তৃষা একটু থতমত খেয়ে গেল। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, সব প্রশ্নেরই সঠিক জবাব আছে। একদিন মাথা ঠান্ডা করে শুনো। সেদিন বুঝতে পারবে, আমি তোমার কোনও ক্ষতি করতে চাইনি। রামলাখনের ঘরে ফুর্তি করতে যাও বা আর যেখানেই যা করে বেড়াও, আমি বাধা দেব না। দিতে আমার আত্মসম্মানে লাগে। কিন্তু আমার ক্ষতি করতে গিয়ে নিজের নাম ডোবাচ্ছ কেন?
শুধু আমার নাম নয়, সেই সঙ্গে তোমার নামও। কিন্তু মুশকিল কী জানো?
আমি ওসব জানতে চাই না।
তবু জেনে রাখো। এককালে, অর্থাৎ ত্রিশ-চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর আগে মদ খেলে বা মেয়েমানুষের কাছে গেলে নিলে হত। লোকে সন্দেহের চোখে দেখত, এড়িয়ে চলত। আজকাল দান উলটে গেছে। এখন বারো আনা ভদ্রলোকই মদ খায়, মেয়েমানুষেও আজকাল আর তেমন দোষ ধরে না কেউ। এই গাঁ-গঞ্জে কিছু লোক এখনও শুনলে একটু চমকে ওঠে বটে, কিন্তু তা নিয়ে বেশি একটা হই-চই করতে যায় না। যদি করত তবে এতদিনে তোমার বা আমার নামে ঢি ঢি পড়ে যেত। তুমি সেটা জানো বলেই কোনও বাধা দাওনি আমাকে। তোমার বুদ্ধি অনেক বেশি।
তৃষা জবাব দিল না। হাঁটুতে থুতনি রেখে চেয়ে রইল। মুখে কোনও আফসোস নেই, উদ্বেগ নেই। কেবল এক ঠান্ডা হিসেব-নিকেশ রয়েছে।
শ্রীনাথ দাঁড়াল না। সিঁড়ি ভেঙে উঠোনে নেমে এল। একবার ফিরে তৃষার দিকে চাইল। একটু বয়সের ছাপ পড়ল নাকি? বয়স হল বুঝি এতদিনে।
বৃষ্টির পর ভারী ভ্যাপসা গরম পড়েছে। তবু এ জায়গাটা ফাঁকা বলে তেমন খারাপ লাগে না। দীপনাথ খানিকক্ষণ বাবার সঙ্গে কথা বলল বসে বসে। তারপর বেরোল সরিতের সঙ্গে বাজার দেখতে। একটু একটু করে বুঝতে পারছিল বড়দা মল্লিনাথ যা সম্পত্তি রেখে গিয়েছিল বউদি তার ওপরেই নির্ভর করে নেই। নানা দিকে সম্পত্তি বেড়েছে, আয় বেড়েছে। সবটাই হয়তো আইন মেনে নয়। কিন্তু তবু বেড়েছে তো।
ত্রয়ীর কাউন্টারে রমরমা ভিড়। দোকানের স্টক দেখে তাজ্জব মানে দীপনাথ। কম করেও হাজার পঞ্চাশেক টাকার জিনিস রয়েছে। দিনে অন্তত দু’-তিন হাজার টাকার বিক্রি।
ফেরার সময় সে একটা শ্বাস ফেলে বলল, না হে, বউদি জানে। কীভাবে ব্যাবসা করতে হয় তা ওই বউদির মতো অনেক পুরুষেরও জানা নেই।
এককথায় সরিৎ খুব খুশি হয়। মেজদিকে তারও বড় ভক্তি। সে বলল, দিদি রুখে না দাঁড়ালে মল্লিদার সম্পত্তি ভূতে খেত।
তুমি কি হাসকিং মিল দেখছ?
না, সবই দেখতে হয়। তবে মেইনলি হাসকিং মিলটা।
বউদির জমি কত বলো তো?
তা কম নয়। সব তো নামে নেই।
জানি। পুলিস বা সরকার থেকে ঝামেলা হয় না?
বন্দোবস্ত আছে।
এখানকার লোকেরা কেমন?
