শতম যেন এরকম কথার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বলল, স্বামীকে আগলে রাখাই স্ত্রীর কাজ। বউদি, সে কাজটাও তুমি ভাল করে করছ? একে কি আগলে রাখা বলে?
অত কথায় কাজ নেই শতম। নিতে এসেছ নিয়েই যাও। তোমাদের কাছেই হয়তো ও ভাল থাকবে।
আমাদের সঙ্গে তুমি কোনও সম্পর্ক রাখো না বলে হয়তো জানোই না, আমরা কেমন লোক। যদি জানতে তা হলে দাদাকে নিয়ে যেতে চাইছি বলে রাগ করতে না। কিন্তু তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, দাদাকে আমরা প্রাণপণে আগলে রাখব। মাইনে করা লোকের হাতে ছেড়ে দিয়ে চাকরি করতে যাব না।
বিলু নিঃশব্দে উঠে ভিতরের ঘরে চলে এল। রাতে ঘুম হয়নি, শরীর জুড়ে ব্যথা আর ক্লান্তি। সঙ্গে উদ্বেগ, অশান্তি, লজ্জা, পাপবোধ। সে এসে প্রীতমের বিছানায় বসল। কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না বিলু। প্রীতমের প্রতি তেমন উথালপাথাল ভালবাসা কোনওদিনই ছিল না তার। কিন্তু এখন মনে হয়, প্রীতম চলে গেলে তার পায়ের তলা থেকে একটা পাটাতন সরে যাবে বুঝি!
কিন্তু এই বোধ তো সত্য নয়। প্রীতমের ওপর কোনওদিক দিয়েই সে নির্ভরশীল নয়। কাজেই যুক্তি দিয়ে নিজের ভাবাবেগকে দমিয়ে দিতে পারল সে। অরুণের কাছে সে শিখেছে, দুনিয়ার কালো দিকগুলি, হতাশার কথাগুলি, দুঃখের বোধগুলিকে পাত্তা দিতে নেই। অরুণ উপদেশ দিয়ে এসব তো শেখায়নি, তাকে দেখেই শিখেছে বিলু। অরুণ ঠিক ওইরকম। কোনওদিন কোনও ঘটনাই তাকে বিমর্ষ করে না।
বিলু শতমের জ্বালা-ধরানো কথাগুলো নিয়ে ভাবল না আর। ভাববে কেন! ওর দাদাকে ও নিয়ে যাক। বিলুর পৃথিবী যেমন ছিল তেমনই থাকবে। হয়তো আর-একটু স্বাধীনতার স্বাদ পাবে সে। একটু মন কেমন করবে প্রীতমের জন্য। তা করুক। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গিয়ে কত লোক কত শোক তাপ সহ্য করে।
আস্তে আস্তে প্রীতমের পাশে ছোট পরিসরে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে কখন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল বিলু।
ছোট, গোল রোদেভরা সবুজ পৃথিবীটা হেলিকপ্টারের তলায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল প্রীতম। পৃথিবীটা যে এত ছোট তা সে জানত না। কোনও শহর গা চোখে পড়ে না। শুধু কিছু সবুজ ছোট ছোট পাহাড়, একটা ঘন বনাকীর্ণ উপত্যকা, ফুলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সেখানে। একটা ছলছলে পাহাড়ি নদী গেছে এঁকেবেঁকে। আর একটা ন্যারোগেজের রেল লাইন। অনেক প্রজাপতি উড়ছে, পাখি উড়ছে। দেখতে দেখতেই পৃথিবীটা একটা পাক খেল। ও পিঠেও জনবসতি নেই, একটা ছোট নীল সমুদ্র, একটা বরফে ঢাকা পাহাড়, আর একটা মাঠের ভিতরে সরু মেঠো পথ দেখতে পায় সে। এত সুন্দর জায়গাটা যে, প্রীতম হেলিকপ্টারে কাচের মতো স্বচ্ছ তলাটায় উপুড় হয়ে পড়ে একদৃষ্টে লোভীর মতো চেয়ে থাকে। কিন্তু হেলিকপ্টারটা বারবার চেষ্টা করেও ছোট্ট সুন্দর পৃথিবীটাকে স্পর্শ করতে পারছে না। কোথাও এক অদৃশ্য বলয় বাধা দিচ্ছে। দূরত্বটাকে অতিক্রম করা যাচ্ছে না। চোখে গগলস্ আর হাতে দস্তানা-পরা পাইলট খুব চেষ্টা করছে অবশ্য। কিন্তু হচ্ছে না।
মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার ঝম করে নেমে যাচ্ছে, ছুঁইছুঁই দুরত্বে এসে যাচ্ছে। কিন্তু সুন্দর ছোট্ট গোল রূপকথার রাজ্যের মতো পৃথিবীটা অমনি একটা পাক খেয়ে সরে যাচ্ছে দুরে। অনেকটা দূরে।
তখন ভয়ে হতাশায় ককিয়ে উঠছে প্রীতম। হাত তুলে বলছে, পাইলট! পাইলট! নামাও।
বিরক্ত পাইলট বলে, কী করব? চেষ্টা তো করছি।
আরও চেষ্টা চাই। আরও চেষ্টা।
আমার হেলিকপ্টারে যতটা ক্ষমতা ততটা চেষ্টা করছি। পৃথিবীটা যদি অমন বদমাইশি করে তবে কী করব বলুন!
