দূর বোকা! আমি কি গোয়েন্দাগিরি করে বেড়াই? তুই যেভাবে জেনেছিস আমিও ঠিক সেইভাবে… আন্দাজ, অনুমান।
প্রীতম গভীর দৃষ্টিতে দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, তোমার খুব সূক্ষ্ম অনুভব আছে, সেজদা।
মোটেই নয়। কিন্তু আমি বলি, তুই ওসব নিয়ে কেন ভাবিস? মানুষ একটা বিশ্বাসের জায়গা চায়, নির্ভরতা চায়, আশ্রয় চায়—এসব তো পুরনো কথা। কিন্তু তোর তো তা নয়। বিলু তোর বউ বটে, কিন্তু তুই বেঁচে আছিস নিজের জোরে। বউ যদি বিশ্বাস না রাখে, তাতেও তোর কিছু এসে যায় না, প্রীতম। বেঁচে থাকাটাই যে তোর আসল পায়েব তলার মাটি। তুই কেন ছিচকাঁদুনের মতো অন্যের ওপর নির্ভর করবি?
তুমি কেন এতদিন এলে না সেজদা? এসব কথা কেন আগে এসে বললে না আমায়? সমস্যাটা নিয়ে আমি রোজ শুয়ে শুয়ে ভাবছি আর জড়াচ্ছি।
প্রীতমের চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দীপনাথ বলে, বিলু বা অরুণ তো তোর কোনও প্রবলেম নয়, প্রীতম। তবু যে ওটা নিয়ে ভেবেছিস তার কারণ, পুরুষের স্বাভাবিক অধিকারবোধ। বিয়ের পর একজন মেয়েকে পুরোপুরি পাব, সে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত হবে, তার ওপর পরিপূর্ণ নির্ভর করা যাবে, এসব হল পুরুষদের মজ্জাগত আকাঙক্ষা। কিন্তু ভেবে দেখলে দেখবি, বড় করে পাত পেতে লাভ নেই, যে দেয় সে তার আন্দাজ মতোই দেয়। বিলু বা সংসারের আর কারও কাছ থেকে কিছু চাসনি, প্রীতম। শুধু বেঁচে থাকাটাকই বড় করে দেখ।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, আমি আর মাথা ঘামাচ্ছি না সেজদা। ঘটনা যাই হোক, আমার তো সত্যিই তাতে কিছু যায় আসে না।
এতক্ষণে বুঝেছিস বোকারাম।
কিন্তু বেঁচে থাকারও তো আর আমার কোনও দরকার নেই।
কেন? ওকথা কেন বলছিস? এতক্ষণ তা হলে কী বুঝলি?
আমি যা বুঝেছি তা তুমি কোনওদিন বুঝবে না। তোমাকে কী করে ভালবাসার তত্ত্ব বোঝাব বলো তো?
বোঝালে বুঝব। বল শুনি।
আমি যে বিলুকে ভালবাসি সেটা বোঝো?
দীপনাথ গম্ভীর হল। সে ভেবেছিল বিলুকে গুরুত্বহীন করে দিয়ে প্রীতমকে শান্ত করা যাবে। সেটা হয়নি। এর মধ্যে একটা ভালবাসার চোরকাটাও বিধে আছে তা হলে। সে বলল, ভালবাসবি না কেন?
অত আলগাভাবে কথাটা ভেবো না। আমি জানি তুমি আজও সত্যি করে কাউকে ভালবাসোনি। বেসেছ?
কে জানে বাবা!
বাসোনি। সংসারে তোমার কোনও ইনভলভমেন্ট নেই বলেই অত সহজে সব ঘটনাকে উড়িয়ে দিতে পারলে। আমি তোমার মতো অত বেপরোয়া হব কী করে? ভালবাসলে তা হওয়া যায় না।
তা হলে কী করবি?
