কী?
আমার চাকরি তো পাকা হল। ভাবছি কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট নেব। সজলকে কলকাতার কোনও ভাল ইংলিশ স্কুলে ভরতি করে দেব। আমার কাছেই থাকবে।
সজল কি যেতে চায়?
খুব চায়। আজই তো আমাকে চুপিচুপি বহুবার বলেছে, আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো, বড়কাকা। আমি তোমার কাছে থাকব।
সজল ওরকম একটা কথা আমার কাছেও বলে। ও বোধহয় এ বাড়িতে থাকতে চায় না।
না, চায় না। তোমরা ওর মনের দিকে মোটেই তাকাও না। হি ইজ বিয়িং নেগলেকটেড। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন ও আমাকে কিছু অদ্ভুত কথা বলেছিল। তখনই বুঝেছিলাম ও ভেতরে ভেতরে রিভোল্ট করছে।
হতে পারে। আমি অত সব লক্ষ করিনি।
করো না কেন? আমাদের বংশের এখনও পর্যন্ত ওই একটিই সলতে। সজলের দায়িত্ব তোমরা যদি ঠিকমতো নিতে না পারো তবে আমিই নেব। ও আমাকে খুব ভালও বাসে!
নে না। কে বারণ করেছে? ছেলেমেয়েরা আমার কাছে মানুষ হয় না, হয় ওদের মায়ের কাছে। কাজেই ওদের ভালমন্দ তোর বউদির হাতে।
তবু তোমার দায়িত্ব আছে। তুমি বাবা।
শ্রীনাথের বিড়ি নিভে গেছে। সেটার পোড়া মুখটা টিপে ছাই ফেলতে ফেলতে খুব অবাক হয়ে প্রতিধ্বনি করল, আমি বাবা!
দীপনাথ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে ছিল শ্রীনাথের দিকে। এই লোকটার জন্য তার দুঃখ হয়, এর ওপর রাগও হয়। কোথায় যেন একটা স্বাভাবিকতার সুর কেটে গেছে শ্রীনাথের জীবনে। বড়দা মল্লিনাথের সঙ্গে মেজো বউদি তুষার যে অবৈধ সম্পর্কের কথা কানাঘুষায় দীপনাথের কানে গেছে তা যদি সত্যিও হয় তবু তার জন্য শ্রীনাথেরও কি দায়িত্ব নেই! বড়দার খামারবাড়িতে বউদিকে একা ফেলে রাখত কেন দিনের পর দিন? ঘি আর আগুন কাছাকাছি রাখতে নেই, সে কথা কে না জানে! তখন তো অনেকে এমন কথাও বলেছে যে, দাদার সম্পত্তি হাত করার জন্যই শ্রীনাথ বউকে কাজে লাগিয়েছে। এসব নোংরামি এতকাল গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি দীপনাথ। এখন অবস্থা দেখে ভাবতে হচ্ছে।
সে বলল, সজলের ওপর আমাদের সকলেরই দায়িত্ব আছে।
বলছি তো, তোব বউদির সঙ্গে বুঝে দেখ। আমি এ সংসারের কেউ নই।
বউদির অমত নেই। তবু তোমাকে জিজ্ঞেস করতে বলল।
তবে তো হয়েই গেছে। নিয়ে যাস সজলকে, আমার অমত নেই। তুই কি শিগগিরই বিয়ে-টিয়ে করবি?
হঠাৎ ওকথা কেন?
বিয়ে না করলে সজল থাকবে কার কাছে? তোর তো অফিস আছে, ট্যুর আছে।
লোক রাখব।
দূর পাগলা!–শ্রীনাথ হাসে, বাচ্চারা কি মাইনে-করা লোকের কাছে ভাল মানুষ হয়? যাকগে, সেটা পরে ভেবে দেখা যাবে। এ বছরই তো কিছু হচ্ছে না। নতুন সেসনে ওকে কলকাতার ভাল স্কুলে ভর্তি করব। তার দেরি আছে।
বাবার সঙ্গে দেখা করেছিস?
করেছি। বাবা বলছিল, তুমি নাকি এক বাড়িতে থেকেও তার খোঁজখবর নাও না।
নিই না ঠিক নয়। মাঝে মাঝে নিই। তবে এক বাড়িতেই তো থাকা, ব্যস্ততার কিছু নেই।
আর-একটা কথা, মেজদা।
তুই আজ অনেক কথা বলছিস।
প্রয়োজন হয়েছে বলেই বলছি।
বল। শুনছি।
ঘরের কথা বাইরে লোককে জানানো কি ভাল?
