আজকাল একবার চাকরি ছাড়লে আর কি সহজে পাওয়া যায়?
চাকরিটাকে অত ইম্পর্ট্যান্স দিচ্ছিস কেন?
বিলু ধীরে ধীরে মুখ তুলল। বেশ কঠিন মুখ। ধীর শান্ত গলায় বলল, চাকরিটা এখন আমাদের কাছে খুব জরুরি।
প্রীতমের চেয়েও?
একটা শ্বাস ফেলে বিলু বলল, প্রীতম তো বাঁচবে না, সেজদা। তারপর আমার আর লাবুর কী হবে? কে দেখবে আমাদের? অনেক ভেবেচিন্তে তাই চাকরিটাকে ধরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে ঠিক করেছি।
কথাটা নির্ভেজাল ভাবাবেগহীন সত্য। তবে বড্ড বেশি নির্লজ্জ অকপট। দীপনাথ এ ধরনের নগ্ন সত্যকে পছন্দ করে না। বিরক্ত হল, অস্থির বোধ করল, কিন্তু সঠিক কোনও জবাবও এল না মুখে।
শতম বেরিয়েছে, প্রীতম অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তাই দীপনাথ বাইরের ঘরেই বসে রইল অনেকক্ষণ। বিলু গিয়ে নিজে চা করে আনল, একটা ধোয়া পাজামা এনে রাখল পাশে। দীপনাথ আনমনে খানিকক্ষণ আকাশ-পাতাল ভাবল।
হঠাৎ বলল, তুই তা হলে এই ফ্ল্যাটে একাই থাকবি?
আমি আছি, লাবু আছে, অচলা আর বিন্দুও থাকছে। ঠিক একা তো নয়।
তবু একে একাই বলে। পুরুষ অভিভাবক তো থাকছে না।
খুব ভাল হত যদি তুমি এসে থাকতে। তিনটে ঘর আছে, তোমার কোনও অসুবিধা হত না।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলল, সেটা সম্ভব নয়। এ বাড়িতে প্রীতম নেই, এটা আমার সহ্য করা মুশকিল।
তুমি বড্ড সেন্টিমেন্টাল সেজদা। প্রীতমকে আমি কারও চেয়ে কম ভালবাসি না, কিন্তু রিয়্যালিটিকে তো মেনে নিতেই হবে। প্রীতম চলে গেলে এ বাসায় আমিও তত থাকব।
দীপনাথ জবাব দিল না। বিলুও আর দ্বিতীয়বার তাকে এ বাসায় থাকার কথা বলল না।
দীপনাথ জিজ্ঞেস করে, প্রীতম কেন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বললি না?
ভ্রু কুঁচকে বিলু বলে, কী করে বলব? তবে সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসে ওকে খুব ইমোশনাল দেখেছিলাম। এমন সব কথা বলছিল যার কোনও মানে হয় না।
কীরকম কথা?
বলছিল, ও শিগগিরই মরে যাবে। তারপর আমি যেন বিয়ে করি। এইসব কথা।
এরকম কথা তো সহজে বলে না প্রীতম। সেদিন কেন বলল?
তা তো জানি না।—বলে বিলু চোখ সরিয়ে নিল।
ও কখনও মরার কথা ভাবে না। অসম্ভব বেঁচে থাকার ইচ্ছে ওর। তবে কেন ওরকম কথা বলব? তোকে আবার বিয়ে করতে বলবে এমন ছেলেমানুষও তো প্রীতম নয়।
বলল তো।
প্রীতমের ওপর একটু রাগ হয় দীপনাথের। বলে, তা পাত্রটাও প্রীতমই ঠিক করে দিয়ে যেত না হয়।
বিলু খুবই অস্বস্তি বোধ করছে। আঁচলটা গায়ে টান টান করে জড়িয়ে শাড়ির খুটটা আঙুলে জড়াচ্ছে। মুখ তুলছে না, কিন্তু ওর ছটফটানি স্পষ্ট বোঝা যায়। দীপনাথ খর চোখে বোনকে। দেখছিল। একটা আবছা সন্দেহ খেলে যায় মনে।
বিলু কিছু বলল না। খানিক অপেক্ষা করে দীপনাথ বলল, প্রীতমকে আজ একটু বকব। এসব কথা কেন বলবে ও?
