দীপ মৃদু স্বরে বলে, আমি একটা কৌটো তৈরির কারখানায় কাজ করতাম। টেকনিক্যাল কাজ নয়, অ্যাডমিনস্ট্রেশনের। খুবই ছোেট লুজিং কনসার্ন। সেই অভিজ্ঞতার তেমন কোনও দাম নেই।
মিসেস বোস খুব দৃঢ় স্বরে বলেন, টেকনিক্যাল নো হাউ ই আসল জিনিস। যদি আপনি সেটা শিখে নিতেন তা হলে আজ এই গরিলাটাকে তোয়াজ করে চলতে হত না। আজকাল একটা সামান্য ইলেকট্রিক মিস্ত্রি বা থার্ডগ্রেড ছুতোরও বসে থাকে না। যে সামান্য তালাচাবি সারাতে পারে, ঝালা দেওয়ার কাজ জানে, ছুরি কঁচি শান দেয় বা লেদ চালায় তাবও কাজের অন্ত্র নেই। একটুখানি টেকনিক্যাল কাজের জ্ঞান আর বেঁচে থাকার ইচ্ছে থাকলেই হল। আপাব কি কোনওটাই নেই?
দীপ একটু হাসে। মাথা নেড়ে বলে, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা তো জৈব জিনিস। সেটা ছাড়তে পারিনি বলেই এখনও মিস্টার বোসর সঙ্গে লেগে আছি।
কিন্তু তাতে বাঁচবেন না। ও নিজেই আমাকে অনেকবার বলেছে, দীপনাথ ইজ গুড ফর নাথিং। ওর উন্নতি করার ইচ্ছেটাই নেই। তার মানে ও আপনাকে অলরেডি ক্যানসেল করে বেখেছে। আর আপনি যতটা মনে করেন ওর ততটা ক্ষমতাও নেই। গুজরাটিরা অত্যন্ত কাশিং বিজনেসম্যান। তাই ওর হাতে রিক্রুটিং পাওয়ার তেমন কিছু দিয়ে রাখেনি। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার কথাটা খুব গালভরা, কিন্তু পাওয়ার বলতে কিছু নেই, চিসিশন বা পলিসি মেকিং নেই, অ্যাডভাইস দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আপনি অনর্থক এখানে চাকরির আশা করছেন।
দীপ বোসের বউকে আর-একটু ভাল করে দেখল। কম বয়স, বামপন্থী চিন্তাধারার অবশিষ্ট কিছু রেশ, কিছু আবেগ, স্বামীর ওপর রাগ এবং তার ওপর করুণা এইসব মিলিয়ে এ মেয়েটা এখন যা বলছে তা নিজেও বিশ্বাস করে না। দীপ এই সমাজকে খুব ভাল না চিনলেও খানিকটা বুকে নিয়েছে। সে জানে মিস্টার বোস চাকরি দেওয়ার মালিক না হলেও তার কথার দাম আছে। গুজরাটি ভাল ব্যবসায়ী বলেই বোসকে কখনও!টাবে না। বোস ইটান জোন-এ কোম্পানির কোমরের জোর অনেকখানি এনে দিয়েছে। বোসর বউ সেটা স্বীকার করুক বা না করুক। সে তাই মৃদু স্বরে বলে, বোস সাহেবের ক্ষমতা নেই এমন কথা আপনাকে কে বলল? কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। তা ছাড়া নতুন করে টেকনিক্যাল না হাউ শেখার বয়সও আমার নেই!
আপনার বয়স কত?
ত্রিশের কিছু ওপরে। সঠিক হিসেব নেই, উইদিন থার্টিথ্রি।
ওটা কোনও বয়স নয়। আপনি তো খুব ফিট দেখতে।
তবু বয়সটা ফ্যাক্টর। শেখার পক্ষে ফ্যাক্টর।
বাড়িতে কে কে আছে?
অলমোস্ট কেউ না।
স্ত্রী?
বিয়ে করিনি।
তাই বলুন! একটা বয়স পর্যন্ত বিয়ে না করে থাকলে পুরুষরা একটু খ্যাপাটে হয়ে যায়।
আমি কি খ্যাপাটে?
নয়তো কী? প্লেন থেকে নামাবার সময় আমি লক্ষ করেছি আপনি মিস্টার বোসের অ্যাটাচি কেসটা হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিলেন। আপনার আত্মমর্যাদাবোধ নেই কেন? ওর অ্যাটাচি আপনি কেন বইবেন?
