তৃষা বড় বড় চোখে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, উনি জানতে দিচ্ছেন কই?
যদি হুট করে মেজদা আজ নিজের ঘরে গলায় দড়ি দেয় তাহলে?
কী যা-তা বলছ?
একটা শাস ফেলে দীপনাথ বলে, মেজদার মনের ব্যালান্স নষ্ট হয়ে গেছে বউদি। তোমার সাবধান হওয়া উচিত।
৩৮. রাতের নিস্তব্ধতায় নানা গ্রামীণ শব্দ
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে রাতের নিস্তব্ধতায় নানা গ্রামীণ শব্দ। দূরে মেঘ ডাকল। বৃষ্টি হবে।
তৃষা দীপনাথের দিকেই একদাষ্টে চেয়ে ছিল। হঠাৎ স্তব্ধতা ভেঙে সে-ই প্রথম বলল, কেউ যদি মরতে চায় তাহলে কী করে ঠেকাব বলো?
দীপনাথ বিরক্ত ছিল। গলার স্বরে একটু রূঢ়তা চলে এল। সে বলল, ওটা কথা নয় বউদি, ওটা কথার চালাকি। তোমার কাছ থেকে এ ধরনের কথা আনএক্সপেকটেড। যে বুক দিয়ে আগলে অসীম মমতায় বড়দার সম্পত্তি আগলাচ্ছে, কারবার বাড়াচ্ছে, এত দায়-দায়িত্ব পালছে, সে কেন। দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কথা বলবে?
কথার রূঢ়তা তৃষার দুই গালে চড় কষায়। ভীষণ অপমান বোধ করে সে। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ এ ধরনের কথা বললে সে সহ্য করত না। কিন্তু এ যে দীপনাথ। এই একজন মানুষ যার সামনে তার হৃদয় দ্রব হয়, গাঢ় হয়। দীপনাথের প্রতি তার এক অন্ধ স্নেহ।
তৃষা বড় শ্বাস ফেলে বলল, তুমি বোধ হয় ভাবছ, বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে মেতে আছি বলেই তোমার দাদাকে দেখার সময় পাই না!
ঠিক তা বলছি না।
তাই বলছ গো।
বলে তৃষা ম্লান হাসল। আজকাল তার মনে কোনও আবেগ ওঠে না, বিরহ জাগে না, প্রেম নেই। আছে কঠিন সব সমস্যার সমাধান, হিসেব-নিকেশ, দেনা-পাওনা। কিন্তু আজ হঠাৎ একটু দুলছে মনটা। সে দীপনাথের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বলে, কথাটা মিথ্যেও তো নয়। বহুকাল তোমার মেজদার শরীরের খবর আমি জানি না। ওর অবশ্য এমনিতে অসুখ-বিসুখ কিছু নেই। কিছু হলে বলবেও না।
মেজদার বয়স চল্লিশের কোঠায় পড়ল না!
হবে বোধ হয়।
এইবেলা চেকআপগুলো করিয়ে নাও না কেন?
তোমাকে একটা কথা বলব?
বলো।
এসেছই যখন দয়া করে এখন ওগুলোর ভার তুমিই নাও না!
আমি তো কাল সকালেই কেটে পড়ব।
আর-একটা দিন থাকো। ডাক্তার আনানোর ব্যবস্থা আমিই করাব। তুমি শুধু তোমার দাদাকে রাজি করাবে।
দীপনাথ একটু চিন্তা করে বলে, অফিসের বুড়ি একবার ছুঁয়ে আসতেই হবে। তারপর যদি হয়–
তাই হবে। এখান থেকে অনেকে কলকাতায় অফিস করে। তুমিও পারবে।
এখানে কি ভাল ডাক্তার আছে?
আছে, তবু আমি এখানকার ডাক্তার ডাকব না। সরিৎ কাল সকালে গিয়ে কলকাতা থেকে বড় ডাক্তার নিয়ে আসবে।
তাতে অনেক খরচ। তার চেয়ে মেজদাকে নিয়ে গেলেই তো হয়। মেজদা তো আর শয্যাশায়ী রুগি নয়!
