ইয়ারকি নয় দীপু। তুমি আমার সমস্যাটা ধরতেই পারছ না।
ধরার মতো লিড দিচ্ছ কই? এমন সব কথা বলছ যা নাটক-নভেলে থাকে।
বোকা কোথাকার! তুমি মেয়েমানুষদের একদম চেনো না।
খুব চিনি।
ছাই চেনো। একমাত্র বসের ওই কালো বউটিকে চিনলেই কি আর সবাইকে চেনা যায়?
বউদি! ফের ইয়ারকি?
কালো বললাম বলে রাগ নাকি?
আঃ, তোমার সঙ্গে পারা যায় না। ভয় নেই গো, আমি মণিদীপার চ্যাপ্টার খুলে বসব না। ওর নাম শুনলেই তোমার যা মুখের অবস্থা হয়।
দীপনাথ নিজের করতলের দিকে চেয়ে থাকে। বুক ঢিপ ঢিপ করছে। মনের মধ্যে কেবল আনন্দে-বিষাদে মেশা আলোছায়ার চক্কর।
তুমি আমাকে সন্দেহ করো বউদি?
তৃষা স্মিতমুখে বলে, করি। কিন্তু ভয় পাই বলে অতটা বলতে ভরসা হয়নি। আজ বললাম। তবে আবার বলছি, তোমার মনের কথা জানি না এখনও। কিন্তু আমার মেয়েমানুষের চোখ ভুল দেখেনি, তোমার বসের কচি বউটার মাথা কিন্তু তুমিই চিবিয়ে খেয়েছ। ও তোমাকে অন্ধের মতো ভালবাসে।
বাসলেই বা কী লাভ? উদাস অবহেলায় বলে দীপনাথ।
তাই দেখছি। তোমাকে যারা ভালবাসে তাদের কোনও লাভ নেই। তুমি সকলের প্রতি সমান নিষ্ঠুর।
উঃ, আজ তুমি মাথা ধরিয়ে দিলে বউদি। যা ডায়ালগ দিচ্ছ।
তৃষা মৃদু হেসে বলে, তুমি তো জানো না, আমি পাঁচ জনের সঙ্গে কত কম কথা বলি। লোকে যদি শোনে যে, আমি কথা বলে বলে তোমার মাথা ধরিয়ে দিয়েছি, তা হলে বিশ্বাস করবে না। সবাই বলে, আমি নাকি ভীষণ গম্ভীর।
কী একটা বলছিলে যেন!
বলছিলাম, মেয়েমানুষকে তুমি ছাই জানো।
জানলেই বা কী এমন ক্ষতি!
তোমার ক্ষতি নয়। ক্ষতি আমার।
তোমারই বা কেমন ক্ষতি!
বললে তো বলবে নাটকের ডায়ালগ দিচ্ছি।
আচ্ছা, বলব না।
মাথা ধরবে না?
না। ঘাট মানছি, বলো।
তুমি কি মানো যে, আমার বাইরেটা যতই রুক্ষ হোক, আমি আসলে একজন মেয়েমানুষ?
তাই তো জানতাম। অত ঘটা করে মানবার কী আছে! তুমি মেয়েমানুষ না হলে পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হল কী করে?
তৃষা হেসে বলে, লোকে অবশ্য তোমার দাদাকেই মেয়েমানুষ বলে, আমাকে পুরুষ।
কথা ঘোরাচ্ছ। পয়েন্ট থেকে সরে যাচ্ছ।
খুব ঘুম পায়নি তো?
