শুনুক। তোমাকে বলতে হবে প্রীতম।
কী বলব! আমি কিছু ভেবেচিন্তে বলিনি। মনে হল, তাই বললাম।
তোমার মনের সেই জোর কোথায় গেল?
একটু শ্লেষের হাসি অজ্ঞাতেই ফুটে ওঠে প্রীতমের মুখে। বলে, মনের জোরে তুমি তো বিশ্বাস করো না।
আমি না করলেও তুমি তো করতে?
আমার মনের জোর আর নেই। হাল ছেড়ে দিয়েছি। এবার ভেসে যাব।
বিলু তার হাতটা আর-একটু নিবিড়ভাবে চেপে ধরে, কী হয়েছে তোমার বলবে?
আমার কিছু হয়নি। তুমি কেমন আছ বিলু?
এ কথায় বিলু যেন চমকে ওঠে, আমি কেমন আছি? তার মানে?
প্রীতম ঠেস দিয়ে কথা বলতে প্রায় জানেই না। বলতে লজ্জাও করে তার। তবু আজ বলল, এখন তো তোমার একটা আলাদা বাইরের জীবন হয়েছে বিলু। সে জীবনটার কথা তো আমি জানি না! তাই জিজ্ঞেস করছি, কেমন আছ?
বিলুর মুখ থমথম করছে। একটু কঠিন গলায় সে বলে, আলাদা জীবন? চাকরি করলেই কি একটা আলাদা জীবন হয় মানুষের! আজ তুমি অদ্ভুত সব কথা বলছ প্রীতম।
চাকরি কেন করতে গেলে বিলু? সে কি টাকার জন্য?
না তো কী?
এমন তো নয় যে, সারাদিন একজন রুগির সঙ্গ করে করে ঘঁফিয়ে উঠেছিলে বলে, সব সময়ে মৃত্যুর সঙ্গে ঘর করতে হচ্ছে বলে, একটু মুক্তির জন্য, ডানা মেলবার জন্যই চাকরি করতে গেছ?
বিলুর সেই পুরনো কাঠিন্য ফিরে এল মুখশ্রীতে। বহুকাল ওই বরফ-শীতল ভাবটা দেখেনি প্রীতম। মাঝখানে কিছুদিন একটু প্রগ হয়েছিল বিলু। শীতল মুখশ্রীর সঙ্গে ঠান্ডা গলার মিশেল দিয়ে বিলু বলে, তোমার যদি তা-ই মনে হয়েছিল তবে আগে বলোনি কেন?
আমি তো তোমার কোনও কাজে বাধা দিই না। সব মানুষেরই ইচ্ছে মতো চলার স্বাধীনতা আছে। তবু কেন বলছি জানো? মনে হয় বলে।
কেন মনে হবে?
এ প্রশ্নের জবাব হয় না। মনে হয়, তাই বললাম। চাকরি করে কিছু অন্যায়ও করোনি। আমি যদি বাঁচি তবে এ চাকরিটা তোমার দরকার হবে।
বিলু মাথা নিচু করে বসে থাকে। সময় বয়ে যাচ্ছে। প্রীতমের বড় ইচ্ছে হল, নতমুখী এই শীতল মেয়েটিকে একটা চরম আঘাত দিতে। কোনওদিন শত অপরাধেও যা করেনি প্রীতম। কিন্তু এখন সে শেষবারের মতো চলে যাচ্ছে। হয়তো আর কখনও দেখা হবে না। ওকে একটু আঘাত দিয়ে যাওয়া ভাল। তাতে হয়তো ও মনে রাখবে।
প্রীতম গলা ঝাড়ল। অনেক ইতস্তত ভাব, দ্বিধা কাটিয়ে আস্তে আস্তে বলল, আর একটা কথা।
বলল শুনছি।
তোমার বয়স বেশি নয়। যদি আমার ভালমন্দ কিছু হয় বিলু, তা হলে তুমি একা থেকো না।
বিলু মুখটা নিচুই রাখল। মৃদু কঠিন স্বরে বলল, কী বলতে চাইছ?
বলছি, তুমি আবার বিয়ে কোরো।
বিয়ে?–বলে ভারী অবাক হয়ে তাকায় বিলু, কী বলছ?
বিয়ের কথায় অবাক হোয়ো না। তুমি তো এসব সংস্কার মানো না, আমিও মানছি না। ভেবে দেখেছি, তোমার একা থাকার চেয়ে আবার বিয়ে করাই ভাল।
বলতে মুখে আটকায় না তোমার?