শ্রীনাথ ঠান্ডা বিড়িটার দিকে চেয়ে থাকে। জবাব দেয় না।
দীপনাথ অত্যন্ত ঠান্ডা দৃঢ় স্বরে বলে, এ কাজটা কিন্তু মোটেই ঠিক নয়। মনে রেখো, এই পবিবারের সঙ্গে আমাদের সকলেরই সম্মান জড়িয়ে আছে। বউদির নামে তুমি যদি বাইরে কিছু রটাও সেটা আমাদেরও ছোট করে দেয়, তোমাকেও করে। তুমি সেটা বুঝতে চাও না কেন?
ওসব কথা থাক।–শ্রীনাথ অস্বস্তি বোধ করে বলে।
আজ থাক। কিন্তু পরে যদি শুনি তবে আবার কথাটা তুলব, আর তুমি যদি মনে করো যে, মানসিক দিক দিয়ে তুমি নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছ তা হলে তা জানিয়ো, ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করব।
সুস্পষ্ট এটা ওয়ার্নিং। দীপনাথকে শ্রীনাথ খুব ভাল করে চেনে না। তবে এটা জানে যে, দীপনাথের নৈতিক বোধ খুব প্রবল, সবাই তাকে দাদা মল্লিনাথের মতোই শক্ত-সমর্থ লোক বলে জানে। তবে মল্লিনাথের নীতিবোধে ঘাটতি ছিল, দীপনাথের তা নেই।
শ্রীনাথ বুঝতে পারল না দীপুকে তার ভয় পাওয়া উচিত কি না। বোধহয় উচিত। কেননা গত পাঁচ মিনিট সে দীপনাথের চোখে চোখ রাখা দূরের কথা, তার দিকে চাইতেই পারল না।
দীপনাথ উঠল, আমি একটু নিতাই খ্যাপার খোঁজ করতে যাচ্ছি। যাওয়ার সময় দেখা হবে তোমার সঙ্গে।
আয়।
দীপু চলে যেতে নিশ্চিন্তির শ্বাস ছাড়ল শ্রীনাথ। ভারী ভয়েব গুডগুড়ানি উঠেছিল বুকের মধ্যে। ঠিক এই রকম ভয় পেত সে দাদা মল্লিনাথকে।
ডায়েরি বন্ধ করে রাখল শ্রীনাথ। আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। উঠে বহুকাল বাদে সে বিনা প্রয়োজনে ভিতরবাড়ির রাস্তায় পা দিয়ে হাঁটতে থাকে।
তৃষা নিজের ঘরের বারান্দায় একটা প্লাস পাওয়ারের চশমা চোখে দিয়ে মাদুরে বসে জাবদা খাতায় কী লিখছিল নিচু হয়ে। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। চাঁদনি নেই, কিন্তু থোকা থোকা জোনাকি জ্বলছে চারদিকে। ঝিঝি ডাকছে।
তার সাড়া পেয়ে মুখ তোলে তৃষা।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শ্রীনাথ টের পায়, তৃষা আর যুবতী নেই। তৃষা প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছে। বসার ভঙ্গি, চশমা, মুখ তুলে চাওয়া—এসব কিছুর মধ্যে সুস্পষ্টই বয়সের প্রগাঢ়ত্ব এসে গেছে।
তুমি!
একটু এলাম।
বোসো।
শ্রীনাথ মাদুরে বসল। দূরত্ব রেখে।
তৃষা নিজে থেকেই বলে, দীপুর সঙ্গে দেখা হয়েছে?
হুঁ।
ও বড় ভাল ছেলে।
হ্যাঁ।
আর কথা খুঁজে পাচ্ছিল না শ্রীনাথ।
৩৭. অন্ধকার উঠোন ভরতি জোনাকি
অন্ধকার উঠোন ভরতি জোনাকি পোকার নীলচে আলো নেচে বেড়াচ্ছে। আলোর তালে ডাকছে ঝিঝি পোকা। দুটো-একটা গাস্থ্যের শব্দ ছাড়া চারদিকে বড়ই নিঝুম।
