কলকাতায় থাকতে থাকতে আর কলকাতাকে দূরের জায়গা মনে হত না তার। শিলিগুড়ির কথা ভেবে শুয়ে শুয়ে চোখে জল আসত না তার। বিয়ের পর বিলুর সঙ্গে হানিমুন করতে গিয়েছিল পুরী। সেই তার আর-একবার দূরে যাওয়া। দিন সাতেকের মধ্যেই কলকাতায় ফেরার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল সে। অফিসের কাজে বর্ধমান, টাটানগর, সিৰ্জি বা দু-তিনবার দিল্লিতেও যেতে হয়েছিল তাকে। কোনওদিন সে বাইরে গিয়ে ভাল বোধ করেনি। কোথাও দু-তিন দিনের বেশি থাকতে পারেনি। দুর প্রীতমকে টানে না কখনও।
তার প্রিয় শিলিগুড়ি, তার প্রিয় কলকাতা।
কিন্তু দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টা পর চোখ চেয়ে প্রীতম টের পেল, জীবনে সে এত দূরে আর কখনও আসেনি। শব্দহীন, ঝিঝি-ডাকা আবছা অন্ধকার চেতনার মধ্যে চেয়ে সে অনুভব করল, দূরত্বটা বড় বেশি। মাঝখানে এক বিশাল নদী বয়ে যাচ্ছে কি? অস্পষ্ট সেরকম একটা শব্দ পায় সে। কোনও নাম কিছুতেই মনে পড়ছে না। কোনও মুখ মনে নেই। স্মৃতির কপাট বন্ধ। জীবাণুরা অনেকটা উঠে এল বুঝি! মগজে? হবেও বা। তার শরীরের মধ্যে আর কোনও লড়াই নেই। সে হাল ছেড়ে দিয়েছে।
দাদা! দাদা, শুনতে পাচ্ছ?
হুঁ।
কেমন আছ? কেমন লাগছে?
ভাল। খুব ভাল।অতি কষ্টে আড়ষ্ট জিভ নেড়ে বলে প্রীতম। কিন্তু কে প্রশ্ন করল তা বুঝতে পারল না। সে যে জবাবটা দিল তার অর্থও তার ভাল জানা নেই। শুধু অভ্যস্ত একটা শব্দ বেরিয়ে গেল মাত্র।
কিছু খাবে?
না।
গরম দুধ খাও। ভাল লাগবে।
গরম দুধ! না, খাব না।
এই যে, লাবুকে দেখো। লাবু সেই সকাল থেকে তোমার পাশে বসে আছে। দেখো।
লাবু? কই?
এই তো! আয় লাবু, বাবার চোখের সামনে আয়।
লাবুর মুখ শুকনো করুণ। হামাগুড়ি দিয়ে সে বাবার মুখের ওপর ঝুঁকে বসল।
কিন্তু চিনতে পারল না প্রীতম। লোকটা কে? মেয়েটা কে? কিন্তু অভ্যস্ত জিভ বলল, লাবুঃ বাঃ বেশ।
তুমি মরে যাওনি তো বাবা?–লাবু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
মরে যাইনি তো।—প্রতিধ্বনি করে বলে প্রীতম।
মাকে ডাকব বাবা?
মা কে?
মা! আমার মা?
তোমার মা! বাঃ খুব ভাল।—বলল প্রীতম।
মা সারারাত জেগে ছিল তো। এইমাত্র একটু ঘুমোচ্ছ।
আচ্ছা।
ডাকব বাবা?
শতম লাবুর পিঠে হাত রেখে বলে, যাও, ডেকে আনো।
লাবু গিয়ে ও ঘরে মাকে ডাকতে থাকে।
শতম বিছানায় বসে প্রীতমের কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। সারা শরীরে কোথাও মাংস নেই। কপালটা করোটির মতো শক্ত। দাঁতে দাঁত পিষে শতম বলে, এরা তোমাকে প্রায় শেষ করে এনেছে দাদা। আর নয়, শিলিগুড়ি চলল। তোমাকে ঠিক সারিয়ে তুলব।
প্রীতম শিলিগুড়ি কথাটা যেন বুঝতে পারে। ঠক করে কিছু মনে পড়ে না, তবে একটা মস্ত সাদা পাহাড়, ঘন জঙ্গলের দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে তার।
শিলিগুড়ি?
