প্রীতমকে দেখতে গিয়েছিলে?
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, না। তোর বউদি গিয়েছিল।
সে খবর শুনেছি। তোমারও একবার যাওয়া উচিত।
এবার যাব একদিন। তুই কি প্রায়ই যাস নাকি?
যাই। প্রীতমকে তো ছেলেবেলা থেকে চিনতাম।
সে তো ঠিকই। প্রীতম ছেলেটাও ভাল। ওর যে কেন এমন হল!
সে কথা আমিও ভাবি। প্রীতমের তো কোনও পাপটাপ নেই। তবে কেন ওরই এই রোগ!
বাঁচবে না, না?
ডাক্তাররা স্পষ্ট করে সে কথাটাও তো বলছে না। তবে প্রীতম খুব বেঁচে থাকতে চায়।
এ কথায় যেন একটু অবাক হয় শ্রীনাথ! বেঁচে থাকাটা এমন কী ভাল ব্যাপার যে, লোকে বেঁচে থাকতে চাইবে! তবে মাথা নেড়ে গতানুগতিক কথাটাই বলল, তা তো চাইবেই! কে না চায়!
সেই আকাঙ্ক্ষাই প্রীতমকে বাঁচিয়ে রেখেছে। হয়তো শেষ অবধি ওই জোরেই বেঁচেও যাবে।
তাই যেন হয়। এই বয়সে বিলুটা না ভেসে যায়।
তোমার এক-আধদিন গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করা উচিত। কেন সময় পাও না বলা তো! প্রেসের চাকরিটুকু ছাড়া আর তো তোমার দায়দায়িত্ব নেই। সংসাব-টংসার সব তো বউদি দেখছে।
শ্রীনাথ আর-একটা বিড়ি ধরিয়ে বলে, সময়ের অভাবটা বড় কথা নয়। আমার কেমন যেন অসুখ-বিসুখের কাছে যেতে ইচ্ছে হয় না।
তা বলে কর্তব্য করব না? আমরা ছাড়া প্রীতম আর বিলুর কে আছে বলো?
কেন, প্রীতমের তো মা বাপ ভাই বোন, সবাই আছে শুনেছি।
আছে, তবে তারা এখানে থাকে না। সেটা কোনও কথা নয়। এখানে যখন অসহায়ভাবে আছে তখন আমাদের সকলেরই উচিত খোঁজ-খবর নেওয়া।
শ্রীনাথ একটু বিপদে পড়ে যায়। সঠিক কিছু জবাব দিতে পারে না। অন্য দিকে চেয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য বলে, সেই যে তোর সঙ্গে একটা মেয়ে এসেছিল তার খবর কী?
মেয়ে নয়, বসের বউ।
ও, আমি ভেবেছিলাম বুঝি—
কথাটা হওয়ায় ছেড়ে দেয় শ্রীনাথ। দীপনাথ একটু লজ্জা পায়। শ্রীনাথ কী ভেবেছিল তা খুব দুর্বোধ্য নয়।
দীপনাথ বলল, অন্যরকম ভাববার তো কিছু নেই। আমি তো পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়েই বলেছিলাম যে, উনি আমার বসের বউ।
তা হবে। মনে ছিল না। মেয়েটা অনেক খবর রাখে।
একালের ছেলেমেয়েরা তোমাদের আমলের চেয়ে একটু বেশি ইনফরমেশন রাখে।
তা বুঝি। সত্যই তো এমন সব কথা বলে যে আমি অবাক হয়ে যাই।
দীপনাথ মদ হেসে বলে, ইনফরমেশনের ব্যাপারে তোমার আগ্রহ খুবই কম কিন্তু মেজদা। আজকাল তোমাকে সব ব্যাপারেই খুব কোল্ড বলে মনে হয়! কেন বলো তো!
আমার কথা বাদ দে।
বউদির সঙ্গে কি বনিবনা হচ্ছে না?
