আজ সে মদ খায়নি। মেয়েমানুষের ঘরে যায়নি। আজ দুপুরে প্রচণ্ড বৃষ্টির পর মনটা কেমন অন্য গান গাইল। প্রেসের বুড়ো মালিক মারা গেল সেদিন। গতকাল তার শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েই জীবনের নশ্বরতার দিকটা হঠাৎ আবার চোখে পড়ল তার। রাস্তা দিয়ে মড়া নিতে দেখলে বা শ্মশানঘাটে গেলে যেমনটা হয় আর কী! ফুর্তি করলে মনের ভারী ভাবটা হয়তো কেটে যেত। কিন্তু কাটাতে চায়নি শ্রীনাথ। বহুকাল অনিত্য জীবনের কথা তো ভাবেনি। নতুন একটা ভাবনা। সেটা ভেবে দেখলে ক্ষতি কী?
আজ সন্ধের মুখে ফিরে এসে পরিপাটি করে স্নান সেরে ডায়েরি নিয়ে বসেছে। আজ কোনও জ্বালা-যন্ত্রণার কথাও লিখছে না সে। আজ সে খুব শান্ত বিষণ্ণতায় লিখছে একটা যন্ত্র ও একজন মানুষের যৌথ সংগ্রামের কথা।
একদিন সেই উনিশশো পনেরো সালে খলসেপুর গ্রাম থেকে একটি ছেলে জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় এসে ড়ুবজলে পড়ে গেল। এই তরঙ্গসঙ্কুল উথাল-পাথাল দরিয়ায় সাঁতারের কায়দা। জানে না। কখনও এ রক-এ শুয়ে থাকে, কখনও ওই গাড়িবারান্দার তলায়। তখন করপোরেশনের জলের কল শুকনো থাকত না, লোকের সদাশয়তা ছিল কিছু, দানধ্যান ছিল, ইংরেজ ছিল, রাজা ছিল, জমিদার ছিল। সে এক অন্য জগৎ। কখনও কলের জল, কখনও লোকের দয়া সম্বল করে ছেলেটা টিকে রইল। দু’-একজন তার অবস্থা দেখে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। ছেলেটা গেল না… কালক্রমে সেই ছেলে কীভাবে এক মস্ত প্রেসের মালিক হল সেই কাহিনি খুব মনপ্রাণ। দিয়ে লিখছিল শ্রীনাথ। বুড়ো মালিক শচীন্দ্রনাথকে সে সত্যিই শ্রদ্ধা করত। এই একজন লোক যিনি জীবনে কাউকে বড় একটা আপনি থেকে তুমি বলেননি।
শচীনবাবু মারা গেলেন, বহুকাল বাদে খুব দুঃখ পাওয়ার মতো একটা ঘটনা ঘটল শ্রীনাথের জীবনে। আজকাল তার মন এতই ভোঁতা হয়ে গেছে যে, সহজে সে দুঃখ পায় না। মনে হয় কোনও নিকট আত্মীয়-বিয়োগ ঘটলেও তার চোখে জল আসবে না কিছুতেই।
কিন্তু এল। শচীনবাবুর বয়স হয়েছিল আশির কাছাকাছি। এই বয়সেও বেশ ভালই ছিলেন। শরীরে মেদ ছিল না, কোনও ঘ্যানঘ্যানে অসুখ ছিল না, খাওয়ার লোভ ছিল না। প্রচুর দানধ্যান করে গেছেন। শ্রীনাথ একমাত্র এই লোকটার জন্যই একটানা এতকাল এক জায়গায় নিরুপদ্রবে কাজ করে গেছে। একেবারে হালে কিছু শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মঘট, বিক্ষোভ এবং লক আউটের সম্ভাবনা ইত্যাদি দেখা দিলেও কোনওদিনই খুব বিরক্তিকর কিছু ঘটেনি। সবই মিটে গেছে। সেই প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ডটি ভেঙে গেল। তবে প্রেসের ভবিষ্যৎ ভেবে নয়, নিছক একজন মানুষের জন্যই সেইদিন খুব কেঁদেছিল শ্রীনাথ। খুব কেঁদেছিল।
তার নিজের জীবনে আর-কোনও সদর্থক লড়াই নেই, গরিব থেকে বড়লোক হওয়া নেই, সাফল্য লাভ নেই। এখন একটানা এক জীবন, ঘাত-প্রতিঘাতহীন বয়ে যাবে মৃত্যুর দেউড়ি অবধি। তাই বুঝি ওই কান্না। যে জীবন তার নয়, যে জীবন তার কখনও হবে না, তাকে সিংহাসনে বসিয়ে মানুষ মাঝে মাঝে এরকম ধুলায় পড়ে কাঁদে।
দরজার শেকল নড়ে উঠতেই সামান্য চমকে গিয়েছিল শ্রীনাথ।
মেজদা!–বাইরে থেকে কে ডাকল।
কে?