শিলিগুড়ি। যাবে না দাদা?
যাব।
তা হলে আমি আজই রিজার্ভেশন করতে যাব।
প্রীতম যদিও কিছুই মনে করতে পারে না, তবু তার ভিতর থেকে এক প্রম্পটারই যেন বলে ওঠে, ওদের কে দেখবে?
তুমি কি ওদের দেখো? ওদের ওরাই দেখবে।
এ কথাটা স্পষ্টই শুনতে পেল বিলু। সে নিঃশব্দে বিছানার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ এক রাতেই শুকিয়ে গেছে। চোখ কান্নায় ফোলা এবং অনিদ্রায় লাল। চুল এলোমেলো। কাল সারারাত সে প্রীতমকে ছেড়ে প্রায় নড়েইনি। অপেক্ষা করেছে, কখন প্রীতমের জ্ঞান ফিরে আসে। আমাকে শুধু খারাপ ভেবেই চলে যেয়ো না প্রীতম। আমি যে তোমাকে কত ভালবেসেছিলাম তা জেনে যাবে না?
শতমের কথাটা কানে আসতেই একটু শিউরে ওঠে বিলু। প্রীতমকে নিয়ে যাবে? নিয়ে যাবে?
প্রীতমের করোটির মতো শক্ত কপালে বিলুও হাত রাখে, কেমন আছ, প্রীতম?
প্রীতম খুব ভাল করে মহিলাটিকে দেখে নিচ্ছিল। এ যেন কে? খুব চেনা। ঠিক মনে পড়ছে না।
প্রীতম বলল, ভাল। খুব ভাল আছি।
আর কেউ না বুঝলেও বিলু ঠিকই টের পায়, একটা দিনের মধ্যেই প্রীতমের মধ্যে একটা বড় রকমের ওলট-পালট হয়ে গেছে। তার এমনও সন্দেহ হয়, প্রীতম তাকে চিনতে পারেনি।
একটু ঝুঁকে বসে বিলু। খুব আস্তে আস্তে বলে, আমি বিলু। চিনতে পারছ?
শতম পাশ থেকে বলে, চিনতে পারবে না কেন বউদি? কী বলছ?
বিলু করুণ মুখটা তুলে মাথা নেড়ে বলে, ও চিনতে পারছে না। আমি জানি।
এরকম কি মাঝে মাঝে হয়?
না। এই প্রথম।
শতমের মুখে উদ্বেগ ফুটে ওঠে, একটু আগেই তো শিলিগুড়ি যাওয়ার কথায় রাজি হয়ে গেল। বিলু বলল, ওর চোখের দৃষ্টিটা দেখো। তা হলেই বুঝতে পারবে।-বলে বিলু আবার প্রীতমের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করে, আমি কে বলল তো? আমি কে?
তুমি!—বলে প্রীতম ভ্রু কোঁচকায়। অনেক দূর থেকে শব্দগুলো আসছে। ঝিঝি-ডাকা আবছায় ভাসছে কিছু মুখ।
লাবুকে চিনতে পারছ না? এই যে লাবু।
লাবু! হ্যাঁ লাবু।—প্রীতম ভ্রু কুঁচকে রেখেই বলে।
শতম চাপা গলায় বলে, ডাক্তারকে খবর দেবে না বউদি?
বিলু মাথা নেড়ে বলে, খবর দেওয়াই আছে। বেলা দশটা-এগারোটা নাগাদ আসবেন কালই বলে গেছেন। আমি ভাবছি, এটা হয়তো ঘুমের ওষুধের এফেক্ট। এটা কেটে গেলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।
দাদাকে এবার কিছু খেতে দাও।
খাওয়াব। অচলাকে দুধ গরম করতে বলে এসেছি।
শতম একটু চুপ করে থেকে বলে, এটা কোনও খারাপ সাইন নয় তো বউদি?
কী জানি। তবে ঘাবড়ে যেয়ো না।
আমার কীরকম লাগছে।
জবাবে বিলু একটু হাসল মাত্র।
অচলা দুধের ফিডার নিয়ে গম্ভীর মুখে ঘরে আসে। কাল সারা রাত সেও প্রায় জেগেই কাটিয়েছে। তবে তার অভ্যেস আছে বলে মুখে রাত জাগার কোনও ছাপ নেই। সে কাছে এসে বলল, সরুন, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
