কোথায় যাবে?
এ প্রশ্ন তো তোমাকে আমি করিনি। তবে তুমিই বা করছ কেন? কোথাও যাব।
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, এ সম্পত্তি আমার নয়, তোমার। এখানে এসব আগলে আমি থাকতে যাব কেন?
তৃষা একটা বড় শ্বাস ফেলে বলে, সম্পত্তির সুখ কীরকম তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তুমি যদি চাও তো তোমার নামে লিখে দিতে পারি।
আমার নামে লিখে দেবে কেন? আমি নেবই বা কোন লজ্জায়?
উদাস মুখে তৃষা বলে, সেসব জানি না। সম্পত্তি না নিলে বলার কিছু নেই, কিন্তু সংসারের দায়িত্ব আমি একা নিতে পারব না।
এসব তোমার সাজানো কথা। তুমিও জানো, আমিও জানি, দায়িত্ব আমার কোনওকালে ছিল না, আজও নেই। তুমি আমাকে দায়িত্ব দাওনি, আমিও নিইনি।
এতকালের কথা দিয়ে কী হবে? আমি বলছি এখনকার কথা। এতকাল অন্যরকম ছিল বলে চিরকালই তাই থাকবে নাকি?
শ্রীনাথ বিমর্ষ মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি জানি তৃষা, তুমি আমাকে আটকে রাখতে চাও। যদিও আমাকে তোমার আর প্রয়োজন নেই।
এরকমভাবে যারা ভাবে তাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু আমি ওভাবে ভাবি না।
তোমার মনের খবর রাখি না। কিন্তু এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আমি এ বাড়িতে ভারচুয়ালি কয়ে রয়েছি।
কেউ তোমাকে কয়েদ রাখেনি।
না, দরজায় তালা দিয়ে কয়েদ তো তুমি করোনি। তুমি শুধু আমার বেরিয়ে যাওয়ার পথগুলো আটকে দিয়েছ।
তৃষা হাঁটু তুলে তার ওপর থুতনি রেখে কী যেন ভাবল একটু। তারপর বলল, তুমি কলকাতার মেসে থাকবে?
থাকব।
তাতে বাধা কোথায়?
বাধা যে নেই তাও নয়। মেসে আমি বহুকাল থাকতে পারব না। তুমি জেনে গেছ যে, গাছপালা ছাড়া আমি আজকাল থাকতে পারি না। হাতে পায়ে মাটি না লাগালে আমার স্বস্তি নেই। কলকাতায় গেলে আমি ছটফট করে মরব। সেই জনাই যদি আমি কলকাতার মেসে যেতে চাই তবে তুমি বাধা দেবে না, আমি জানি।
আমি তোমাকে নিয়ে অত খুঁটিয়ে ভাবিনি। মিছিমিছি তুমি আমাকে এক মস্ত শত্রু মনে করে বসে আছে। যদি আমি শত্রু হতাম তবে অনেক কিছু করতে পারতাম।
তাও জানি। তোমার অপার করুণা।
ঠাট্টা কোরো না। এখন আর ওসব ভাল শোনায় না।
শ্রীনাথ বাঁকা হাসি হেসে বলে, শত্রুতার বদলে বরং আমার কিছু উপকারই করতে চেয়েছ। স্টেশনের স্টলে সরিৎকে লেলিয়ে দিয়ে কয়েকটা ছেলেকে মার খাইয়েছ। আমাকে নিয়ে ওরা মশকরা করত সেটা তোমার সহ্য হয়নি।
বড় বড় চোখে চেয়ে তৃষা বলে, তোমার মান-অপমানবোধ নেই জানি। তা বলে তোমার পরিচয়টা তো মুছে যায়নি। তোমার অপমানে এই পরিবারেরও অপমান, সেটা ভুলতে পারিনি। মনে রেখো, এই পরিবারটা কিন্তু আমার বাপের বাড়ির পরিবার নয়, তোমারই পরিবার। আমি সঙ্গে করে আনিনি।
শ্রীনাথ বিষ-হাসি হেসে বলে, সেটা কি আর জানি না? কিন্তু আমি জানলে কী হবে? পাবলিক জানে, এই পরিবার শ্রীনাথ চাটুজ্জের নয়, তৃষা চাটুজ্জের। তুমি সর্বেসর্বা। আমাকে কেন আর নাম-কোবাতে জড়ানো!
