বিলু উঠে সরে বসল। মন দিয়ে দেখতে লাগল, অচলা কী সুন্দর পটু হাতে অল্প অল্প করে দুধ খাইয়ে দিচ্ছে প্রীতমকে। গলায় পরিষ্কার একটা ভোয়ালে দিয়ে নিয়েছে।
বিলু আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, অচলা, আমার মনে হচ্ছে ও লোকজন চিনতে পারছে না। তুমি একটু দেখো তো!
অচলা মুখ না তুলেই বলল, ডাক্তার আসুন, উনিই বুঝবেন।
তুমি কিছু বুঝতে পারছ না?
আমি পেশেন্টের অবস্থা খুব ভাল দেখছি না।
কী হল বলো তো?
কী করে বলব! কালও তো নর্মাল ছিলেন। আজ কেমন অন্যরকম দেখছি।
দুধ খাইয়ে অচলা গরম জলে ভেজানো তোয়ালে এনে প্রীতমের মুখ মুছিয়ে চুলগুলো পাট করে দিল। একটু ট্যালকম পাউডার ছড়িয়ে দিল গায়ে। একটা ওষুধ খাওয়াল। তারপর বলল, পেশেন্ট এবার ঘুমাবে। আপনারা ও ঘরে যান।
প্রীতম বাস্তবিকই ঘুমিয়ে পড়ে।
ডাক্তারের জন্য শতম ঘর-বার করতে করতে বারবার ঘড়ি দেখতে থাকে। আঁচলে শরীর জড়িয়ে বাইরের ঘরের সোফায় কোণ ঘেঁষে বসে থাকে বিলু। একদম স্থবিরের মতো। বাড়ির আবহাওয়ায় বিষণ্ণতা টের পেয়ে লাবু দ্বিতীয় শোওয়ার ঘরে গিয়ে খাটের নীচে ঢুকে পুতুল খেলতে বসে।
এতদিন বলার সুযোগ হয়নি, কিন্তু আজ রাগ বিরক্তি শোক সব মিশে শতম নিজেকে সামলানোর চেষ্টা না করেই হঠাৎ বলে ফেলল, এখানে দাদার যত্ন হচ্ছে না বউদি। এবার আমি দাদাকে শিলিগুড়ি নিয়ে যাব।
এ কথার কোনও জবাব মাথায় এল না বিলুর। অনেকক্ষণ ধরে তার মনের মধ্যে ওই কথাটাই প্যারেড করে বেড়াচ্ছে, প্রীতমকে নিয়ে যাবে! প্রীতমকে নিয়ে যাবে।
বিলু শতমের দিকে চেয়ে থেকে মনের সেই কথাটাই মুখ দিয়ে বলল, নিয়ে যাবে!
শতম সামান্য চড়া গলায় বলে, তুমি অফিসে চলে যাও। সারাদিন দাদা তো একা থাকে। আয়া-টায়ারা কি ঠিকমতো সেবাযত্ন করতে পারে?
বিলু আবার বলে, নিয়ে যাবে!
তুমি বাধা দিয়ো না বউদি। দাদার ভালর জন্যই বলছি।
বিলুর ভিতরে যে ঠান্ডা কঠিন এক মানুষ ছিল সে গলে জল হয়ে গেছে। এখন বিলুর মাথার ঠিক নেই। সে খুবই শুষ্ক সরু অসহায় এক গলায় বলল, প্রীতম যদি আর ফিরতে না পারে।
শতম গম্ভীর হয়ে বলল, কী হবে তা তো জানি না। তবে শিলিগুড়ি তো মোটে এক রাতের পথ। প্লেনে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। যখন তখন ইচ্ছে হলে চলে যেতে পারবে। ভাবছ কেন?
এত অসহায় বিলু কখনও বোধ করেনি। সে নিজের চারদিকে একবার হরিণের মতো ত্রস্ত চাউনিতে দেখে নিল। কিন্তু আসলে কিছুই দেখল না। কোথাও কিছু নেই দেখবার মতো। নিজের করতলের দিকে চেয়ে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, তুমি কি ওকে নিয়ে যেতেই এসেছিলে শতম?
বলতে পারো তাই। দাদা অমত করলে নিতাম না। কিন্তু দাদা এবার অমত করেনি।
আমারও তো একটা মতামত আছে।
ক্রুদ্ধ শতম বিলুর দিকে ষণ্ডামর্কের মতো তাকিয়ে বলল, তোমার মতটা তা হলে কী? দাদা এইখানে এইভাবে শেষ হোক?
