অরুণ ডাকছে, প্রীতম! প্রীতমবাবু!
উঃ।
কেমন লাগছে?
ভাল নয়। একদম ভাল নয়। এখানে কী করে থাকব?
কপালে একটা ঠান্ডা হাত স্পর্শ করে। প্রীতম চোখ মেলে চায়।
অস্বচ্ছতা অনেকটাই কেটে গেছে প্রীতমের। দীর্ঘ ঘুমের পর শরীরের নিস্তব্ধতা আছে, কিন্তু ক্লান্তি নেই।
নিজের ঘরখানাকে চিনতে পারে প্রীতম। চিনতে পারে সামনে দাঁড়ানো অরুণকেও। ফটফটে সাদা একটা টি-শার্ট তার গায়ে। সুন্দর মুখে কিছু উদ্বেগ, একটা খুব সুন্দর গন্ধ ভাসছে বাতাসে।
অরুণ তার কপাল থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছেন?
আধো জাগরণে যে জবাব দিয়েছিল প্রীতম এখন জাগ্রত অবস্থায় ঠিক তার উলটো বলল, ভাল আছি। খুব ভাল আছি।
আমাকে চিনতে পারছেন তো?
আপনি! আপনি তো অরুণ!
বাঃ! চমৎকার!
প্রীতম হাসবার চেষ্টা করল। এখনও কানে মৃদু হেলিকপ্টারের শব্দ লেগে আছে। বলল, কিন্তু অত দূরে আমি যেতে পারব না।
কোথায় যাওয়ার কথা বলছেন?
ওই যেখানে আপনি নামিয়ে দিয়ে আসতে চেয়েছিলেন আমাকে।
আমি!—বলে অবাক হতে গিয়েও অরুণ মৃদু হেসে ফেলে, আপনি বোধহয় হ্যালুসিনেশন দেখছিলেন।
অনেক দূর! কিন্তু সে জায়গাটাও সুন্দর।
অনেক দূরে আপনাকে যেতে হবে না প্রীতমবাবু। ইউ আর উইথ আস।
বিলু আর লাবুর কী হবে?
অরুণ চেয়ার টেনে বিছানার পাশে বসে। কপালে হাত রাখে। তারপর মৃদু স্বরে বলে, বিলু আপনার জন্য কান্নাকাটি করছে প্রীতমবাবু। এখন আপনার একটু স্টেডি হওয়া উচিত।
প্রীতমের ঘোর-ঘোর ভাবটা অল্প কেটে যাচ্ছে। সে বড় একটা শ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকে। শরীরে জীবাণুদের কোলাহল। সে একটু একটু করে পা নাড়ল, হাত নাড়ল। না, এখনও সাড় আছে। চোখ চেয়ে সে ভাল করে চারদিকটাকে দেখে নিল।
অরুণের দিকে চেয়ে বলল, আমি শিলিগুড়ি চলে যাচ্ছি।
শুনেছি। কিন্তু কাজটা কি ভাল হচ্ছে?
কেন? কাজটা কি খারাপ?
বিলু একা হয়ে যাবে।
কেন, আপনি তো আছেন।
ডোন্ট বি এ ফুল। আমি কে? বিলুর জন্য আমি কী করতে পারি?
আমিই বা বিলুর কে? আমরা কেউ কারও নই।
আপনাদের কি ঝগড়া হয়েছে প্রীতম?
না, ঝগড়া কেন হবে?
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখলে আজকাল আমি খুব ভয় পাই। আমিও শিগগির বিয়ে করতে যাচ্ছি কিনা।
প্রীতম বড় বড় চোখে চেয়ে থাকে অরুণের দিকে।
অরুণ মৃদু হেসে বলে, ইটস টু।
৪১. কলকাতায় এবার খুব বৃষ্টি হচ্ছে
কলকাতায় এবার খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ভীষণ বৃষ্টি। দুপুর বা বিকেলের দিকে প্রায়দিনই ঝমাঝম বৃষ্টি এসে পথঘাট ডোবাচ্ছে। ট্রাফিক জ্যাম। বৃষ্টির জ্বালাতেই ক’দিন প্রীতমের কাছে যাওয়া হয়নি দীপনাথের। অবশ্য অফিসের কাজও বেড়েছে। প্রায় দিনই কাজ শেষ করতে সন্ধে সাতটা-আটটা বেজে যায়। নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের মধ্যে একজন মাত্র কাজে যোগ দিয়েছে। বাকিরা আরও দিন পনেরো পরে আসছে। সুতরাং দীপনাথকে একাই তিনগুণ খাটতে হচ্ছে।
সপ্তাহখানেকের মাথায় দুপুরে বিলুর টেলিফোন এল।
সেজদা! আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি টুরে বাইরে গেছ। বহুদিন খবর নিচ্ছ না।
না রে। নতুন পোস্টে কাজের প্রেশার ভীষণ। রোজ বিকেলের দিকে বৃষ্টিও নামছে এখন। প্রীতম কেমন?
