
শতমের চোখে মুখে একটা গভীর বিশ্বাসের প্রত্যয় ফুটে উঠল, নামই সব। নাম থেকেই প্রাণ। নামে সব হয়। দেখবে দাদা?
ক্লান্ত চোখে একটু উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে প্রীতম বলে, এসব তো এতদিন বলিসনি।
বলব কী? ওরা তোমার এত চিকিৎসা করছে অথচ নিজেরাই বিশ্বাস করছে না যে, তুমি বাঁচবে। মূলে একটু বিশ্বাস না থাকলে কি হয়! ওদের কারও স্বভাবেই বিশ্বাস জিনিসটা নেই। বীজমন্ত্র জপে অসুখ সারে, এ কথা শুনলে হাসত। আজ তোমাকে ওই পরিবেশ থেকে তুলে আনতে পেরেছি বলে বলছি। তুমি শুধু একটু বিশ্বাস করো যে, তুমি বাঁচবে।
কিন্তু সব যে বড় দুরে সরে যাচ্ছে।
কিছুই দূরে সরছে না। তুমি চুপ করে চোখ বুজে থাকো। আমি তোমার শিয়রে বসে একটু জপ করি।
আচ্ছা।–প্রীতম চোখ বোজে।
শতম কামরার বাতি নিভিয়ে দেয়। প্রীতমের শিয়রে শিরদাঁড়া টানটান খাড়া রেখে বসে।–যুগল এবং নাসামুলের সঙ্গমে ত্রিকূটি। আজ্ঞাচক্র। তেসরা তিল। দার্জিলিং মেলের ঝোড়ো গতি, দুলুনি এবং প্রবল শব্দের জন্য মনটাকে সংহত করতে একটু দেরি হয়। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তির বলে পারেও তা। আজ্ঞাচক্রে স্মিত হাস্যময় অপার্থিব সুন্দর মুখশ্রী ফুটে ওঠে। শুরু হয় বীজনামের স্পন্দন। একটু একটু কাঁপতে থাকে শতম। নামের ধ্বনির সঙ্গে তাল রেখে তার হৃৎপিণ্ডের শব্দ পালটে যায়। শব্দ ধ্বনিত হতে থাকে। ত্রাতা ডাকে, অনাহত শব্দ ডাকে… শোন ওই অনাহত শব্দসব শব্দ শব্দ শব্দ। তিনি বলেছিলেন, দ্যাখ, আমাদের যেতে হলে সেই গঙ্গার ধারে যেতে হবে। শব্দগঙ্গা, আকাশগঙ্গা, দ্যাখ, আমার নাম করতে করতে আসলেই ওই ত্রিবেণীঘাটে পৌঁছিবে, তারপর ওই ত্রিবেণীতে পৌঁছিলে ওই শব্দগঙ্গা পেলেই গা ঢেলে দিয়ে বসে যা। রূপের রাজ্য আস্তে আস্তে পার হয়ে পড়। তারপর রূপও যাবে নামও যাবে। আমি কে জানিস? ওই শব্দটা। ওটা কী জানিস? ওই প্রণব।
স্টেশনের বাইরে এসে অরুণ বলল, দীপনাথদা, আপনাকে গাড়িতে পৌঁছে দিই?
দীপনাথ ভীষণ আনমনা ছিল। কথাটা শুনতেই পেল না। অরুণ দ্বিতীয়বার বলায় সে মাথা নাড়ল, না দরকার নেই। আমি তো কাছেই থাকি।
বিলু কিছু বলছিল না এতক্ষণ। এবার হঠাৎ বলল, আজ তোমাকে মেসে ফিরতেই হবে সেজদা?
কেন বল তো!
আজ প্রীতম চলে গেল। আমার খুব একা লাগবে।
তোর সঙ্গে যেতে বলছিস?
গেলে খুব ভাল হয়। যাবে?
অন্যমনস্ক দীপনাথ প্যান্টের পকেটে হাত ভরে কী যেন ভাবে অনেকক্ষণ। বলে, প্রীতমকে যেতে দিলি কেন?
গেলে আমি কী করব? জোর করল যে।
তোর জোর ছিল না?
তাতে ভাল হত?
দীপনাথ আবার একটু ভেবে বলে, না বোধহয়। এই ভাল হয়েছে।
ও ওর মা-বাবা ভাই-বোনকে বড় বেশি ভালবাসে। তাই আমি ভাবলাম, ও যদি নাই বাঁচে তা হলে অন্তত শেষ ক’টা দিন প্রিয়জনদের কাছে থাকুক। কোনও ভুল করেছি?
না তো।–দীপনাথ অবাক হয়ে বলে, ভুল করবি কেন?
অরুণ তার গাড়িটা দুরে পার্ক করে রেখেছে। তিনজন হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে যায়।
যাবে সেজদা?
চল।
অরুণ সামনে, গাড়ি চালাচ্ছে। পিছনের সিটে বিলু আর দীপনাথ।
বিলু মৃদু স্বরে বলে, প্রীতম বড় কষ্ট পাচ্ছে সেজদা।
দেখলাম তো।
শুধু শরীরের কষ্টই তো নয়। দিনরাত ঘরবন্দি থাকতে কেমন লাগে বলো।
দীপনাথ একটু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
বিলু মাথা নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, সবাই হয়তো আমার দোষ ধরবে।
আনমনা দীপনাথ বলল, কে দোষ ধরবে?
ওরা, ওই প্রীতমের বাড়ির সবাই।
কেন? তুই কী করেছিস?’
আমি আবার কী করব? ওরা হয়তো বলবে, আমি প্রীতমের যথেষ্ট সেবা করিনি। শতমও সেইরকমই সব কথা বলে গেল। ওদের বিশ্বাস, আমি চাকরির নাম করে প্রীতমকে অ্যাভয়েড় করেছি।
প্রীতমের বাড়ির লোককে আমি চিনি। ওরা খারাপ নয়।
এ কথাটাকে সমর্থন করল না বিলু। তবে জবাবও দিল না। গোঁজ হয়ে বসে রইল। অনেকক্ষণ বাদে বলল, তুমি প্রীতমকে বড় ভালবাসো, না সেজদা?
উঁ।—স্বপ্নোত্থিত দীপনাথ বিলুর আবছা মুখের দিকে চায়। তারপর বড় একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, প্রীতমটা যে ভীষণ ভাল। শিলিগুড়িতে আমরা একসঙ্গে মানুষ হয়েছি। ওকে কি ভাল না বেসে পারা যায়?
প্রীতমও তোমাকে ভীষণ ভালবাসে।
জানি।
ও চলে যাওয়ায় তুমি আমার চেয়েও বেশি শক্ড।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, ঠিক তা নয়।
তুমি যে ভীষণ আনমনা হয়ে আছ।
দীপনাথ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে আস্তে বলল, প্রীতম বাড়ি গেল। তাতে শম্ভ হওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু আমাদের ছেলেবেলার কথা ভাবছিলাম।