বিলুর আজ মনের জোর নেই। যদি গতকাল অরুণের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাটা না হত, যদি ওভাবে ভেসে না যেত সে, তবে আজ রুখে উঠতে পারত বিলু। অরুণ কোনও সংস্কাব মানে না, বড় বেশি সাহসী। কোনওদিন বিলুর ওপর এই লোভ প্রবল ছিল না অরুণের। কাল সেই লোভ দেখা দিল। বলল, অবশেষে আমার বিয়ের ব্যাপারটা ঠিক হয়ে গেল বিলু। হয়তো জানুয়ারিতে। তার আগে পর্যন্ত এই সময়টুকু আমাদের। অরুণ বিয়ে করছে—এই খবরে একই সঙ্গে বিষাদ ও ক্রোধ চেপে ধরেছিল বিলুকে। আর সব মিলিয়ে হয়ে গেল ওই অদ্ভুত কাণ্ডটা। কেউ জানে না, তবু তারপর থেকেই বিলুর ভিতরে একটা মিয়োনো ভাব, পাপবোধ, চকিত শিহরন খেলে যাচ্ছে। অকারণেই মাঝে মাঝে চমকে উঠছে সে, ভয় ভয় করছে তার, লজ্জা পাচ্ছে।
বিলু মাথা নেড়ে বলল, যেখানে গেলে ওর ভাল হবে সেখানেই নিয়ে যাও। আমি ওর ভালই তো চাই।
তা হলে তোমার মত আছে বলছ?
থাকার কিছু তো নয়। তবে আমাকে তোমরা কেউ একবারও তো জিজ্ঞেস করোনি। আমি কি কেউ নই?
কথাটা বলতে বলতে বিলুর চোখ ভিজে এল। এ ঘটনা তার জীবনে এতই বিরল যে, কখনও নিজের চোখে জল এলে সে নিজেই অবাক হয়। এখন অবশ্য হল না। তবে মুখ ফিরিয়ে শতমের চোখ থেকে মুখ আড়াল করল।
শতম বলল, এটা প্রোটোকলের সময় নয় বউদি। অনুমতি বা তা নিয়ে মন কষাকষি এসব খুব ছেলেমানুষি ব্যাপার। দাদার এখন লাইফ অ্যান্ড ডেথ-এর প্রশ্ন।
বিলুর মনটা তার স্বাভাবিক কাঠিন্য ও শীতলতা কিছুটা ফিরে পেল এ কথায়। সে ঠান্ডা গলায় বলল, নিয়ে যাও, কিন্তু সঙ্গে আমি যেতে পারব না।
সেটা জানি। কিন্তু গেলে তোমার কোনও ক্ষতি হত না। শিলিগুড়ির বাড়িটাও তোমারই বাড়ি।
ভ্রু কুঁচকে বিলু বলে, ওসব কথা থাক শতম।
শতম কথাটা কানে না তুলে বলে, তোমাদের সেখানে একটু কষ্ট হতে পারে, কিন্তু চলেও যাবে। তোমাদের সব খরচ আমরা চালিয়ে নিতে পারব।
আমাদের খরচ সম্পর্কে তোমার কোনও ধারণাই নেই, তাই বলছ। কিন্তু ও কথা নিয়েও এখন কিছু বলতে চাই না। প্রীতম ইচ্ছে করলে তার যা টাকাপয়সা আছে তা তুলে নিয়ে যেতে পারে।
শতম একটু হকচকিয়ে গেল। বলল, দাদার টাকা নিয়ে আমরা কী করব? টাকার কথা ওঠেই। আমরা শুধু দাদাকেই নিয়ে যেতে চাই।
ওর ওপর তোমাদের অধিকার অনেক বেশি।
শতম মাথা নেড়ে বলে, ওটা তোমার রাগের কথা।
আমার মতো অবস্থায় যদি কাউকে বছরের পর বছর কাটাতে হত তবেই সে বুঝতে পারত আমার রাগ কেন হয়। এতকাল প্রীতমকে আগলে রেখেছি, হঠাৎ এখন তোমরা ভালমানুষ সেজে ওকে নিয়ে যেতে চাইলে রাগ কি হতে পারে না?
