আপনার চা।
একটু চমকে ওঠে দীপনাথ। বউদির ঝি বৃন্দা।
রেখে যাও।
বলে বন্দুকটা আবার সোজা করে কাধে তুলে দেয়ালের দিকে তাক করে দীপনাথ। বড়দার হাত ছিল পরিষ্কার। শুধু বন্দুকের টিপ কেন, কোন দিকটাতেই বা খামতি ছিল বড়দার! বিশাল চেহারার অতি সুন্দর পুরুষ, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, সাহসী, ডানপিটে। যেখানেই গেছে সেখানেই সহজাত কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। কারও কাছে মাথা নোয়ায়নি। শুধু একটু চরিত্রের দোষ ছিল। মদ আর মেয়েমানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়েটা কেন করল না তা সঠিক বোঝা যায় না। যখন উত্তরবাংলায় ছিল তখন মাঝে মাঝেই পিসির বাড়িতে হানা দিয়েছে। হইচই ফুর্তি করতে খুব ভালবাসত। দীপনাথ তখন রামকৃষ্ণ ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করে। স্বাস্থ্যখানা বরাবর পেটানো ছিল। মল্লিনাথ তার কাঁধে থাবড়া মেরে বলত, তুই হবি আমার মতো। স্বাস্থ্য না হলে কি পুরুষকে মানায়?
ঘোর-ঘোর হয়ে এসেছে ঘরখানা। বন্দুকটা কোলে নিয়ে প্রায় জুড়নো চায়ে চুমুক দিতে দিতে জলজ্যান্ত চোখের সামনে যেন দেখতে পেল মল্লিনাথকে। দীপনাথ গভীর একটা শ্বাস ফেলে বলল, অত স্বাস্থ্য ছিল তোমার, তাও বাঁচলে কই? তুমি বেঁচে থাকলে আমাদের একটা আশ্রয় থাকত। বাড়িঘরের আশ্রয় নয়, মনের আশ্রয়।
টুক করে ঘরের আলো জ্বলে উঠল। খুব জোরালো নয়, নিস্তেজ হলুদ আলো। সেই আলোয় তৃষা সামনে দাঁড়িয়ে লাজুক মুখে হেসে বলল, নাও, হল তো!
দীপনাথ দেখে, হলুদে খয়েরিতে ছাপা সুন্দর শাড়িতে বউদির বয়স কম করেও দশ বছর কমে গেছে। কিন্তু হাসিটি সত্ত্বেও মুখ এত মলিন যে শাড়িটাকে ছদ্মবেশ বলে মনে হয়।
তৃষা চোখ নামিয়ে শাড়িটা একবার দেখে বলল, বুড়ো বয়সের এত সাজগোজ কে দেখবে বলো তো!
মেয়েরা নিজেদের জন্যই সাজে।
তোমাকে বলেছে!
ঠিক আছে, তুমি না হয় আমার জন্যই সেজো। তোমাকে বুড়ি দেখতে আমার ভাল লাগে না।
এ কথায় তৃষা যেন কিছুক্ষণ নিজেকে খুঁজে পেল না। শক্ত মেয়ে হরিণীর মতো চকিত চোখে চারদিক দেখতে লাগল। তারপর হঠাৎ চোখ পড়ায় ভ্রু কুঁচকে বলল, কী সর্বনাশ! তুমি যে বন্দুক নিয়ে বসে আছ। কিন্তু ভাই, আমি তো রোহিণী নই।
দীপনাথ হেসে বলে, আমারই-বা কোন গোবিন্দলাল হওয়ার দায় ঠেকেছে।
দীপনাথ বন্দুকটা আবার র্যাকে তুলে রেখে বলল, শিলিগুড়িতে থাকতে এই বন্দুকটা কয়েকবার চালিয়েছি। হঠাৎ হাতের কাছে পেয়ে একটু দেখছিলাম। এটা যত্ন করে রেখো।
যত্নেই আছে। এতদিন থানায় জমা ছিল। নিয়ে এসেছি।
ভাল করেছ। বাবা ফিরেছে?
না। উনি বোধহয় শিমুলতলায় বুড়োদের আড্ডায় বসেছেন।
বাবাকে চাকরির খবরটা দিতেই আসা।
আজই চলে যাবে নাকি?
যাব না?
খুব যদি জরুরি কাজ না থাকে তবে থেকে যাও না রাতটা!
