না শুনলেই ভাল করতিস।
আমি শুনতে চাই। তুমি বলো।
কী বলব? বলার কিছু নেই।
ও কি শিলিগুড়ি যাবেই?
তাই তো মনে হচ্ছে। যাওয়াই ভাল।
একটু আগের কাঠিন্য হঠাৎ ঝরে গেছে বিলুর। কেমন সাদা পাঁশুটে মুখে চেয়ে থাকে দীপনাথের দিকে। হলুদ আলোয় ঠোঁট দুটো বিবর্ণ দেখায়। অনেক রোগাও হয়ে গেছে বিলু। গলার স্বর আবার হঠাৎ ভেঙে গেল ওর। বলল, যাক না! যাক। কে আটকাচ্ছে?
এসব কথা বলে সাধারণ মেয়েরা হঠাৎ কেঁদে ফেলে বা ভেঙে পড়ে। বিলু তা করল না। খাটের বাজুতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেমন ছিল। খাটে সবুজ নাইলনের মশারির মধ্যে লাবু নিশ্চিন্তে ডান কাতে ঘুমোচ্ছে। খুব আস্তে ঘুরছে সিলিং-এর পাখা।
কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না। তারপর বিলুই হঠাৎ বলল, ও আমাকে সন্দেহ করে।
সন্দেহ কেন করবে? সন্দেহ নয়।
তোমাকে কিছু বলেনি?
বলেছে। তবে সেটা সন্দেহ নয়, বিলু। আমিও জানি সেটা সত্য।
বিলু মেঝেতে পা ঘষল। মুখ তুলল না। মৃদু স্বরে বলল, তুমিও আমাকে বিশ্বাস করো না সেজদা?
দীপনাথ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, অরুণকে ছেড়ে দে না কেন বিলু! কেন অশান্তি বাড়াচ্ছিস?
একটু তেজের গলায় বিলু বলে, ছাড়ার কিছু তো নেই। অরুণের মতো শুভাকাঙ্ক্ষী আমার কে আছে?
এ সময়ে দীপনাথের আর-একটা দীর্ঘশ্বাস ঝরে গেল। বিলুর দেওয়া পাজামাটা সে এখনও পরেনি। মৃদু স্বরে বলল, আজ যাই রে বিলু। পরে একদিন এসে থাকব।
বিলু অবাক হল না। পরিস্থিতি পালটে গেছে। বলল, খেয়ে যাও।
না, খিদে নেই।
জটা সময়ে এক্সটেনশনস্টাল ফ্যানের সাইরে।
মেসে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ঢাকা খাবার খুঁয়েও দেখল না দীপনাথ। বিছানায় শুয়ে জেগে রইল। ঘুম এল ভোরের দিকে, যখন দীর্ঘ বিরতির পর আবার বৃষ্টি নামল বাইরে।
পরদিন আধভেজা হয়ে অফিসে পৌঁছে পেডেস্টাল ফ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে প্যান্ট শার্ট শুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। এ সময়ে এক্সটেনশন লাইনে তার টেবিলের টেলিফোন বেজে ওঠে। হঠাৎ কেন যেন আওয়াজটা শুনেই মনে হল, মণিদীপা। বহুকাল তার ডাক আসেনি।
রিসিভার কানে তুলতেই নির্ভুল গলাটি বলল, আমি ভীষণ আটকে পড়েছি এক জায়গায়। একটু হেলপ করবেন?
দীপনাথ কাচের শার্শি দিয়ে বাইরে বৃষ্টির প্রচণ্ড তাণ্ডব দেখতে পাচ্ছিল। ভরদুপুরেও প্রায় ঘুটঘুট্টি অন্ধকার চারদিকে। রাস্তায় কোনও চলমানতা নেই। গাড়ি না, মানুষ না, গোরুটা পর্যন্ত না। সে মৃদু স্বরে বলল, এই ওয়েদারে ঈশ্বর আপনার সহায় হোন। কোথায় আটকে পড়েছেন?
বাগবাজারের এক মিষ্টির দোকান থেকে ফোন করছি। রাস্তায় হাঁটুজল।
দীপনাথ বলল, এখানে কোমর সমান। কিছু করার নেই। অপেক্ষা করুন। বোস সাহেবকে লাইনটা দেব?
বিরক্ত মণিদীপা বলে, তা হলে আর আপনাকে ফোন করছি কেন?
সত্যিই তো, কেন?