খোঁজও তো নাওনি। আমার অফিস তোমার অফিস থেকে মোটে দু’কদম।
বিলু ঠিক এভাবে অভিমানের গলায় কখনও কথা বলে না। বরাবরই ও একটু কাঠ কাঠ। তাই সামান্য অবাক হচ্ছে দীপনাথ। সে বলল, রোজই যাব-যাব করছি বলে আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। তোরা সবাই ভাল আছিস তো? প্রীতম কেমন আছে আগে বল।
মাঝখানে একটু ক্রাইসিস গেছে। একদিন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
বলিস কী?
সিরিয়াস কিছু নয়, তুমি তো খবর রাখো না, এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে।
কী ঘটনা?–উদ্বেগের গলায় দীপনাথ বলে।
এসো বলব। আজ আসবে?
ঘড়ি দেখে দীপনাথ বলে, মোটে পাচটা বাজে। যেতে দেরি হবে।
হোক, তবু এসো। আজ আমাদের ওখানেই রাতে থেকো। অনেক কথা আছে।
থাকব?—বলে একটু দ্বিধা করে দীপনাথ। দ্বিধার কিছু নেই, বোনের বাড়িতে লোকে থাকতেই পারে। তবু ওই হল দীপনাথের স্বভাব।
তুমি বোধহয় জানো না, শতম এসেছে।
তাই বুঝি! কবে এল?
দিন আট-দশ। প্রীতমকে শিলিগুড়ি নিয়ে যাচ্ছে।
শিলিগুড়ি!—খুব অবাক হয়ে দীপনাথ বলে, সে কী রে! প্রীতম যে শিলিগুড়ি যাবে না বলেছিল আমাকে।
মত পালটেছে।
যাচ্ছে তা হলে?
গলাটা হঠাৎ একটু ভেঙে গেল বিলুর! বলল, যাচ্ছে। তুমি আজ এসো কিন্তু। ভীষণ দরকার।
তুই প্রীতমকে যেতে দিতে রাজি হয়েছিস?
আনাব মতামতে কিছু যায় আসে না।
কবে যাচ্ছে?
পরশু। রিজার্ভেশন হয়ে গেছে। বাঁধাছাঁদা চলছে।
তুই সঙ্গে যাবি না?
আমাকে তো যেতে বলেনি। বললে হয়তো কিছুদিনের জন্য যেতাম।
টেলিফোনে আর কিছু বলল না দীপনাথ। যদিও একটা রাগের হলকা তার মগজটাকে চেটে নিচ্ছিল। কিন্তু রাত্রে প্রীতমের বাড়ি গিয়ে বাইরের ঘরে বিলুকে ধরল দীপনাথ।
বিলু, প্রীতমের চেয়ে কি চাকরিটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট? তুই ওর সঙ্গে যাচ্ছিস না কেন?
বললাম তো, ওরা আমাকে যেতে বলেনি।
এটা কি প্রোটোকলের সময় যে, না বললে যাবি না?
ওরা যদি আমাকে না চায়, তবে কেন যাব?
তবু যাবি। হয়তো তুই যেতে চাস না ভেবে ওরা বলছে না। ওদেরও প্রেস্টিজ আছে।
বিলু মুখ নিচু করে শক্ত হয়ে রইল। ভীষণ গোঁ।
ছুটি পাবি না?—দীপনাথ কোমল গলায় জিজ্ঞেস করে।
হয়তো পাব, তবে বেশিদিন নয়।
তবে চাকরিটা ছেড়ে দে না কেন?
