সারাক্ষণ বিলু পাশাপাশি রয়েছে। ট্রেনের কামরা অবধি। পায়ের কাছে বসে প্রীতমের রোগা হাঁটুর ওপর হাত রেখে পলকহীন চেয়ে আছে। বিকেল থেকে কেবলই ওই মূক চেয়ে থাকা। কথা নেই। প্রীতম অবশ্য চাইছে না। চেয়ে কী হবে? মায়া বাড়বে।
তবু এই শেষ সময়টুকু এভাবে কাটিয়ে দেওয়া অভদ্রতা বলে প্রীতম বিলুকে জিজ্ঞেস করল, মেজদা আসবে না?
বিলু সংবিৎ পেয়ে বলল, তুমি যে কে সেজদাকে মেজদা ডাকো!
আমি তো মেজদাই ডাকব। পিসিমার ছেলেরা ডাকত। ও আমাদের ছেলেবেলা থেকে ডেকে অভ্যাস। তবে আজকাল সেজদাও ডাকি, কিছু ঠিক নেই।
বিলু বলল, আসবার তো কথা। হয়তো অফিসে কাজ পড়েছে।
মেজদা আসবেই। তুমি একটু দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াও। হয়তো কামরাটা চিনতে পারছে না। বিলু নিঃশব্দে উঠে গেল। একটু বাদে ফিরে এসেই বলল, শতম তো রয়েছে বাইরে।
ট্রেন ছাড়তে কত দেরি?
এখনও কুড়ি মিনিটের মতো।
শতমটা যে কেন একগাদা টাকা খরচ করে ফার্স্ট ক্লাশের টিকিট কাটতে গেল। সেকেন্ড ক্লাশেই দিব্যি যেতে পারতাম।
এই ভাল হয়েছে। সেকেন্ড ক্লাশে ভিড়, গোলমাল, ধাক্কাধাকি।
সেটাই তো ভাল। কতকাল মানুষজন দেখি না, গোলমাল কানে আসে না। জ্যান্ত তাজা, একগাদা মানুষ দেখতে কত ভাল লাগত।
অসুবিধে হত।
তুমি বুঝবে না মানুষের ভিড় আমার এখন কত প্রিয়।
ঘরবন্দি থাকলে ওরকম মনে হয়। কিন্তু ভিড় তো আর সত্যিই ভাল কিছু নয়।
আচমকাই অরুণের দীর্ঘ গৌরবর্ণ চেহারাটা দরজা জুড়ে দেখা দিল। পরনে ধুসর রঙের সাফারি শার্ট আর প্যান্ট। হাতে গাড়ির চাবি।
একটুও চমকাল না প্রীতম। মনে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। শান্ত গলায় বলল, আসুন।
চললেন তা হলে?–অরুণ ভিতরে এসে দাঁড়ায়।
চললাম। বিলু আর লাবু রইল।
বিলু উঠে দাঁড়িয়ে অরুণকে বলল, এখানে বোসো।
অরুণ বসল না। হাত নেড়ে বিলুকে বসে থাকার ইঙ্গিত করে বলল, বিলুও তো ছুটির অ্যাপ্লিকেশন করেছে শুনলাম। করোনি বিলু?
হ্যাঁ।
শিলিগুড়ি কবে যাচ্ছ?
সামনের মাসে।
প্রীতম এই সংলাপ নীরবে শুনল। কথা বলল না। বিলু সামনের মাসে শিলিগুড়ি যাবে, এ কথা তাকে আগে বলেনি। এখন জেনেও প্রীতমের ভাল বা খারাপ কিছু লাগল না। মাথার মধ্যে কোনও কথাই তরঙ্গ তুলছে না। কেমন একটা জমাট নিরেট ভাব।
অরুণ ওপরের বাঙ্কে হাতের ভর রেখে ঝুঁকে বলল, আমার বিয়েটা পর্যন্ত আপনি থাকবেন আশা করেছিলাম।
প্রীতম সামান্য হাসল। বলল, বিয়েটা হোক। দুর থেকে শুভকামনা করব।
অরুণ মুখ গম্ভীর করে বলে, আপনার ওয়েল উইশিং-এর দাম আছে। আপনি সত্যিকারের ভাল লোক।
প্রীতম আবার হাসে। মাথাটা এত প্রতিক্রিয়াহীন কেন? এত জমাট কেন?
