দীপ ভিতরের ঘরের পরদা সরাতেই দেখল, প্রীতম প্রাণপণ চেষ্টায় একা একাই উঠে লেপটা সরিয়ে পাজামা পরা পা দুটো খাট থেকে নামানোর চেষ্টা করছে। কাঠির মতো শুকিয়ে এসেছে পা, হাত দুটোও কমজোরি হয়ে আসছে ক্রমে। শরীরটা এখন ভারী বে-টপ দেখায়। আচমকা দেখলে লোকে ভাববে, মানুষটা বেঁচে আছে কী করে?
শুধু মুখটাতে এখনও অসুস্থতা স্পর্শ করেনি প্রীতমকে। চোখের দৃষ্টি এখনও সজীব। পা ঝুলিয়ে স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের মতো বসবার চেষ্টা করতে করতে প্রীতম তার ব্যথা-ভরা সুন্দর মুখ-টেপা হাসিটা হাসে।
টিনের চেয়ার বিছানার ধারটিতে টেনে নিয়ে বসে দীপ জিজ্ঞেস করে, আকুপাংচারের তারিখ কবে ছিল?
আজই। এই তো ঘণ্টা দুয়েক আগেই ফিরেছি আমরা।
ডাক্তার কী বলল?
ভাল। অনেক ইমপ্রুভমেন্ট হয়েছে। আজ ছ’টা কি সাতটা ছুঁচ দিয়েছিল। তাই না বিলু? বলে বিলুর দিকে একবার ফিরে তাকানোর চেষ্টা করল প্রীতম। বিলু পিছন দিকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে খুব দ্রুত তার রুক্ষ চুলে চিরুনি চালাচ্ছিল। কিন্তু জটধরা চুলে চিরুনি চলতে চাইছে না। বিলুর রাগের হাত জটসুদ্ধ চুল ছিড়ে আনছে মাথা থেকে। প্রীতমের কথার জবাব দিল না বিলু।
প্রীতমের বালিশের পাশে ফলের ঠোঙাটা রেখে দিয়েছিল দীপ। প্রীতম তার সরু একখানা হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা ছুঁল, তৃপ্তির চোখে চেয়ে দেখল একটু। তারপর লাজুক গলায় বলে, এসব এনেছ কেন? আমি কি এখন আর আগের মতো খেতে পারি, বলো? আজ অরুণবাবুও ডাক্তারের কাছ থেকে আসার সময় একগাদা ফল কিনে আনলেন। কত বারণ করলাম।
বিলু ঘর থেকে চলে গেল রান্নাঘর আর ডাইনিং স্পেসের দিকে। খুব সতর্ক নিচু গলায় দীপ জিজ্ঞেস করল, আজ কি তুই অরুণের সঙ্গে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলি? বিলু সঙ্গে যায়নি?
প্রীতম মাথা নাড়ে। যায়নি। মুখে সেই অসম্ভব ভালমানুষের হাসি। দুটো হাতের পাতা কোলের ওপর জড়ো করা। হাড়ের ওপর চামড়া বসে যাচ্ছে খাঁজে খাঁজে। আঙুলের গিঁট জেগে উঠেছে, কংকালসার হয়ে যাচ্ছে হাতের পাতা। সেদিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকে প্রীতম। নিজের কররেখা দেখে। তারপর মুখ তুলে বলে, অরুণ বড় ভাল ছেলে। ও এলে বাড়িটা জমজম করে। বিলুরও মনটা ভাল থাকে।
এ কথায় দীপ খুব কুট চোখে প্রীতমের মুখখানা দেখে! না, প্রীতমের মুখে কোনও ছায়া নেই। দরজার ওপরে সাঁইবাবার একটা ছবি টাঙানো, সেই দিকে চেয়ে আছে।
