বারান্দায় মুখোমুখি বসা পুরুষ ও রমণীটিকে হঠাৎ কারও চোখে পড়লে ভাববে, স্বামী-স্ত্রী ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্ততায় পরস্পরের উত্তাপ নিচ্ছে। কত ভুল দৃশ্যই না রচিত হয় এইভাবে।
শ্রীনাথ তৃষার দিকে কয়েকবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে অন্ধকার দেখছে। তৃষা নিচু হয়ে তার খাতার পাতা ওলটাচ্ছে। অনেকক্ষণ আর কেউ কোনও কথা বলল না। পরস্পরের গুপ্ত ক্ষত দুর্বলতা আর পাপের কথা তারা জানে। তাই আহত হওয়ার ভয়ে মুখোমুখি তারা পরস্পর আজকাল কদাচিৎ আক্রমণ করে।
শ্রীনাথ সামান্য তিক্ত গলায় বলে, দীপু আমার ছোেট। অনেক ছোট। ওকে আমাদের ঘরসংসারের খবর জানানোটা কি ভাল?
তৃষা খুবই ঠান্ডা গলায় জবাব দিল, খবরটা জানাল কে? তোমার কি সন্দেহ আমি?
দীপু আজ অনেক কথা কইল। সবটা কানে ভাল ঠেকল না। কেউ নিশ্চয়ই জানিয়েছে।
কী কথা?
তোমার আমার কথা। গরমিলের কথা।
সে তো এ বাড়ির কাকটাও জানে।
দীপু তো এ বাড়ির লোক নয়। সে জানল কেমন করে?
কেউ বলেছে হয়তো।–উদাস গলায় তৃষা বলে, বললেই বা দোষ কী? কে কার পরোয়া করে?
আফটার অল দীপু আমার ছোট ভাই। সে কিছু বললে আমার অপমান হওয়ার কথা।
হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে কি?
নিশ্চয়ই হয়েছে। নইলে এলাম কেন?
এখনও যে অপমানের বোধ একটু হলেও আছে সেটা ভাল।
আমি ঝগড়া করতে আসিনি।
ঝগড়া কেউ করছে না।
শ্রীনাথ উষ্ম চেপে আবার ঠান্ডা গলায় বলল, তোমার খেলা তুমি খেলবে, আমার খেলা আমি খেলব। এর মধ্যে কোনও সালিশি ডেকে আনা উচিত নয়।
সালিশি কেউ ডাকেনি। তবে খেলার কথা কী বলছ তাও আমি বুঝতে পারলাম না। কিসের খেলা?
তৃষা খেলা বোঝেনি দেখে যেন খুবই অবাক হল শ্রীনাথ। তৃষার দিকে তাকাতেই আবার তার নির্ভুল নজরে পড়ল, তৃষার বয়স। এই সেদিনও ভারী কচি ঢলঢলে চেহারা ছিল তৃষার। এখন হঠাৎ যেন বয়সের ভার নেমেছে চেহারায়। মুখে ভাঁজ পড়েনি, শরীরে খাঁজ পড়েনি, চামড়া ঢিলে হয়নি, তবু কোথাও না কোথাও পুরনো হওয়ার আভাস ধরা পড়ছে চেহারায়।
শ্রীনাথ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তার ছোট বিড়ি ধরাল। বলল, খেলাটা তুমি ঠিকই বোঝো, স্বীকার করো বা না-করো।
তবু তুমিও একটু বুঝিয়ে বলল না, শুনি।
দরকার নেই। বলেছি তো ঝগড়া করতে আসিনি।
ঝগড়া কি আমিই করছি? শুধু জানতে চাইছি মাত্র।
জানানোর মতো রহস্য কিছু যদি থাকত। যাকগে, বলছিলাম দীপুটা এসব না জেনে সুখেই আছে। এসব না জানলে সুখেই থাকবে।
কে কাকে কী জানায় তা আমি কী করে বলব? রেসের মাঠে তো আমি তোমাকে দেখিনি, দীপু দেখেছে। মদের দোকানে বসেছ, সে খবর দিয়ে গেল পাঁচু রিকশাওয়ালা। মিনার হলে একটি মেয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখছিলে তা চোখে পড়েছে সিদ্ধেশ্বরবাবুর। আমি খবর দিই না, খবর পাই।
খুব শান্তভাবেই কথাটা শুনল শ্রীনাথ। তারপর বলে, খবর আমিও কিছু রাখি, কিন্তু সেগুলো বলতে গেলে চেঁচামেচি হবে, খবর আরও ছড়াবে। ওসব কথা থাক।
কথাগুলো কি বটতলার মিটিং-এর জন্য জমিয়ে রাখছ? নোক জড়ো করে না বললে সুখ নেই?