না। কারণ বিয়ে অনেক স্পষ্ট, অনেক পরিষ্কার ও সহজ ব্যাপার। তাতে গোপনীয়তা নেই, লুকোছাপা নেই, ভয়-ভীতি নেই। বিয়েই ভাল বিলু।
এতটা স্পষ্ট কথা, এত সুস্পষ্ট আক্রমণ বোধহয় বিল প্রত্যাশা করেনি। তার শীতল কঠিন মুখশ্রী কাঁপতে থাকে। তারপর হঠাৎ ঠোঁট ফুলে ফুলে ওঠে। চোখ জলে ভরে আসে। ঋলিত গলায় সে বলে, কী বলছ তুমি?
প্রীতম আনমনে দুরের জানালার দিকে চেয়ে আকাশের উজ্জ্বল নীল চৌখুপিটা দেখছিল। উদাস গলায় বলল, সেই ভাল বিলু। না হয় অরুণকেই কোরো। ও তোমাকে খুব ভালবাসে।
বিলু একটু শিউরে উঠল কি?
একটা হাত তুলে সে প্রীতমের মুখ চাপা দিয়ে বলল, বোলো না, ও কথা আর বোলো না। কী বলছ তা তুমি জানো না।
প্রীতমের সমস্ত শরীর এলিয়ে পড়েছে এই পরিশ্রমে। এই কথাটুকু, এই আঘাত করার প্রস্তুতি এবং আঘাত তাকে এক পালটা প্রতিক্রিয়ায় বড় ক্লান্ত করে দিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বালিশে এলিয়ে পড়ে প্রীতম। বড্ড ঘুম আসছে। মনটা হালকা। পৃথিবীতে কেউ কারও নয়। সারাজীবন ধরে মানুষ কেবলই ভুল দাবিদাওয়া করে যায়।
শুনছ! এই, শুনছ! প্রীতম!
প্রীতম সাড়া দিল না। অগাধ ঘুম তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
বিলু তড়িৎ পায়ে উঠে পাশের ফ্ল্যাটে দৌড়ে গেল টেলিফোন করতে।
আধ ঘণ্টা পর ডাক্তার এল। দেখল। ওষুধ লিখল। কিন্তু বিলুর কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট জবাব দিল। বলল, খুব স্ট্রেন গেছে। দেখা যাক কী হয়।
সিরিয়াস নয় তো!
মনে তো হচ্ছে না। দেখা যাক।
একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে শতম গিয়েছিল প্রাতঃভ্রমণে। ফিরে এসে দাদার অবস্থা দেখে কেমনধারা হয়ে গেল। মুখ ফ্যাকাসে, চোখে আতঙ্ক। বারবার জিজ্ঞেস করে, বউদি, দাদা বাঁচবে তো? কিছু হয়নি তো?
না। তুমি ভেবো না শতম।
তুমি অফিসে যাবে বউদি?
না, আজ অফিসে যাওয়ার কথাই ওঠে না।
প্রেসক্রিপশনটা দাও। আমি ওষুধ এনে দিচ্ছি।
অচলাই পারবে।
না, না।—অধৈর্যের গলায় প্রায় হুংকার ছাড়ে শতম, আমি আনব। দাও।
প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে বিলু যখন টাকাও দিতে গেল তখন আবার হুংকার ছাড়ে শতম, টাকা? দাদার ওষুধের জন্য টাকা নেব? রাখো তো! খুব রোজগার করতে শিখেছ।
কথাটায় কামড় ছিল, কিন্তু শতমের মুখের দিকে চেয়ে কিছু বলতে সাহস পেল না বিলু। ও চলে গেলে বিলু চুপি চুপি বাথরুমে ঢুকে দোর দিল। আয়নায় নিজের মুখখানা দেখল অনেকক্ষণ ধরে। কাল রাতের ব্যাপারটা কি টের পেল প্রীতম? ছিঃ ছিঃ।
৪০. প্রীতম কখনও দুরে কোথাও যায়নি
প্রীতম কখনও দুরে কোথাও যায়নি। তার একমাত্র দূরে যাওয়া ঘটেছিল যখন শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় এল সি-এ পড়তে। বিদ্যাসাগর স্ট্রিটের এক মেসবাড়ির দোতলার ঘরে বসে সে তখন ভাবত, ইস! শিলিগুড়ি কত দূর!
