আমাদের জটিলতা যেমন আছে থাক। এ জন্মে ওর সঙ্গে আমার বোধ হয় আর মিলমিশ হবে। কিন্তু ও লোকটা তো বাঁচুক। নিজের মনে মাথা খুঁড়ে মরছে, এটা তো ভাল নয়।
দাদার সম্পত্তি নিয়ে কোনও গন্ডগোল নয় তো?
না, তা কেন? তোমার মেজদা সম্পত্তির পরোয়াই করে না। এর সমস্যা অন্য। হয়তো সবটার জন্যই আমি দায়ী নই।
তোমাকে দায়ী করছে কে?
একটা শ্বাস ফেলে তৃষা বলে, তুমিই করছ গো। আর একমাত্র তোমাকেই আমি ভয় পাই।
দীননাথের এ কথায় আসা উচিত ছিল, কিন্তু হাসি এল না। সে বলল, ভয় পাও বউদি? আমাকে ভয় পাও? আমাকে ভয় পাওয়ার কী আছে?
কী আছে তা কী করে বলব? ঠিক এরকম আর-একজনকে ভয় পেতাম। সে কে জানো? ভাসুরঠাকুর।
দীপনাথের ভ্রু কুঞ্চিত হল। একটু সময় নিয়ে সে বলল, বড়দাকে তুমি খুব শ্রদ্ধা করতে? না বউদি?
গাঢ়ম্বরে তৃষা বলল, করতাম। ওরকম মানুষকে কে না করে বলো?
তোমাকেও বড়দা খুব ভালবাসত নিশ্চয়ই। নইলে সব তোমাকেই লিখে দিয়ে যেত না।
তৃষা দৃষ্টি নত রেখে বলল, বোধ হয়। কিন্তু সে কথা থাক।
দীপনাথ অস্বস্তির সঙ্গে মৃদু স্বরে বলল, অনেকে অনেক কুকথা বলে। আমি সেগুলো বিশ্বাস করি না। তোমরা যখন বড়দাদার বাড়িতে এসেছ, তখন আমি ছিলাম সেই শিলিগুড়িতে। কী হয়েছিল তা সঠিক জানি না। কী হয়েছিল বউদি?
প্রয়োজনে মিথ্যে কথা বলতে তৃষার আটকায় না। কিন্তু আজ রাতে এই প্রিয় দেওরটির সামনে যখন দ্রবীভূত মন নিয়ে সে বসে আছে তখন মিথ্যে কথা বলতে জিভে আটকাল তার। মল্লিনাথকে নিয়ে আজ অবশ্য তার লজ্জারও বোধ হয় কিছু নেই। দশজনের সামনে ইচ্ছে করলে সে চেঁচিয়েও বলতে পারে।
তৃষা মৃদু স্বরে বলল, সংসারটা তো জঙ্গল। বাইরে মানুষ পোশাক পরে থাকে বটে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বেশির ভাগই তো জানোয়ার। কেউ কারও ভাল দেখতে চায় না, তাই কলঙ্ক রটায়। রটানোর রসদও ছিল। আমি তখন যুবতী, ভাসুরঠাকুরেরও এমন কিছু বয়স হয়নি… আর কি কিছু বলতে হবে?
তৃষা মিথ্যে কথা বলল না, সত্যও নয়। ঠেকা দিল মাত্র।
কুণ্ঠিত দীপনাথ বলল, থাক থাক। তোমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না। আমি ওসব জানি। তুমি কিছু মনে কোরো না বউদি।
আমার মনই নেই, তাই মনে করাটরা আসে না। আগে আগে রাগ হত, দুঃখ হত। আজকাল কিছু হয় না।
আমাকে ভয় পাও কেন তা কিন্তু বলোনি।
সব কি বলতে হয়?
আহা, এ তো গোপন কিছু নয়।
যদি বলি তবে তুমি আমার ভয় ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি চাই, ভয়টা থাক। পৃথিবীতে অন্তত আমার একজনও ভয়ের লোক থাক।
দীপনাথ একটু যেন বিরক্ত হল। বলল, বলছ বটে, কিন্তু ভয়ের কোনও লক্ষণ তো কখনও দেখিনি।
তৃষা বড় বড় চোখে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, দেখোনি?