কেন বলো তো?
কেন আবার! তুমি এলে আমরা কত খুশি হই জানো না? ছেলেটা তো বড় কাকা বড় কাকা করে অস্থির। আমাকেও জ্বালিয়ে খায়। সবাইকে বলে তুমি নাকি দারুণ ভাল বক্সিং জানো, আরও কী কী সব যেন। বলে, বড় কাকা একাই পঞ্চাশজন গুন্ডাকে মেরে পাট করে দিতে পারে।
বহুকাল বাদে এমন হোঃ হোঃ করে হাসল দীপনাথ। বলল, ব্যাটা বোধহয় খুব অ্যাডভেঞ্চারের বই-টই পড়ে।
ভীষণ। আর দিনরাত্তির কেবল মারপিটের গল্প।
ওর জন্য এয়ারগান এনেছি।
কত কী এনেছ পাগল! কত টাকা নষ্ট হল।
আমার মাইনে দেড় হাজার, মনে রেখো।
দেড় হাজার!–বলে একটা শ্বাস ছাড়ে তৃষা। বলে, সংসারী হলে বুঝতে এই বাজারে দেড় হাজার কিছুই নয়। এখন থেকে কিছু কিছু করে জমাও।
তুমি সত্যিই বুড়ি হয়েছ।
সেই মেয়েটার কী খবর বলো তো! যাকে একদিন সঙ্গে করে এনেছিলে!
মেয়ে নয়, বউ। বসের বউ।
ওই হল। সে কেমন আছে?
ভাল না।
কেন?
স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে।
তৃষা একটু চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, সত্যি বলো তো ঠাকুরপো, ডিভোর্সের কারণ তুমি নও তো?
দীপনাথ চমকে তাকায়, কী যা-তা বলছ?
আর-একদিন ঠাট্টা করেছিলাম, তুমি রেগে গিয়েছিলে। আজ কিন্তু ঠাট্টা করছি না। আমার সত্যিই ধারণা, ও মেয়েটা তোমাকে অসম্ভব ভালবাসে।
দূর! আমাকে দেখলেই যা-তা বলে। কথায় কথায় অপমান করে, তুমি একটি বুদ্ধ!
তৃষা হাসল, তা হলে বলি, এবার ঠিক জানলাম মেয়েটা তোমার প্রেমে পড়েছে। নইলে অপমান করত না।
৩৬. ওপরে আজকের তারিখ
ওপরে আজকের তারিখ। নীচে সাদা পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে শ্রীনাথ তার ডায়েরি লিখছিল। আগেও লিখত মাঝে মাঝে। তবে সেসব ছিল গাছপালার কথা, নানা অভিজ্ঞতা এবং ভাবনা-চিন্তার কথা। আজকাল সে লিখছে নিজের জীবনের সব নোংরামির কথা। জ্বালা-যন্ত্রণার কথা। কিছুই গোপন করছে না, বরং এত খোলাখুলি লিখছে যে লেখার পর সেটা পড়তে গেলে তার নিজেরই মাথা গরম হয়ে যায়। তবু তার মধ্যে আছে বিষাক্ত, জ্বালাধারা, তীব্র এক সুখও।
সবচেয়ে উত্তেজনা হয় যখন তৃষার কথা লেখে, মল্লিনাথের কথা লেখে। ওদের অবৈধ প্রেম এবং সজলের জন্মকথা সবটাই সে লিখেছে কিছু তথ্য ও কিছু অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু গল্পটা জমেও গেছে বেশ।
শ্রীনাথ জানে, তার ঘরে কোথাও কিছু গোপন করার উপায় নেই। তৃষা ড়ুপ্লিকেট চাবি করিয়ে রেখেছে। তার অনুপস্থিতিতে এই ঘরে প্রায়ই নিখুঁত তল্লাশি চালানো হয়। তৃষা কী খোঁজে সেই জানে। তবে শ্রীনাথ তার ডায়েরিটা খুব সহজ জায়গায়, হাতের কাছে, টেবিলের ওপরেই রেখে যায়। তৃষা পড়ুক। শুধু তৃষাকে পড়ানোর জন্যই না তার এই নিরন্তর ডায়েরি লিখে যাওয়া! এর জন্যই সে বেশ মোটা একটা খাতা তার প্রেস থেকে বাঁধিয়ে এনেছে।