ও কি যেতে চাইবে ডাক্তারের কাছে?
দীপনাথ হেসে ফেলল। বলল, আজ তোমার বুদ্ধি একদম খেলছে না, খুব ছেলেমানুষের মতো কথা বলছ।
কেন? কী বললাম?
মেজদা যদি কলকাতায় ডাক্তারের কাছে যেতে না চায়, তা হলে বাড়িতেও যে ডাক্তার দেখাবে তার গ্যারান্টি কী?
তবু বাড়িতে তো তুমি থাকবে!
আমিই না হয় কলকাতায় নিয়ে যাব। তাহলে তো হবে?
তৃষা লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল, হবে, কিন্তু তাহলে তো তুমি আর-একটা দিন এখানে থাকবে না!
শুধু আমাকে এখানে একদিন আটকে রাখার জন্য এত টাকা খরচ করবে! তুমি পাগল হলে নাকি বউদি?
রাগ করলে না তো!
না। তবে আমি গরিব ঘরের ছেলে, বাজে খরচা একদম পছন্দ করি না। বলছি তো থাকব।
তৃষা ভারী লজ্জা পেয়েছে। নিজের মনের কোনও দুর্বলতা ধরা পড়লে সে ভীষণ লজ্জা পায়। স্বভাবে এক দুর্মদ অহংকার আর তেজ আছে তার। কোথাও সে মাথা নোয়ায় না। এই একটা লোকের সামনে তার সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
ধরা পড়ে তৃষা দুই চোখে মিটমিট করে চেয়ে দীপনাথের মুখে কৌতুকের হাসিটা দেখে নিয়ে বলল, শোনো দীপু, সংসারে বোধ হয় আমার আপন মানুষ একজনও নেই যাকে নিজের কথা বলি। আমার মতো এমন একা দুটি নেই। এমনকী আমার পেটের ছেলেমেয়েরাও আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে।
তুমি এরকম ভয়ংকরী তো আগে ছিলে না।
আজকাল হয়েছি। ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে পাকিয়ে কোনওদিন যে মেয়েমানুষ ছিলাম তা ভুলতে বসেছি। অথচ পুরুষমানুষও তো নই। আজকাল তাই মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, আপনজন। কেউ না থাকলে বেঁচে থাকাটা কি বড় আলুনি নয়?
তোমার মুখে একদম মানাচ্ছে না কথাটা বউদি। তুমি কি জানো, আড়ালে, তোমাকে কেউ কেউ দেবী চৌধুরানি বলে ডাকে?
জানব না আবার!–বলে একটু হাসে তৃষা। শোনো দীপু, তোমার দাদা নয়, হয়তো একদিন শুনবে, আমিই সিলিং থেকে দড়িতে ঝুলে পড়েছি।
ইয়ারকি মেরো না।
ইয়ারকি বুঝি? বিশ্বাস হচ্ছে না?
তুমি মরবে কেন?
কেউ ভালবাসে না বলে।–তৃষা দুষ্টুমির হাসি হাসল।
দীপনাথ একটু গম্ভীর হয়ে বলে, মেজদার কথা কেন বললাম জানো? মেজদার চেহারাটার ওপর যেন একটা ছায়া পড়েছে। কিসের ছায়া কে জানে! তবে দেখলে খুব ভাল ঠেকে না। আজকাল কি মেজদা খুব ড্রিংক করে?
তা করে বোধ হয়। কিন্তু তার জন্য নয়। ড্রিংক অনেকেই করে।
তা হলে আর কী করে বলো তো?
কিছু করে না। কিংবা কী করে তা জানায় না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভীষণ একটা রাগ আর অভিমানে ফেটে পড়ছে সবসময়।
তবু তুমি কিছু উপায় বের করতে পারছ না?
তাই তো তোমাকে ধরেছি। তুমি একটা কিছু উপায় করো, হয়তো তোমার কথা শুনবে।
ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি, কিন্তু তোমাদের ভিতরকার জটিলতাকে সরল করব কী করে? কাজটা তো সহজ নয়।