অরুণ হয়তো ভালই। তবে একটু আবেগহীন, বাস্তববাদী। প্রীতমের এই অসুখটা আজ পর্যন্ত কোনও ডাক্তার ধরতে পারেনি ঠিকমতো। প্রথমদিকে একজন বড় ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে রোগটাকে আরও গাঢ়িয়ে তোলে। পরে অন্যান্য ডাক্তার বিস্তর কসরত করার পর হাল ছেড়ে দিয়ে বলেছে, এক ধরনের ইন্টারন্যাল ইনফেকশন। এ রোগের পরিণতি কী হতে পারে তা তারা কেউ স্পষ্ট করে বলেনি। তবে বুঝে নেওয়া যায় সবার আগে সেটা বুঝেছিল অরুণ। সে উপযাচকের মতোই প্রীতমকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোম্পানি থেকে ভলান্টারি রিটায়ার করাল। তাতে এক কাঁড়ি টাকা পেয়ে গেল প্রীতম। এল আই সি-র একজন চেনা এজেন্টকে ধরে করে অরুণ প্রীতমের একটা সত্তর হাজার টাকার পলিসি করিয়ে দিয়েছে। ব্যাংকে প্রীতমের অ্যাকাউন্টকে বিলুর সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করিয়েছে। আত্মীয়-স্বজন যখন রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে তখন ঠান্ডা মাথায় এই জরুরি কাজগুলি সেরে রেখেছে অরুণ। সে তোক ভাল হতে পারে, তবে তার মনে কোনও ভাবাবেগ নেই। পরোক্ষে সে কি প্রীতমকে তার পরিণতিটা জানিয়ে দিতে সাহায্য করেনি?
দীপ অন্য একটা কথাও মাঝে মাঝে ভাবে, অরুণ কি এসব প্রীতমের জন্যই করেছে? না কি বিলুর জন্য? এখনও বিলু অরুণকে ডাকনামে বুধু বলে ডাকে। বিলুর পোশাকি নাম অনন্যা। অরুণ ওকে ডাকে অন্যা বলে। এই বুধু ও অন্যার রহস্য লুির দাদা হয়ে ভেদ করতে চায় না দীপ।
দীপ ভাবে, প্রীতমের মনে যখন পাপ নেই তখন তার মনেই বা থাকবে কেন?
পাশের ডাইনিং স্পেসে অনেকক্ষণ ধরে সরু গলায় লাবু ঝিয়ের কাছে কী একটা বায়না করছিল। মেয়েটা এমনিতে মিষ্টি, ভিতু, ঠান্ডা, কিন্তু কখনও-সখনও খুব ঘ্যানায়। আর যখনই ঘ্যানায় তখনই ধৈর্যহীন বিলু নির্মম হাতে মেরে মেয়েটাকে পাট পাট করে দেয়। বিলুর ভয়ে মেয়েটা সবসময়ে কেমন বিবর্ণ হয়ে থাকে। লাবুর সবচেয়ে বড় আশ্ৰয়টা সরে গেছে। শরীরের কারণেই বাবার কাছে আসা তার বারণ।
প্রীতম খুব উৎকর্ণ হয়ে মেয়ের গলার স্বর শোনে আর কীসের জন্য যেন অপেক্ষা করে। আচমকাই পরবার ওপাশে বিলুর চাপা গর্জন শোনা যায়, চুপ করলি অলক্ষ্মী মেয়ে? গর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই চটাস পটাস চড়-চাপড়ের শব্দ হতে থাকে। বিলুর শ্রান্ত গলা শোনা যায়, আমাকে শেষ না। করে ছাড়বি না তোরা! প্রীতম কেমন কুঁজো হয়ে চোখ বুজে সিঁটিয়ে থাকে। যেন মারটা তার পিঠেই পড়ছে।
আরও মারের ভয়ে লাবু কাঁদতে পারে না। কাঁদা বারণ, বারণ না মানলে বিলু আরও মারবে। তাহ প্রাণপণে কান্না চেপে রাখার চেষ্টায় ক্রমান্বয়ে হেঁচকি উঠছে লাবুর। পরদার ওপাশ থেকে সেই হেঁচকির শব্দ এসে এ ঘরে হাতুড়ির ঘা মারে। প্রীতম বিবর্ণ মুখে চেয়ে থাকে দীপের দিকে। খুব চেষ্টা করে একটু হাসে। মাথা নেড়ে বলে, বিলুর দোষ নেই। ও পেরে উঠছে না। সারাদিন ঘরে আটকে থাকে, ওর মেজাজ খারাপ তো হতেই পারে।