কোথায় আর দেখলাম।
দেখার চোখ থাকলে তো দেখবে।
তা হলে তোমার চোখ দিয়েই না হয় দেখাও।
এই যে সন্ধেবেলা তোমার হুকুমে রঙিন শাড়ি পরে এলাম এ কাজ আর কেউ আমাকে দিয়ে করাতে পারত?
দীপনাথ নিঃশব্দে কিন্তু মুখ ভরে সরল হাসি হাসল। বলল, তা হলে শাডিটা কাউকে আবার দিয়ে-টিয়ে দিয়ো না। মাঝে মাঝে পরো। ভয়েই পরো না হয়।
তৃষা গাঢ় স্বরে বলে, তুমি যখন আমাকে খুকি সাজাতে চাও তখন না হয় সাজবই।
পরবে তো?
পরব বাবা, বলছি তো।
বৃষ্টি নামল বাইরে। গাছের পাতায় জলের ফোটা পড়ার সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর শব্দ বহুকাল বাদে শুনল দীপনাথ। গাছগাছালির ভিতর দিয়ে বাতাস বইছে। ব্যাং ডাকছিল অনেকক্ষণ ধরে। এখন বৃষ্টির সঙ্গে সেই ডাক মিশে যেন মুহূর্তের মধ্যে ফিরিয়ে আনল শিলিগুড়ির শৈশবকে।
বউদি, কী অদ্ভুত!
কী অদ্ভুত?
তোমাদের এই জায়গাটা!
তোমার পছন্দ?
খুব পছন্দ। বড়দা একটা সুন্দর জায়গা বেছে বের করেছিল তো!
মুখ টিপে হেসে তৃষা বলে, খুব সুন্দর নয় গো। থাকলে টের পাবে। থাকবে এখানে?
বললাম তো থাকব। কালকের দিনটা।
না রে বোকা, সে কথা বলিনি। বলছি এখানেই থাকো না কেন? কোনও অসুবিধে হবে না। মেসে বোর্ডিং-এ থাকো, আমার ভাল লাগে না।
দূর। তাই হয় নাকি?
কেন হয় না দীপু? যে মানুষটা এ বাড়িতে থাকলে আমি সবচেয়ে খুশি হই সেই কেন আসতে চায় না বলো তো!
দীপনাথের মুখে কথা আসছিল না। তবে মেজো বউদি যে তাকে খুব ভালবাসে এটা সে বহুদিন ধরে জানে। তবু সে একটু নিষ্ঠুর হল। আস্তে করে বলল, কী জানো বউদি, সেটা ভাল দেখাবে না। বড়দা একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তোমাকে এই সব বাড়িঘর সম্পত্তি দিয়ে গেছে। যদি আমি বা বুলু এসে থানা গাড়ি তা হলে লোকে বলবে, সম্পত্তির লোভে এসে জুটেছি।
তুমিও ওকথা বললে দীপু?
একটু ভেবে দেখো বউদি, খারাপ কথা কিছু বলিনি। আজ বাবাও আমাকে ওরকম একটা কিছু বলছিল, আমি কান দিইনি।
বাবা তার কথা বলেছেন, আমি আমার কথা বলছি। আমার নিকটজন কেউ নেই দীপু, সমান সমান কেউ নেই, বন্ধু নেই।
নেই? বলো কী? তবে মঞ্জু স্বপ্ন সজল সরিৎ এরা কারা?
ওরা ওরাই। তুমি তো ওদের মতো নও। ওরা আমাকে ভয় পায়, ওরা কেউ আমার সমান সমান নয়, বন্ধু নয়। সম্পর্কটা কেমন জানো? যেন ওরা সবাই আমার অধীন, আর আমি ওদের ওপরওয়ালা।
আমি কি তোমার সমান সমান?
দীপু, তুমি তার চেয়ে কিছু বেশি। পৃথিবীতে কারও যদি আমার ওপরওয়ালা হওয়ার ক্ষমতা থেকে থাকে তবে সে একমাত্র তুমি।
যাঃ, কী যে সব বলছ আজ বউদি! তোমার মাথাটা আজ বড় গোলমাল করছে দেখছি। একটু বায়ু দমনের ওষুধ খাওগে যাও।