কোনওদিনই হত না।
আজকাল বেশির ভাগ সংসারেই স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা হচ্ছে না দেখছি।
তাই হবে।
কিন্তু তোমরা তো আজকালকার ছেলেমেয়ে নও। যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এতদিনে আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা তৈরি হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
শ্রীনাথ একটা শাস ছেড়ে বলে, অনেক ব্যাপার আছে। সবটা তোকে বলা যায় না।
দীপনাথ গম্ভীব হয়ে বলে, আমি শুনতে চাইনি। ওসব শুনে কী হবে? সবসময়েই দু’পক্ষেরই সমান বলাব কথা থাকে। কিন্তু কথা এক জিনিস, আর কাজ অন্য।
শ্রীনাথ খুব ঘন ঘন বিড়িতে টান দেয় খানিকক্ষণ। তারপর বলে, আমার দিক থেকে আর কিছু করার নেই।
এটা ভাল নয়, মেজদা। এ বয়সেও যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রী অচেনা লোকের মতো থাকো তবে ছেলেমেয়েরা কী ভাববে? ওরা বড় হচ্ছে, বুঝতে শিখছে। মা-বাবার মধ্যে সম্পর্ক ভাল না থাকলে ছেলেমেয়েরা মানুষ হয় না।
তার আমি কী করব? আমার কিছু করার নেই।
বউদির ব্যাপারে তুমি বরফের মতো ঠান্ডা থাকলে কী করে কী হবে! বরং একদিন তোমরা মুখোমুখি বসে ঠান্ডা মাথায় কথাবার্তা বলো না কেম! বউদি তো অবিবেচক নয়। বরং আমাদের
অনেকের চেয়ে বউদির বুদ্ধি বেশি, বড়দার সম্পত্তি উনি খুব ভাল দেখাশোনা করছেন।
হ্যাঁ, ওঁর অনেক গুণ।–বিষ-গলায় বলে শ্রীনাথ।
ওই তো রাগের কথা হল। মানুষের গুণের পাশাপাশি দোষও তো কিছু থাকবেই। তোমারও কি দোষ নেই?
আমারই তো সব দোষ বলে শুনি।–শ্রীনাথ খুবই নিরুত্তাপ গলায় বলে।
এটাও রাগের কথা। শোনো মেজদা, এভাবে বারবাড়ির ঘরে তোমার বনবাস মোটেই ভাল দেখায় না। তার চেয়ে তোমরা একটা আপসরফা করে নাও।
আমাকে আর কিছু করতে বলিস না। আমি পারব না।
কেন পারবে না?
আমার ও ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই।
দীপনাথ একটু চুপ করে ভাবে। ঠিক এই অবস্থায় শ্রীনাথকে আর চাপাচাপি করা উচিত হবে কি বুঝতে পারে না। তার মনে হয়, শ্রীনাথ এখন এমন একটা হতাশা ও মানসিক অবসাদে ভুগছে যে তাকে বেশি চাপ দিলে সে খেপে উঠবে।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলে, ঠিক আছে। তুমি না চাইলে কোনও কথা নেই।
শ্রীনাথ আর-একটা বিড়ি ধবাচ্ছে। ধরিয়ে বলল, তুই যেভাবে বলছিস ওভাবে এর সমাধান হয়। অনেকদিনের অনেক ব্যাপার জমে জমে পাহাড় হয়েছে। এ শুধু কি কথা কয়ে ঠিক করা যায়?
তুমি অত বিড়ি খাচ্ছ কেন? আগে তো খেতে না।
খাই। এমনিই।
অত বিড়ি খেয়ো না।
কী আর হবে।
রেসের মাঠে তোমাকে সেদিন খারাপ লেগেছিল। প্রায়ই যাও নাকি?
যাই। তবে নিয়মিত কিছু নয়। আমার নেশা নেই। তুই যাস কেন?
সাধ করে যাই না। বোস সাহেবের সঙ্গে যেতে হয়েছিল। নইলে রেস-টেস আমি বুঝিই না।
শ্রীনাথ একটা শ্বাস ফেলে, আমার কাছে সব সমান। ভাল বা মন্দ বলে কিছু নেই।
তুমি আজকাল খুব অন্যরকম হয়ে গেছ।
সেটা আমিও টের পাই। কিন্তু কিছু করার নেই।
করার থাকলেও তো তুমি করবে না।
এ কথায় শ্রীনাথ একটু হাসল।
আমি সজলকে নিয়ে একটা কথা ভাবছি, মেজদা।