ভাল নয় খুব একটা। আগে নানা রকম গোলমাল করেছে। তবে এখন মেজদিকে সবাই সমঝে চলে।
ভয় পায়?
পায়। সমীহ করে আর কী।
দীপনাথ মৃদু হেসে বলল, মেজদাকে আমি ভালই জানি। মেজদা এত সব করতে পারত না।
সরিৎ সতর্ক গলায় বলে, জামাইবাবু একটু অন্য রকম হয়ে গেছেন।
কী রকম বলো তো?
অন্য রকম। খুব স্বাভাবিক নয়।
সেটাও বুঝতে পারছি। কিন্তু কেন?
কে বলবে?
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলে, মেজদা কিন্তু মানুষ খারাপ ছিল না কোনওদিন।
সে আমি জানি। বিয়ে হওয়ার পর প্রথম প্রথম দেখেছি তো। দারুণ লোক। কিন্তু এখন কেমন ম্যান্তামারা হয়ে গেছেন।
তোমরা মেজদার ওপর নজর রাখো। মানুষটার কোথাও একটা গভীর ক্ষত আছে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না সেটা কেন। কিন্তু আছে।
উনি তো কাউকে বলবেন না। কী করে আমরাই বা জানব বলুন?
তোমাদের কথা নয়। দীপনাথ গম্ভীর হয়ে বলে, এ কাজ করতে পারে একমাত্র বউদি।
দিদির সঙ্গে উনি কথাই বলেন না।
একটু বিরক্ত হয়ে দীপনাথ বলে, তাও জানি। কিন্তু বুঝি না। যাকগে, বউদির সঙ্গেই কথা বলে দেখব।
আমরা চাই জামাইবাবু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠুন। উনি কিন্তু তা হচ্ছেন না। এ জায়গার লোকেদের কাছে উনি মেজদির নামে যা-তা বলে বেড়াচ্ছেন।
তাই নাকি? বলে বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দীপনাথ। কী রকম?
এই তো সেদিন কলকাতা থেকে আমি আর মেজদি ফিরছি। দেখি বটতলায় লোক জড়ো করে যা-তা বলছেন। মেজদি আমাকে বলল, যা গিয়ে চুপি চুপি শুনে আয় কী বলছে।
তুমি শুনলে?
শোনা যায় না, শোনা উচিতও নয়। মেজদির হুকুমে শুনতে হল, কিন্তু সে মুখে আনতে পারব।
দীপনাথ খুবই বিষণ্ণ বোধ করে। আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে সে অনেকক্ষণ ধরে ভাবে। শ্রীনাথ এরকম নয়। তাদের বংশে ইতরামো বড় একটা কারও মধ্যে নেই। তবে মেজদার এটা হল কী?
দীপনাথ অনেকক্ষণ বাদে বলল, তোমার জামাইবাবুকে তোমরা কী চোখে দেখো সরিৎ?
আমরা জামাইবাবুকে নিয়ে আর ভাবি না। ভেবে লাভ নেই।
কিন্তু একটা মানুষ কেন এরকম পাগলের মতো কাজ করছে তা ভেবে দেখবে না?
আমাকে জামাইবাবু পছন্দ করেন না। আমার নামেও লোককে যা-তা বলেন। আমি তাই বেশি কাছে ঘেঁষি না।
দীপনাথ আর কিছু বলল না। বাড়ি পৌঁছে চুপচাপ হাত-মুখ ধুল। তারপর খেতে বসে অন্যমনস্কভাবে টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলল। খাওয়ার ঘরে শ্রীনাথ নেই। পাশাপাশি সরিৎ, সে আর সজল।
নিজের শোবার ঘর তাকে ছেড়ে দিয়ে তৃষা শোবে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। বালিশ বিছানা ঠিক করতে যখন এল তখনই দীপনাথ বলল, বউদি, মেজদা কেমন আছে বলো তো?
দেখছই তো ভাই।
তবু তোমার মুখে শুনি।
তোমার মেজদা ভাল নেই।
কেন ভাল নেই? শরীর খারাপ?
শরীরের খবর তো জানি না।
কেন জানো না?