বিলু আবার হাঁটুতে হাত রেখেছে। আস্তে করে বলল, আমি আর দিন কুড়ি-পঁচিশ বাদেই যাচ্ছি। ততদিন ওষুধ-টষুধ ঠিকমতো খেয়ো।
ভেবো না। বাড়িতেই দেখার লোক আছে।
তবু বলছি।
গাড়ি ছাড়ার মিনিট সাতেক বাকি থাকতে দীপনাথ এল। মুখে ঘাম, উদ্বেগ। বড় বড় ঘাস ছাড়ছে।
এলে মেজদা? ভাবছিলাম, বোধহয় পৌঁছতে পারবে না।
দেরি হয়ে গেল। বউবাজারে যা জ্যাম। ট্যাক্সি ছেড়ে প্রায় দৌড়ে এসেছি।
তোমার নর্থবেঙ্গলের ট্যুর আর নেই?
আছে। খুব শিগগিরই যাচ্ছি। অফিসে কিছু বকেয়া কাজ জমে গেছে বলে ডেটটা পিছিয়েছে।
তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি বেশিদিন—
চুপ কর প্রীতম।
প্রীতম আবার হাসে। মাথা একটু তোলার চেষ্টা করে বলে, পাঁচ মিনিটের বেশি বোধহয় সময় নেই। বিলু, তুমি নামো।
বিলু মৃদুস্বরে বলে, অনেক দেরি আছে।
প্রীতম দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, মাথাটা কেমন লাগছে মেজদা। বোধবুদ্ধি কমে যাচ্ছে। কটা বাজে বলো তো? সময় আছে?
দীপনাথ ঘড়ি দেখে বলে, মিনিট তিনেক।
শতম গাড়িতে উঠল না?
উঠবে। অত অস্থির হচ্ছিস কেন?
অস্থির নয়। গাড়িটা চললে আমার খুব ভাল লাগবে। কতকাল চলন্ত রেলগাড়িতে…কতকাল.. প্রীতম!
উঁ।
ওরকম করছিস কেন? শরীর কেমন লাগছে?
ভাল। খুব হালকা।—চোখ বুজে গভীর শ্বাস টেনে প্রীতম বলে, গাড়ি ছাড়লেই ভাল লাগবে।
দীপনাথ ওর কপালে হাত রাখে। করোটির মতো কপাল। চামড়ায় খসখসে ভাব। ঠিক এতটা দুর্বল কিছুদিন আগেও ছিল না প্রীতম। ডাক্তাররা পাকেপ্রকারে জবাব দিয়েছে অনেককাল আগেই, তবু অসম্ভব মনের জোরে লড়ে গেছে প্রীতম।
দীপনাথ ক্রুদ্ধ বিরক্ত চোখ তুলে অরুণের দিকে তাকায়। সুন্দর শয়তান। বলবে দীপনাথ? বলবে যে, আপনিই প্রীতমের এ অবস্থার জন্য দায়ী?
বলা যায় না। মানুষের সমাজে আজও ভদ্রতা, শিষ্টতার মতো কিছু ভাঁড়ামি এসে সত্যের মুখ চাপা দিয়ে ধরে।
অরুণ একদৃষ্টিতে দীপনাথকে দেখছিল। হঠাৎ বলল, আমেরিকায় এক জায়গায় মোটর নিউরো ডিজেনারেশন নিয়ে রিসার্চ চলছে। আমি চিঠি লিখেছিলাম। জবাব এসেছে, ওরা এখন এই রোগটা নিয়ে অ্যানিম্যাল রিসার্চ করছে। কোলোনে আর-এক জায়গায় যোগাযোগ করেছি।
কী লিখেছে?
এখনও জবাব আসেনি। যদি আসে তবে জানাব।–এইটুকু স্বাভাবিক গলায় বলে হঠাৎ মুখটা কাছে এনে বলল, এস এন ডি ইজ ইনকিউরেবল ইউ নো।
দীপনাথ মাথা নাড়ে।
শতম দরজায় আসে। ছোট কুপটায় ভিড় হয়ে গেছে। শতম বলল, গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। বউদি, নামো।
কথাটা শুনেও কয়েক সেকেন্ড বসে থাকে বিলু। তারপর উঠে প্রীতমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কোমল স্বরে বলে, আসছি। ভাল থেকো।
প্রীতম চোখ চাইল। বলল, গাড়ি চলছে বিলু?
না, এখনই ছাড়বে। আমি যাচ্ছি।
আচ্ছা।–বলে আবার চোখ বোজে প্রীতম। গাড়ি যখন সত্যিই ছাড়ল তখনও তার চোখ বোজা। গাড়ি নড়ে উঠলে হঠাৎ বলল, আমি বাড়ি যাচ্ছি।