আমি দীপু। দরজা খোলো।
শ্রীনাথ উঠে দরজা খুলে দীপনাথকে দেখে একটু অবাক হয়। কারণ, দীপনাথের পরনে একটা লুঙ্গি করে পরা ধুতি, গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। এই বেশে কোত্থেকে এল?
দীপু! কখন এসেছিস?
অনেকক্ষণ। সেই বেলা থাকতে।
টের পাইনি তো?
পাবে কী করে? তুমি তো বারবাড়িতে থাকো।
দরজা ছেড়ে ঘরে গিয়ে দীপনাথকে ঘরে আসার পথ দেয় শ্রীনাথ। টেবিলের পাশের চেয়ারটায় গিয়ে ফের বসে বলে, এই ঘরটাই বাড়ির মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে।
ঘরখানা তো ভালই।–বলে দীপনাথ বিছানায় বসতে যাচ্ছিল।
শ্রীনাথ বলল, ওই আরামকেদারায় বোস। মুখোমুখি হবে। আজ কি এখানেই থাকবি নাকি?
বউদি যেতে দিল না। একটু কাজ ছিল কলকাতায়।
কাজ তো রোজই আছে। তোর চাকরির কী একটা গোলমাল চলছে না?
মিটে গেছে। আমি কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাব হয়েছি।
বাঃ খুব ভাল।
বলে শ্রীনাথ একটা বিড়ি ধরাল। আজকাল বিড়ি খেতে দারুণ লাগে। বড়বাজার থেকে স্পেশাল বিড়ি কিনে আনে পাইকারি দরে। দীপনাথের সাফল্য তাকে বিন্দুমাত্রও স্পর্শ করে না। দুনিয়ার কোনও কিছুই করে না বড় একটা! কত মাইনো হল জিজ্ঞেস করবে করবে করেও করতে পারে না। কী হবে জেনে?
খানিক বিড়ির ধোঁয়া বুকে আটকে রেখে ছেড়ে দিয়ে বলল, ভাল।
খুব ভাল। দীপনাথ চারদিকে তাকিয়ে ঘরখানা দেখে। স্থাপত্যের দিক দিয়ে ঘরটাকে গোলই বলতে হয়। সব দিকটা না হলেও পিছনের দিকটা পুরোপুরি অর্ধ বৃত্তাকার। চারদিকেই মস্ত মস্ত জানালা। এই ঘরের নাম মল্লিনাথ দিয়েছিল ভাবন-ঘর।
হঠাৎ দীপনাথ প্রশ্ন করে, বড়দা এই ঘরে বসে কী ভাবত বলো তো!
কে জানে!
বড়দাকে কখনও কিছু খুব ভাবতে তো দেখিনি। হইচই করত, ফুর্তি করত, ভাবত কখন?
ভাবত, ভাবত। না ভাবলে, ব্রেন না খাটালে এত সম্পত্তি করল কী করে অত অল্প বয়সে?
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, ভাবলেও অলস চিন্তা করত না। এই ঘরটা আসলে ছিল কাজের ঘর। ড্রইং করত, প্ল্যান আঁকত।
তা হবে। আমি তো কিছু করি না, বসে বসে ভাবি। ঘরটার নাম আমিই সার্থক করছি।
কী ভাবো তুমি?–সকৌতুকে প্রশ্ন করে দীপনাথ। তার সন্দেহ মেজদারও ভাবনা-চিন্তা করার মস্তিষ্ক নেই।
আমার সবই অলস চিন্তা। অলস মাথা শয়তানের বাসা।
