না।
তা হলে বউদিকে ডাকি?
না, ও ঘুমোক। তুমি যাও অচলা। আমি শুয়ে থাকি।
কিছু খেয়ে নিন।
অচলা আপত্তি শুনল না। তর্ক করতে ইচ্ছে করল না বলে এক গেলাস দুধ খুব অনিচ্ছার সঙ্গে খেয়ে প্রীতম পড়ে রইল বিছানায়। কিছুতেই আজ নিজের প্রতিরোধ রাখতে পারছে না সে। হেরে যাচ্ছে। জয়ের গন্ধে শরীরময় নেচে উঠছে বীজাণুরা। কোলাহল করছে।
ঘুম এল না। অসহ্য কষ্ট। উঠে বসল প্রীতম। ঘর বড় বেশি অন্ধকার। না?
অচলা, জানালাগুলো খুলে দিয়ে যাও।
তাই দিয়ে গেল অচলা। বলল, বউদি উঠে বাথরুমে গেলেন। আসছেন এক্ষুনি।
প্রীতম কিছু বলল না। শূন্যগর্ভ চোখে চেয়ে রইল সামনের দিকে। কোনও মানুষই কোনও মানুষের সম্পত্তি নয়, ক্রীতদাস ক্রীতদাসী নয়। কারও দেহের অধিকার, প্রেমে পড়ার অধিকার কেনই বা থাকবে না মানুষের? এসব ভাবল। অনেক ভাবল।
কী হয়েছে? অচলা বলছিল—
বলতে বলতে বিলু এসে কাছ ঘেঁষে বসে। মুখ থেকে ঝাঁঝালো পেস্টের গন্ধ আসছে।
কিছু নয়। রাতে ঘুম হল না।
কেন?
কী করে বলব? এল না।
আমাকে ডাকোনি কেন?
তুমি কাল খুব টায়ার্ড ছিলে।–বলে এক ঝলক বিলুকে দেখে নেয় প্রীতম।
তাতে কী? তোমার অসুবিধে হলে বলবে না তা বলে?
কিছু অসুবিধে হয়নি। একটু ছটফট করেছি মাত্র।
ডাক্তারবাবুকে টেলিফোন করে দিচ্ছি এখনই।
না। তার দরকার নেই। আজ ভাল আছি।
বিলু আর তেমন উদ্বেগ দেখাল না। অনেকক্ষণ অবশ্য বসে রইল কাছে। হঠাৎ বলল, শতম কেন এসেছে বলো তো!
এমনি।
আমাকে অচলা বলছিল, ও নাকি তোমাকে শিলিগুড়িতে নিয়ে যেতে চায়।
প্রীতম মনে মনে অচলার ওপর বিরক্ত হল। মুখে বলল, তাই তো বলছে।
নিয়ে যাবে কেন? এখানে কি কোনও অসুবিধে হচ্ছে তোমার?
প্রীতম গম্ভীর মুখে বলল, আমার বোঝা তো অনেক টেনেছ বিলু। এবারটা কিছুদিনের জন্য ছেড়ে দিলে দোষ কী?
বিলু এ কথায় স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর অনেকটা সময় পার করে বলে, তুমি কি আমার বোঝা?
বোঝ। ভীষণ বোঝা বিলু। নিজেকে আমার তাই মনে হয়।
তোমার মনে এমন সব জিনিস হয় যা লজিক্যাল নয়।
প্রীতম বিলুর দিকে চেয়ে ছিল। কাল রাতের অপরাধবোধ টানা ঘুমের পর কেটে গেছে। এখন পরিচ্ছন্নই দেখাচ্ছে বিলুকে। তবু এ বিলু কীটদষ্ট। এতদিন ওর প্রতিরোধ ছিল। কাল ভেঙে গেছে। প্রীতম সব টের পাচ্ছে। পৃথিবীতে কে কার?
তোমার অফিসের সময় হয়ে এল বিলু।
বিলু নড়ল না, স্থির হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি জানতাম শেষ পর্যন্ত তুমি এই ডিসিশনই নেবে। কোনওদিন তুমি আমাকে আপনজন ভাবোনি।
এ কথার জবাব দিলে বোধহয় ঝগড়া হবে। কিন্তু প্রীতম কোনওদিন ঝগড়া করেনি। তার সারাজীবনেই ঝগড়া বলে কিছু নেই। যদিও বা দু-চারবার সে কারও সঙ্গে ঝগড়া করেছে, প্রতিবারই গো-হারা হেরেছে। উত্তেজিত হলে তার মুখে কথা ফোটে না, মাথা গুলিয়ে যায়, শরীর ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপতে থাকে। সে ভারী করুণ অবস্থা!