মৃদু দৃঢ়স্বরে বিলু বলে, না। কিছু বলার দরকার নেই। হয়তো ভুল বুঝবে। ভাববে, আমি তোমার কাছে নালিশ করেছি।
নালিশ তো করাই উচিত।
ওর এখন ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই। অন্যরকম হয়ে গেছে। কিছু বললে হয়তো খেপে উঠবে।
প্রীতম খেপে উঠবে! কথাটা বিশ্বাসই করা যায় না। প্রীতমের কোনওদিন রাগ দেখাই যায়নি। সেই ছেলেবেলায় শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার রাস্তায় দীপনাথের হাতে মার খেয়ে ছেলেমানুষের মতো অসহায় আক্রোশে চেঁচিয়েছিল প্রীতম। বড় হয়ে সে হয়ে উঠেছে শান্ত, নির্বিরোধী এবং প্রায় ব্যক্তিত্বহীন এক মানুষ। স্ত্রৈণ? না, ঠিক স্ত্রৈণও বলা যায় না প্রীতমকে। কোনওদিন ঝগড়া করেনি বিলুর সঙ্গে, মতে মত দিয়ে চলেছে, তবু আলাদা একটা সত্তাও বেঁচে ছিল তার মধ্যে। বিলু প্রীতমকে হয়তো কোনওদিনই ঠিকমতো বোঝেনি।
অচলা এসে খবর দিল, প্রীতম জেগেছে।
নিঃশব্দে দীপনাথ গিয়ে প্রীতমের পাশটিতে বসে। ওর রোগা দুর্বল হাতখানা নিজের হাতে তুলে নেয়।
প্রীতমের মুখে আজ হাসি ফুটল অনেক দেরিতে। মৃদু স্বরে বলল, ক’বছর পরে এলে?
বছর! দূর পাগলা। অফিসে দিন সাতেক খুব ভুতুড়ে খাটুনি চলছে।
জানি তুমি কাজের লোক।
অপদার্থ বলেই তো খাটতে হয় বেশি। তোর মতো কোয়ালিফিকেশন থাকলে খাটতে হত না।
কোয়ালিফিকেশন কোন কাজে লাগল, সেজদা?
লাগবে। সেরে ওঠ, দেখবি।
তুমি কি ছেলেমানুষ হয়ে গেলে, সেজদা! সেরে ওঠ বললেই কি সেরে উঠব?
তোর কী হয়েছে বল তো? আগে তো সবসময়ে বলতিস ভাল আছি।
আজকাল আমি ভাল নেই।
কেন ভাল থাকিস না? কেন মেজাজ খারাপ করিস?
বেঁচে থেকে কী হবে? কিসের ওপর দাঁড়িয়ে বাঁচে মানুষ? কোন আশায় রোজগার করে কোন পিপাসায় সারাদিন ভূতের মতো খেটে বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে?
কী সব যা-তা বলছিস?
পায়ের নীচে মাটি সরে গেলে মানুষ আর বেঁচে থাকবে কেন?
অনেক রোগা, দুর্বল, নির্জীব দেখাচ্ছে প্রীতমকে। কণ্ঠস্বর তত স্পষ্ট নয়। তবু তার ভিতর থেকে একটা ঝাঝ আসছে।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলল, চুপ কর। দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে নেই।
তার মানে?
তুই বা বলতে চাইছিস তা আমি জানি।
সামান্য অবাক হয়ে প্রীতম বলে, জানো? কী জানো বলো তো?
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, এ ঠিক জানা নয়। আন্দাজ। তবে আন্দাজটা হয়তো মিথ্যে নয়। বলব? শুনে তোর কী লাভ, প্রীতম? বরং জেনে রাখ, তুই যেমন জানিস, আমিও তেমন জানি।
দীপনাথের হাতটা কাকের পায়ের সরু দাঁড়ার মতো আঙুলে চেপে ধরার চেষ্টা করে প্রীতম এই প্রথম মন খুলে হাসল। গভীর একটা শ্বাস ফেলে বলল, জানো! তুমি জানো! কী করে জানলে? নিজের চোখে কিছু দেখেছ?