বিলু কোথায়? তাকে ডাকো, আমি আজ তোমার সামনে বিলুকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব।
দীপনাথ চমকে ওঠে, বলিস কী? তুই কি পাগল? ওসব কথা এভাবে বলতে নেই।
প্রীতম শান্তভাবে অকপট চোখে চেয়ে বলল, কথাটা বিলুকে এতদিন জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি। কী জানি যদি অপমান বোধ করে দোতলা থেকে ঝাপ দেয়। আজ তুমি আছ, তোমাকে মাঝখানে রেখে কথাগুলো বলব।
দীপনাথ শক্ত করে প্রীতমের হাত চেপে ধরে কঠিন গলায় বলে, না প্রীতম, এ কাজ করিস না।
সেজদা, আমি শিলিগুড়ি চলে যাচ্ছি। শেষবারের মতো। আর কখনও বিলুর সঙ্গে দেখা হবে না। কথা কা জেনে গেলে নিশ্চিন্তে যাওয়া হবে। নইলে বড় ছটফট করব যে।
না, প্রীতম।
কেন নয়?
আমি বিলুর দাদা। খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।
আমি খারাপ কিছু বলব না, সেজদা। শুধু জিজ্ঞেস করব, ও অরুণকে সত্যিই ভালবাসে কি না। যদি বাসে তা হলে কী করে বাসে? কীভাবে সেটা সম্ভব হল? আর যদি সম্ভব হয়েই থাকে তবে আমি কোন বিশ্বাসে এতকাল বেঁচে ছিলাম? কার জন্য রোজগার করেছি, কাকে ভেবে দিনের শেষে বাড়ি ফিরে এসেছি?
পৃথিবীটা কীরকম তা কি জানিস না, প্রীতম?
না জানি না। আমি বিলুকে আজও ভালবাসি। তাই আমি ওকে জিজ্ঞেস করব, বাকি জীবন ও অরুণকে ঠকাবে কি না। যদি ঠায় তবে ঘরে ঘরে সেই ঠকানোর হাওয়া গিয়ে লাগবে কি না। আমি স্পষ্ট কথা জানতে চাই।
তুই আজ বড় ছেলেমানুষি করছিস, প্রীতম। তোর বোঝা উচিত, দুনিয়ার সব সত্য জানতে নেই। এগুলো না জানলেও তোর চলবে।
তুমি ভাবছ আমি মরে যাব বলেই এসব কথা না জানা ভাল। তাই না সেজদা?
না প্রীতম, তা নয়।
আমি জানি।
তুই ভুল জানিস।
বিলুকে ডাকো।
না। তুই একটু শান্ত হ।
নিজের বোনকে আড়াল করতে চাইছ না তো?
ছিঃ প্রীতম। তুই কি জানিস না, বিলুর চেয়েও আমার কাছে তুই-ই বেশি ইম্পর্ট্যান্ট?
প্রীতম ক্লান্তিতে চোখ বুজল। তারপর সামান্য দমফোট গলায় বলল, বিলুকে ডাকার দরকার নেই। ও সবই শুনেছে। ভিতরের ঘরের পরদার আড়ালে এতক্ষণ ছিল।
দীপনাথ একটু তটস্থ হয়, তাই তো। বিলুর না শোনার কথা নয়। ফ্ল্যাটবাড়ির ঘরের মধ্যে ঘর। কান পাতলেই শোনা যায়। সে নিচু হয়ে ফিস ফিস করে বলল, কেন শোনালি, প্রীতম?
প্রীতম চোখ বুজে রেখেই হাসল। বলল, শোনাতে চেয়েছিলাম। একটু শুনুক। তাতে ওর ভাল হবে।
দীপনাথ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ইদানীং তাকে বড় বেশি স্বামী-স্ত্রীর সমস্যায় জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। অভিজ্ঞতা বড় কম হল না। তবু প্রীতমের এই নিষ্ঠুরতার কোনও তুলনা হয় না। তার মেজদা প্রকাশ্যে বউয়ের নামে কুৎসা রটিয়েও এতটা তীক্ষ লড়াই তৈরি করেনি।
ভিতরের ঘরের পরদা সরিয়ে হঠাৎ বিলু চৌকাঠে দেখা দেয়। মৃদু স্বরে বলে, সেজদা, শোনো।
দীপনাথ জড়তা কাটিয়ে ওঠে।
পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে বিলু মৃদু স্বরে বলে, ও কী বলছিল, সেজদা?
কেন, তুই শুনিসনি?
একটু-আধটু কানে এসেছে।