দীপ খুব হাসে। হাসতে হাসতে বলে, আপনি মিস্টার বোসের ওপর খুব চটেছেন আজ?
মিসেস বোস একটু চুপ করে থাকেন। কমনীয় মুখশ্রী এখন আর ততটা কমনীয় দেখাচ্ছে না। চোয়ালে যথেষ্ট দৃঢ়তা। খুব আস্তে করে বলেন, আই অ্যাম স্টিল ডেডিকেটেড টু মাই আইডিয়ালস। আমি কোনও বড়লোককেই সহ্য করতে পারি না। বিশেষ করে ওর মতো হামবাগ স্লেভ একজিকিউটিভদের। আমি ওকে জাংকারপট করে ছাড়ব। তার কিছু না পারি ওর সমস্ত সেভিংসকে উড়িয়ে দেওয়ার পথ আমার ভোলা আছে। আমি ওকে ভিখিরি করে ছেড়ে দেব।
দীপ টের পায় মিসেস বোসের কোমল অঙ্গ থেকে একটা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ আসছে। ভারী অস্বস্তি বোধ করে সে। এবং খুবই ঠান্ডাভাবে বসে থাকে।
০৪. এই শীতে অন্ধকার বারান্দায়
এই শীতে অন্ধকার বারান্দায় মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলু। গলি থেকে চোখ তুলে দৃশ্যটা দেখে দীপ। নিঃঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলু, যেন কিছু দেখতে পাচ্ছে না, কিছু শুনতে পাচ্ছে না। ঘর থেকে আবছা আলোর আভাস এসে পড়েছে ওর গায়ে। আবছা দেখাচ্ছে মূর্তিটা। দোতলার ওই বারান্দায় উত্তরের বাতাস হুঁ হু করে বয়ে আসে। বিলুর শীতবোধও কমে গেছে বুঝি।
বিলু গলির আবছা আলোতেও দীপকে দেখতে পেয়েছিল ঠিকই। দীপ দোতলার সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসতেই দরজা খুলে পরদা সরিয়ে দেয় বিলু।
আজকাল বিলুর কথা কমে এসেছে খুব। দরজা খুলে একবার ক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। চলে যাচ্ছিল ভিতরের দিকে। দীপ বাইরের ঘরের সোফায় বসে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে খুব সাবধানে মৃদু স্বরে বলল, এখন খুব হিম পড়ে। বাচ্চাটাকে নিয়ে বারান্দায় যাস কেন?
বিলুর সঙ্গে সবাই আজকাল সতর্কভাবে কথা বলে। কখন বোমা ফাটবে তার কিছু ঠিক নেই। সামান্য কথাতেই কখনও খুব রেগে যায়, কখনও ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
বিলুর চুল রুক্ষ, ম্যাড়ম্যাড়ে হলুদ রঙের শাড়িটা রং-চটা ময়লা। গায়ের চামড়ায় খড়ি উড়ছে, ঠোঁট দুটো ভীষণ শুকিয়ে মামড়ি দেখা যাচ্ছে। দীপের কথার জবাব না দিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেল।
দীপ একটা ঠোঙায় মহার্ঘ কাঠ-বাদাম, কিছু মুসুম্বি আর আপেল এনেছে। কাঠবাদাম খুব ভালবাসে প্রীতম।
জুতো খুলে মেঝেয় দাঁড়াতেই মোজার ভিতর দিয়ে ডিসেম্বরের ঠান্ডা উঠে এল শরীরে। এই কয়েকটা দিনই যা একটু শীত কলকাতায়। শীতের শিহরনটুকু শরীরে স্রোতের মতো বয়ে যেতেই মনের মধ্যে একটি দৃশ্যান্তর ঘটে গেল। মনে পড়ল, হাকিমপাড়ার মস্ত কাঁচা ড্রেনের পাশে দীপের হাতে অকারণে মার খেয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে আর প্রাণপণে চেঁচিয়ে কাঁদছে। দীপের সমান গায়েব জোর ছিল না প্রীতমের, বয়সেও অনেকটা ছোট। রাগে দুঃখে অপমানে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ ভরা জল আর শরীর-ফেটে-পড়া রাগ নিয়ে প্রীতম চিৎকার করে দীপকে বলেছিল, আমার বাঁ হাতটা খা। আমার বাঁ পাটা খা। তখন খুব হেসেছিল দীপ। আজকাল যতবার মনে পড়ে ততবার হাসির বদলে চোখে জল আসতে চায়।