তোমার কি কোনও অপমানই আর গায়ে লাগে না?
না। আমার আবার মান-অপমান কী? সংসারকে যদি একটা বড় গাছ বলে ভাবো তবে আমি হচ্ছি সেই গাছের একটা পোকায় খাওয়া বুড়ো পাতা। খসে পড়লে কেউ টেরও পাবে না।
সেটা তোমার মনের দোষ। আমি তোমাকে সংসারেব বাড়তি লোক বলে ভাবি না। তুমি নিজে থেকেই নিজেকে বাড়তি লোক করে তুলেছ। এখানে আসার পর থেকে কখনও তুমি সংসারের সঙ্গে জড়াতে চাইলে না, আলগা-আলগা গা বাঁচিয়ে থাকলে। আমার পাশে এমন একজন পুরুষমানুষ ছিল না যে সব দেখাশোনা করবে। বাধ্য হয়েই আমাকে পুরুষের কাজ করতে হয়েছে।
কাজটা তুমি যে-কোনও পুরুষের চেয়েও ভাল ভাবে করেছ। সবাই বলে, তুমি নাকি এ তল্লাটের সব জমিই প্রায় নামে-বেনামে কিনে নিয়েছ। এমনকী আমার নামেও জমি কেনা হয়েছে, অথচ আমি জানি না।
তুমি যদি সম্পত্তি দেখাশোনা করতে তাহলে বুঝতে পারতে, কত কী করে তবে সব বজায় রাখতে হয়। কতকাল সাজিনি, বেড়াইনি, সিনেমা দেখিনি! সব ছেড়ে শুধু এই ছাইমাটি আগলে যক্ষীবুড়ির মতো বসে আছি। তবু তো তোমাকে খুশি করতে পারিনি।
আমার সুখের অন্ত নেই। যার বউ এত গুণের, তার সুখের অভাব কী?
আবার ঠাট্টা করছ? করো। তোমার দিন পড়েছে।
তাই নাকি? তুমি তাই মনে করো?
করব না কেন? তোমার তো ফুর্তির কোনও ভাঁটা পড়েনি। দেখছি, মুখ বুজে আছি।
শ্রীনাথ একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, তোমাকে আর কেউ না জানলেও আমি জানি তৃষা। আমার কাছে ওসব ভাল সেজো না। তোমাকে মানায় না। তুমিও আমাকে শেষ করার চেষ্টা করছ, আমিও তোমাকে শেষ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি দুর্বল, তোমার মতো ধূর্তও নই। বুঝতে পারছি আমি হেরে যাব। তোমার সঙ্গে কেউ কখনও পেরে ওঠেনি। তবু লড়াই তো লড়তেই হবে।
তুমি বোধ হয় আজকাল খুব বেশি নেশা-টেশা করছ।
করছি। সেটাও লড়াইয়েরই কৌশল।
এত কথা হচ্ছে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে। কেউ গলা তুলছে না, চেঁচাচ্ছে না। প্রায় মৃদু প্রেমের কথা বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে বুদবুদের মতো। দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে, দু’জনে আসলে নিজেদের অস্ত্র ও ঢাল নিয়ে আক্রমণ ও আত্মরক্ষার এক প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছে।
তৃষা মৃদু স্বরে বলে, তোমার লড়াই তুমি করো গে বাতাসের সঙ্গে। তোমার সঙ্গে আমার কোনও লড়াই নেই।
নেই? তবে আমার পিছনে কেন তোমার গোয়েন্দারা ঘোরে? কেন গোপনে আমার ঘরের ড়ুপ্লিকেট চাবি তৈরি হয়? কেন বদ্রীকে ডেকে ভয় দেখানো হয় জমির খবর না দেওয়ার জন্য?