প্রীতম ভয়ে ঘেমে ওঠে। বলে, বিলু রয়েছে ওখানে, লাবু রয়েছে, আমাকে যে নামতেই হবে।
বিলু কি আপনার একার? আমারও কি নয়?
প্রীতম কেতড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাইলটের দিকে তাকাল। হেলমেটের নীচে ফর্সা ঘাড়, মসৃণ করে ছাঁটা কালো চুল, সুদৃঢ় ঠোঁটের একটু আভাস। ঠিকই তো। বিলু তো তার একার নয়, অরুণেরও।
প্রীতম বলল, আমার বড় কষ্ট হচ্ছে অরুণবাবু।
কেন বলুন তো! কষ্ট কিসের?
বেশি দুরে আমি কখনও যাইনি। আমার এক্ষুনি বিলুর কাছে ফিরে যাওয়া দরকার। আপনি হেলিকপ্টারটা নামিয়ে দিন।
অরুণ খুব বিষণ্ণ গলায় বলে, বিলু? এই পৃথিবীতে তো বিলু থাকে না। এখানে কেউ থাকে না। শুধু আপনি থাকবেন বলে এটা তৈরি করা হয়েছে।
একটু অবাক হয়ে প্রীতম বলে, সে কী? আমি একা এখানে থাকব কেমন করে?
তা তো জানি না। আমার ওপর হুকুম আছে, আপনাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে ফিরে যেতে হবে। তবে এ জায়গাটা খুব সুন্দর। আপনার বোধহয় ভালই লাগবে।
কিন্তু বিলুর কী হবে? লাবুর?
ওরা অন্য পৃথিবীতে ভালই থাকবে। ওদের মতো করে ভাল থাকবে।
সে পৃথিবীটা কত দূর?
কয়েকটা লাইট-ইয়ার।
লাইট-ইয়ার! এত দূর!
হ্যাঁ। দূরত্বটা কিছু বেশি।
হেলিকপ্টারটা হঠাৎ কাত হয়ে সাঁ সাঁ করে নামতে থাকে। ঘরঘর করে চপারের শব্দ হয়। নীচে সবুজ সাদা নীল ঘূর্ণির মতো ছোট্ট পৃথিবীটা পাক খায়।
নামছি।–বলে অরুণ চেঁচিয়ে ওঠে।
না, না! আমি ফিরে যাব তরুণ!
ফেরার উপায় নেই প্রীতমবাবু।
ফিরতেই হবে। বিলু, লাবু একা। বড় অসহায়।
একা কেন? আমি তো রয়েছি।
তা বটে।-বলে আবার হতাশায় ভেঙে পড়ে প্রীতম।
খুব কাছাকাছি এসেও তাদের হেলিকপ্টারের নাগাল এড়িয়ে পৃথিবীটা সরে যায় এপাশে, ওপাশে।
দুষ্টুমিটা দেখছেন?—অরুণ বিরক্ত হয়ে বলে।
প্রীতম জবাব দেয় না। কাচের ওপর উপুড় হয়ে থাকে। চোখে জল আসে। তবু মনে কোনও ভার নেই। একা এই পৃথিবীতে তাকে কতকাল বেঁচে থাকতে হবে? অনন্তকাল! অসীম সময় কী করে একা কাটাবে প্রীতম?
