টাকার কথা বাদ দাও তো। টাকা আমি দেব।
তুই কি পাগল হলি? আমার কিছু হয়নি। বেশ আছি।
বেশ থাকলে বলতাম না। তোমাকে বেশ দেখাচ্ছে না। চোখের কোল ফুলেছে, শরীরের বাঁধন আলগা, তার ওপর ড্রিংক-ট্রিংক করো, ডাক্তার দেখিয়ে রাখা ভাল।
তার মাথায় এ বুদ্ধি ঢোকাল কে বল দেখি?
কেউ ঢোকায়নি। কাল থেকে আমারই মনে হচ্ছিল।
দূর দূর। ওসব কোনও দরকার নেই। আমার শরীবের ভাল-মন্দ আমি টের পাই না ভেবেছিস?
চেহারা নরম হলেও শ্রীনাথ গোঁয়ার কম নয়। রাজি হল না।
হতাশ দীপনাথ ফিরে এসে তৃষাকে বলল, বউদি, হল না।
আমি তো জানতাম।
আমি আজ চলে যাব বউদি। তুমি মেজদাকে দেখো।
যাবে? কাল রাতে কী কথা হয়েছিল?
সে তো দাদার চেক-আপের জন্য। সেটা যখন হচ্ছে না তখন–।
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এসব দীর্ঘশ্বাস-টাস তার বড় একটা আসে না। আজ এল। বলল, ঠিক আছে।
তৃষার অভিমানের আঁচ টের পেল দীপনাথ। কিন্তু বেশি গা করল না। বাঁধা পড়তে তার ভাল লাগে না। একা, আলগা, দূরের লোক হয়ে থাকার মধ্যে ভার অনেক কম।
নিজেদের ঘরের লম্বা বারান্দায় পিচবোর্ডের টার্গেট বানিয়ে এয়ারগান ছোড়ার অভ্যাস করছিল সজল। মাদুর পেতে পাশবালিশ ফেলে তার ওপর কনুই রেখে শুয়ে খুব কায়দা দেখাচ্ছে। দীপনাথ হেসে বলে, কটা লাগালি?
সতেরোটার মধ্যে দুটো মাত্র।
দে আমাকে।
এয়ারগান নিয়ে দীপনাথ ছোট্ট লোহার গুলি ভবে ফটাফট খানিকক্ষণ টার্গেট প্র্যাকটিস করল। আসলে নিজেকে এইভাবে সরিয়ে নেওয়া, প্রত্যাহার করা। বউদির চোখে চোখে তাকাতে হচ্ছে না।
দেরিতে অফিসে গেলেও ক্ষতি ছিল না। তবু দীপনাথ পালনোর জন্য সময়ের আগেই খেয়ে নেয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ির চৌহদ্দি ঠেঙিয়ে রাস্তায় পা দিয়েই শ্বাস ফেলে ভাবল, বাঁচা গেল।
বৃষ্টির পর এই শরৎকালের ভোরবেলাটা খুব ভাল কাটছিল না প্রীতমের। পরশু শতম এসেছে। তারপর থেকে প্রতি মুহূর্তেই তার ভয় হয়েছে, এই বুঝি তাকে শিখণ্ডী রেখে বউদি আর দেওরে লেগে যায়। লাগেনি এখনও, কিন্তু আবহাওয়ায় বারুদের গন্ধ ছিল।
কাল ঘটল অন্যরকম। একদম অন্যরকম।
বিলু ফিরল কাল বেশ রাতে। কম করেও ন’টা। পাশের ফ্ল্যাটের মাদ্রাজিদের টেলিফোনে অবশ্য একটা খবর দিয়েছিল, ফিরতে দেরি হবে। কারণ বলেনি।
কারণটা প্রীতম ঝ করে টের পেল, বিলুকে দেখেই।
কী দেখেছিল প্রীতম? শুয়ে শুয়ে সারাক্ষণ সে চিন্তা করছে, খুঁজছে, প্রশ্ন করছে নিজেকে, কী দেখেছিলাম? কী দেখেছিলাম?
বিল ভিতরের ঘরে ঢুকেই খুব সচকিত চোখে একবার দেখেছিল প্রীতমকে। দৃষ্টি অন্যরকম। চোরের মতো। ভয়ে ভরা। তারপর গেল বাথরুমে।
ফিরে এসে খাটের বিছানায় প্রীতমের পায়ের কাছে এসে বলল, অফিসে যা কাজ না!