প্রীতম তাই চুপ করে থাকে।
বিলু বলে, ওরা তোমাকে কেন নিয়ে যেতে চায় তা বলেছে?
নিয়ে যেতে চায় এমনিই। আমি তো ওই পরিবারেরই ছেলে।
তা কি জানি না। কিন্তু ভাবছি আমার কোনও ত্রুটি হল কি না।
না, তুমি যথেষ্ট করেছ।
একটা কথা বলবে? তুমি বাড়িতে চিঠি লিখে কিছু জানাওনি তো?
কী জানাব?
তোমার কোনও অসুবিধের কথা?
না বিলু। আমার তো কোনও অসুবিধে নেই। আমি কখনও কারও কাছে তোমার নামে নালিশ করিনি। ওটা আমার আসে না।
আমিও তাই জানতাম এতদিন।
আজ কি বিশ্বাস করছ না আমায় বিলু?
বিশ্বাস করছি। আমি শুধু ভাবছি আমার দোষটা কোথায়।
এটা দোষগুণের ব্যাপার নয়। আমার মা, ভাই, বাড়ির লোক সবাই চায় আমাকে তাদের কাছে কিছুদিন নিয়ে রাখতে। তোমার দোষের কথা ওঠেই না।
কথা বলতে বলতে প্রীতম গভীরভাবে বিলুকে দেখছিল, অনুভব করছিল। কাল এই বিলু ছিল তার। আজ যেন তার নয় আর। এই সত্য প্রীতমের ভিতরে মৃত্যুর ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। বেঁচে থাকা নিরর্থক। তার লড়াই শেষ হয়েছে। এবার শিলিগুড়ি চলে যাবে। জানালা দিয়ে দেখবে সারাদিন, উত্তরের পাহাড়। শৈশব ফিরে আসবে। নিবিড় হয়ে উঠবে মায়ের আঁচলের সেই অদ্ভুত গন্ধ। বড় নেই-আঁকড়া ছেলে ছিল সে। আবার তাই হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে লাবুর জন্য কষ্ট হবে খুব। বিলুর কথা বড় মনে পড়বে। কিন্তু বেশিদিন নয়, রোগ-জীবাণুরা ঘোড়সওয়ারের মতো উঠে আসবে মাথায়। সব ভুলিয়ে দেবে। সব ভুলে যাবে প্রীতম।
বিলু আবার নিচু গলায় বলে, তোমার শিলিগুড়িতে যাওয়ার অর্থ আমার সঙ্গে, আমাদের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, তা-ই বিলু। অস্বীকার করে লাভ নেই। তুমি তো শিলিগুড়িতে যাবে না।
ও কথা থাক। কেন যাব না, কেন যেতে চাই না, তা তো তুমি জানো।
জানি। তবে ছাড়াছাড়ির জন্য দুঃখ নেই বিলু। এখানে থাকলেও খুব শিগগিরই একদিন ছাড়াছাড়ি তো হতই।
বিলু খুব অবাক হয়ে প্রীতমের দিকে তাকিয়ে বলে, তার মানে? ওসব কী বলছ তুমি?
কেন, তুমি জানো না যে, আমার আয়ু বেশিদিন নয়? এটা কি নতুন কথা বিলু?
বিলুর চোখ-মুখ তবু বিস্ময়ে টানটান হয়ে থাকে। অস্ফুট গলায় সে বলে, তুমি তো কোনওদিন এসব বলোনি প্রীতম! আজ কেন বলছ?
ভারী অপ্রস্তুত বোধ করে প্রীতম। মুখে কথা আসে না।
বিলু তার দু’হাত দিয়ে প্রীতমের একখানা হাত ধরে বলে, কেন বললে? তুমি তো কখনও মরার কথা বলো না। আজ কেন বললে?
প্রীতম হাতটা আস্তে টানে। কিন্তু দুর্বল হাতখানা বিলুর হাত থেকে খসে এল না। সে বলল, একটু আস্তে বিলু। শতম শুনবে, অচলা শুনবে।