না। তবে রাত অনেক হল, এক কাপ চা হলে—
করছি। এ ঘরে চায়ের ব্যবস্থা সব সময়েই থাকে।
তৃষা উঠে কেরোসিনের স্টোভে চা বসিয়ে এসে বলল, তুমি ঠিক বুঝবে না। তবু বলি, আমার মাঝে মাঝে মাথাটা কেমন হয়ে যায় আজকাল। বুদ্ধি বিবেচনা গুলিয়ে যায়। তখন মনে হয়, আমাকে চালানোর মতো কেউ থাকলে বড় ভাল হত।
তোমার চালক তো মেজদা।
আইনে তা-ই বলে, কিন্তু কাজে নয়। ওর কথা থাক। আমার কথা বলি। আমি কারও প্রভুত্ব মেনে নিতে পছন্দ করি না। আমি অন্যের ওপর ছড়ি ঘোরাতে ভালবাসি। আমি ক্ষমতা ব্যবহার করতে ভালবাসি। এগুলো সবাই জানে, আমিও অস্বীকার করি না। আমি অহংকারী, একটু রাগী, হয়তো একটু নিষ্ঠুরও। কিন্তু আমার ভিতরে যে মেয়েমানুষের মনটা আছে সে এখন কারও প্রভুত্ব মেনে নিতে চায়। চালানোর লোক চায়। একজন বিশেষ কারও হুকুম মেনে চলতে চায়। তুমি কি জানো দীপু, মেয়েরা যে যত বড়ই হোেক প্রত্যেকের ভিতরে এই মজ্জাগত আকাঙ্ক্ষা থাকে? জানো
তো? তা হলে আমার কাছ থেকে শোনো। স্বামী বা প্রেমিক, ছেলে বা ভাই, কোনও একজন না। একজন পুরুষের কর্তৃত্ব সব মেয়েই জীবনের কোনও না কোনও সময়ে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়। নইলে তার মন ছটফট করে, ভিতরটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভরে থাকে।
দীপনাথ খুব অবাক হয়ে চেয়ে ছিল তৃষার দিকে। মুখে একটু অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। বলল, মাইরি মেজো বউদি, তুমি তো দারুণ কথা বলতে পারো। কী সুন্দর সাজিয়ে বললে! আমি তো ভেবেছিলাম গাঁয়ে থেকে তুমি গাঁইয়া-মাজারি হয়ে গেছ।
তৃষা আবার লজ্জা পেল। উঠে গিয়ে চায়ের জল নামিয়ে পাতা ছেড়ে এসে ফের বসল। বলল, কথা কি মুখে এমনি আসে? আসে জ্বালায়!
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, তোমার কথা মানছি। মেয়েরা না হয় প্রভুই চায়, কিন্তু আমি মনে করি তাদের প্রভু হবে তাদের স্বামীরাই। মেজদাকে তুমি একটু কষ্ট করে প্রভুত্বটা দিয়ে দাও।
আবার তোমাকে হাঁদা গঙ্গারাম বলতে ইচ্ছে করে।
বলো না, শুনতে খারাপ লাগছে না।
ফাজিল হয়েছ। শোনো দীপু, মেয়েদের সকলেরই একজন প্রভু থাকেন, সবসময়ে সে তো স্বামীই হয় না। স্বামীদের সকলের কি সেই সিমপ্যাথি বা পার্সোনালিটি থাকে! ওসব ছেলেমানুষি কথা বলছ কেন? তোমার মেজদার এমন কিছু নেই যে, আমার ওপর প্রভুত্ব করতে পারেন।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এটা যদি বিয়ের আগে ডিসাইড করতে বউদি, তা হলে কত ভাল হত! যার প্রভু হওয়ার যোগ্যতা নেই তাকে বিয়ে করতে গেলে কেন?
তখন কি জানতাম!
জানা উচিত ছিল।–ভ্রু কুঁচকে দীপনাথ বলে।
সবাই কি জানে! জিজ্ঞেস কোরো তো মণিদীপাকে, সেও জানে কি না। জিজ্ঞেস কোরো তো, তার প্রভু কে!
তৃষা চা করে নিয়ে আসে। এক কাপ দীপনাথকে দেয়, এক কাপ নিজে নিয়ে বসে। বলে, আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমি কতটুকু। জীবনের এত বিষ তো তখনও পান করিনি।
রবিঠাকুর ছাড়ছ যে!— বলে দীপনাথ একটু হাসে। কিন্তু হাসিটা ফুটল না। বলল, আমাকে দিয়ে কি তোমার সেই সুপারম্যানের কাজ হবে বউদি?
জানি না। শুধু বলি, ভাসুরঠাকুরের পর একমাত্র তোমাকেই আমার বন্ধুর মতো মনে হয়। নিজের ভাই বা বাপের বাড়ির কাউকেই আমি এত স্নেহ বা শ্রদ্ধা করি না। সামনাসামনি বলছি, খারাপ লাগছে। দীপু, তোমাকে আমার খুব দরকার। পরামর্শ করার, দুঃখের কথা বলার, সঙ্গ করাব মতো তো কেউ নেই আমার।