অফিসের কাজের জন্য দেরি হল?—খুব নিবিড় তীক্ষ্ণ শার্লক হোমসের চোখে তাকিয়ে বিলুকে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করে প্রীতম।
না। অফিসের পর একটা ডিনার ছিল।
কারা দিল?
নতুন ডিরেক্টরের রিসেপশন।
চোখ কপালে তুলে প্রীতম জিজ্ঞেস করে, নতুন ডিরেক্টরের রিসেপশনে তোমার নিমন্ত্রণ?
সে তো আমার গুণে নয়। এই ব্যাংকের ডিরেক্টর যে অরুণের বাবা।
তাতে কী? তবু ওই রিসেপশনে তোমাকে ডাকার কথা নয়।
বিলু একটু কাঠ হয়ে বলল, ডাকল তো। কী করব বলো?
কোথায় হল?
পার্ক হোটেলে। শতম কোথায়?
বেরিয়েছে। ফিরবে।
শতমের কথাটা তুলে বোধহয় পাশ কাটাতে চাইল বিলু। প্রীতম তাকে পাশ দিলও। আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। করার দরকার নেই। বিলুর মুখশ্রী, চোখের দৃষ্টি, দেহের শান্ত ভাবই বলে দিচ্ছে অন্য কিছু। ডিনার ছিল ঠিকই, কিন্তু তারপর আরও গভীর কিছু ছিল। অন্তরঙ্গ কিছু ছিল।
বিদ্যুতের ছোবল খেয়ে প্রীতম আঁকড়ে ধরল বালিশ। সে তো জানত। পুরুষ আর রমণী যতই পরিধেয় পরুক, ঘনিষ্ঠতা একদিন তাদের দেহমিলনে প্ররোচিত করবেই।
টের হয়তো পেত না প্রীতম। পেল কেবল এই দীর্ঘ রোগে ভুগে অনুভূতির প্রখরতা বেড়ে গেছে বলে।
না কি অন্যায় সন্দেহ? আবার ভাবতে বসল প্রীতম। ভেবে ভেবে বৃষ্টির রাত পার করল।
শতম কাল অনেক রাতে ফিরেছে। তখন ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিল প্রীতম। কথা হয়নি। কথা বলতে ইচ্ছে ছিল না তার কারও সঙ্গেই।
বৃষ্টির পর এই শরৎ ঋতুর মতো উজ্জ্বল ভোরবেলা বিছানায় বসে আছে প্রীতম। শরীরের গাঁটে হালছাড়া ভাব। শরীরে খিল ধরেছে। মাথা ভার। চোখে জ্বালা। ভাবছে, কী দেখেছিলাম?
আজকাল বিলুর বদলে অচলা আসে তার প্রাতঃকৃত্যে সাহায্য করতে। দুর্বল আঙুলে নিজেই দাঁত মেজে নেয় প্রীতম। অচলা কুলকুচের জন্য একটা অ্যালুমিনিয়মের গামলা ধরে রাখে বিছানায়। আজ দাঁত মাজতে গিয়ে বারবার অবশ হয়ে পড়ে যাচ্ছিল হাত।
অচলা বলল, কী হল? আমি মেজে দেব?
না, না। আমি পারব।
কীরকম ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে।
রাতে ভাল ঘুম হয়নি।
তা হলে আমাকে ডাকেননি কেন?
তুমি কী করতে?
একটা ট্র্যাংকুইলাইজার খাইয়ে দিতাম।
প্রীতম হাসল, ট্রাংকুইলাইজার? ওতে কিছু হত না। কাল রাতে আমার কিছুতেই ঘুম আসত। বিলু কোথায়?
বউদি ওঠেননি।
কটা বাজে বলল তো?
বেশি নয়। সাতটা।
প্রীতম দেখল সকাল সাতটার তুলনায় অনেক বেশি আলো এসেছে ঘরের মধ্যে। এত আলো ভাল লাগছিল না প্রীতমের। সে বলল, জানালাগুলো ভেজিয়ে দাও তো। চোখে বড় আলো লাগছে।
অচলা জানালা ভেজিয়ে দিয়ে কাছে এল। বলল, কী হয়েছে বলুন তো? ডাক্তারকে খবর দেব?