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, বলার এখনও অনেক বাকি। ঠিকই বলেছ, তোক জড়ো করে না বললে সুখ নেই।
তবে দীপু জানল বলে আর দুঃখ করার কী? তুমিই তো ঢোল সহরত করতে বেরিয়ে পড়েছ।
শ্রীনাথ অন্ধকারের দিকে চেয়ে বিড়িটায় শেষ টান দিয়ে বলল, দীপুর কথা আলাদা। আমি পাবলিককে যা-ই বলে থাকি দীপুকে বলিনি। তুমি যদি বলতে থাকে তবে আমাকেও লাজ-লজ্জার বালাই ঝেড়ে ফেলে বলতে হবে।
বলো না। বাকি থাকে কেন?
সব বলব?
সব বলতে কী? আর কিছু বাকি আছে নাকি?
আছে। পাবলিককেও আমি সব বলিনি। বলতে বলছ?
তৃষা মুখ তুলে খুব সহজভাবে তাকাল। চোখে বেড়ালের মতো জুলজুলে চাউনি নেই। কিছু ক্লান্তি কি? অন্তত গলায় একটা পরিশ্রান্ত স্বর ফুটল, তুমি কী করতে না করতে তুমিই জানো। ছেলেপুলেরা ঘরদোর নোংরা করেই, মেয়েরা তা ঝেটিয়ে পরিষ্কার করে দেয়। আমারও সারা জীবন তাই করতে হবে। দুঃখ কিসের?
সব আবর্জনা কি যাবে তাতে?
চেষ্টা তো করতেই হবে।
নোংরা কি তুমিই কিছু কম করেছ এই সংসারকে?
এবার ঝগড়ার কথা কে বলছে শুনি!
শ্রীনাথ সামলে নিল। বাস্তবিক তৃষার সঙ্গে আর ঝগড়া করার কোনও মানেই হয় না। সামলে নিয়ে সে বলল, তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব। দেবে?
চাইবে?–তৃষা অবাক হয়ে বলে, কী চাও বলো।
খুব দূরে কোথাও এক ফালি জমি কিনে চাষবাস করব ভেবেছিলাম। তুমি তাতে বাগড়া দিয়েছ। জমির কোনও খবরই পাচ্ছি না। যদি বাধা না দাও তবে আমি একটু জমি কিনে চাষবাস নিয়ে থাকতে পারি।
আমি বাগড়া দিইনি।
দিয়েছ। শোনো ওসব করে লাভ নেই। আমি ঠিক করেছি, জমি যদি কিনতে নাই পারি তবে অন্তত কলকাতায় একটা মেসে গিয়ে উঠব। সেটা কি আটকাতে পারবে?
আটকাব কেন?
কেন তা আমি কি জানি? হয়তো তোমার কোনও এক্সপেরিমেন্টের জন্য আমার মতো একটা গিনিপিগ দরকার।
ওসব তোমার নিজের মনের কথা? আমি বাধা দেব না। দিইওনি। তোমাকে নিয়ে আমার কোনও এক্সপেরিমেন্টও করার ইচ্ছে নেই।
আমি দূরে গেলে তোমারই সুবিধে। পাবলিককে ঘরের কথা বলার কেউ থাকবে না।
পাবলিককে নিয়ে তো আমি ভাবছি না। তারা তোমাকেও চেনে, আমাকেও চেনে। আমি ভাবছি তোমার বাবার কথা, তোমার ছেলেমেয়ে এবং সংসারের কথা। তুমি গেলে এদের কে দেখবে?
একটু অবাক হয়ে শ্রীনাথ বলে, এদের এতকাল কি আমি দেখাশুনো করতাম নাকি?
না, এতকাল আমিই করেছি। কিন্তু আমারও তো ক্লান্তি আছে, বয়স আছে। আমি বরং বলি, এতকাল তো আমিই দেখলাম, এবার তুমি দেখো, আমি যাই।