প্রমোশন পাওয়ার পর খুব চোপা হয়েছে তো আপনার!
প্রমোশন পেলেও আমি এখনও বোস সাহেবের আন্ডারে। আপনার মতোই।
আমি কারও আন্ডারে নই। আই অ্যাম নট এ শ্লেভ লাইক ইউ।
সেকথা থাক। আপনার জন্য কী করা যায় বলুন তো!
সেটাই তো আপনাকে ভাবতে বলছি।
বোস সাহেবকে বলি, তিনিও না হয় একটু ভাবুন।
আপনাদের কাউকেই ভাবতে হবে না। আমিই ভাবব।
রাগ করলেন? আপনার ভয়ের কিছু নেই। এখন বেলা বারোটা মাত্র বাজে। বৃষ্টি থামবে, গাড়িঘোড়াও চলবে। একটু অপেক্ষা করতে হবে এই যা। বাগবাজারে কোথায় গিয়েছিলেন?
যেখানে আমার খুশি। শুনুন, অফিসের একটা গাড়ি পাঠাতে পারেন না?
গাড়ি? আমার চোখের সামনে অন্তত দশবারোখানা গাড়ি রাস্তায় জলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। গাড়ির কথা ভুলে যান। গরিবের বন্ধুরা বিপদে পড়লেই কেন গাড়ির কথা ভাববে?
আবার কটকটে কথা! আমার আধুলিটা তা হলে ফেরত চাইব কিন্তু।
ওই যাঃ। আধুলিটা ফেরত দিইনি আপনাকে?
কই আর দিলেন!
তা হলে শিগগিরই একদিন যাচ্ছি ফেরত দিতে।
মণিদীপার পরের কথাটা অস্পষ্ট এল। লাইন ডেড। সম্ভবত আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল-এ জল ঢুকেছে। তবু মনে হল মণিদীপা জিজ্ঞেস করছিল, উইথ লাভ?
৪২. কতকাল পরে রেলগাড়ি দেখছে প্রীতম
কতকাল পরে রেলগাড়ি দেখছে প্রীতম!
আম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচারে নামিয়ে ট্রেনের একটা ফার্স্টক্লাশ কুপেতে চটপট তাকে তুলে দিয়ে গেছে বাহকেরা। কিন্তু ওই সময়টুকুতেই সে অবাক হয়ে ঠিক লাবুর মতো ছেলেমানুষি কৌতূহলে রেলগাড়িটাকে দেখেছে।
নীচের বার্থে নরম বিছানায় শুয়ে সে রেলগাড়ির অদ্ভুত নেশারু গন্ধটা পাচ্ছিল। কাঠের পালিশ, গদি আর মৃদু ফিনাইল মিলে বোধহয় এই গন্ধটা তৈরি হয়। বড় ভাল লাগে।
কাঁদবে বলে লাবুকে স্টেশনে আনা হয়নি। তবু কি কঁদেনি? অসহায় তোষাপানা মুখ করে সারাদিন বেড়ালের মতো ঘুরঘুর করেছে প্রীতমের বিছানার আশেপাশে। রওনা হওয়ার সময় সামলাতে পারেনি, হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল। প্রীতম মড়ার মতো মুখ করে শক্ত হয়ে রইল। মনে মনে জপ করল, ওরা কেউ না, ওরা আমার কেউ না। তবু সে তো জানে, আমৃত্যু লাবুর মুখখানা চোখে ভাসবে তার।
স্ট্রেচারে অ্যাম্বুলেন্সে ভেসে ভেসে চলে আসার সময় সে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, এ শোক বেশিদিন তো নয়। শোনোনি তোমার শরীরের ভিতরে কোলাহল আর জয়ধ্বনি করছে জীবাণুরা। বেশিদিন নয় হে, বেশিদিন নয়।
এতদিনে গতকালই প্রথম সে তার বিজ্ঞাপনের একটা জবাব পেয়েছিল। ছোট একটা কোম্পানি তাকে দিয়ে অডিট করাতে চেয়েছে। সামান্য ফি দেবে। একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিল প্রীতম, হয়তো কাজ-টাজ হাতে নিলে বেঁচে যাব। তারপর ভাবল, খেলাটা শেষ হওয়াই ভাল। খামোখা টানাহ্যাঁচড়া করে ক্ষতবিক্ষত হওয়া। আর লড়াই নেই। এবার নিশ্চিন্ত।
