আধ ঘণ্টায় কলকাতাকে ড়ুবিয়ে, গাড়িঘোড়া বন্ধ করে দিয়ে বৃষ্টি থামল।
রাস্তায় বেরিয়ে দীপনাথ ঠিক করতে পারছিল না কোথায় যাবে। মণিদীপা, প্রীতম কিংবা বাবা। ভেবে দেখল অনেকক্ষণ। মণিদীপা হয়তো বাড়িতে নেই এখন। প্রীতম সম্ভবত ঘুমোচ্ছ। তা ছাড়া খবরটা সকলের আগে বাবাকেই দেওয়া উচিত। বহুদিন হল বাবার সঙ্গে দেখা হয় না।
সজলকে একটা এয়ারগান দেওয়ার কথা ছিল। নিউ মার্কেটে গিয়ে একটা এয়ারগান কিনল দীপনাথ। তারপর ভাবল, সকলের জন্যই কিছু নেওয়া উচিত। সুতরাং বউদির জন্য একটা রঙিন শাড়ি, বাবা আর মেজদার জন্য ধুতি, মঞ্জু আর স্বপ্নার জন্য দুটো ম্যাক্সি কিনে নিল। পকেটে গত মাসে পাওয়া আটশো টাকার অনেকটাই অবশিষ্ট ছিল।
রতনপুর পৌঁছোতে বিকেল। কলকাতার কংক্রিট থেকে এই সবুজ গাছপালার মধ্যে হঠাৎ এসে পড়লে মনটা জুড়িয়ে যায়।
পথটা হেঁটেই পার হয় দীপনাথ, সমস্ত শরীর আর মন দিয়ে চারদিককাব প্রকৃতি থেকে স্নিগ্ধতা শুষে নিতে নিতে। অল্প দূরে মাঠের ধারে সূর্য নামছে। পাখির ডানার শব্দ। গাছপালায় বাতাস লাগছে এসে।
বাড়িটা ভারী নিঃঝুম। ঢুকতেই প্রথমে শ্রীনাথের ভাবন-ঘর। দরজায় তালা ঝুলছে। ভিতরবাড়ি পর্যন্ত অনেকটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে দীপনাথ চারদিকে চেয়ে দেখছিল পুকুরপারের ঝোপড়াটায় খ্যাপা নিতাই না কে একটা লোক থাকে। সেদিক থেকে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল মাত্র, কিন্তু কোনও মানুষের সাড়া নেই।
খানিক ঘেউ ঘেউ করে কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে সঙ্গ ধরে।
উঠোনে পা দিয়ে দীপনাথের একটা কেমন যেন লাগে। বাড়িটা নিস্তব্ধ, নিরানন্দ। লোকের মানসিকতা কি বাড়ির চেহারাতে ফুটে ওঠে? কে জানে! কিন্তু পশ্চিমের রাঙা রোদে ভেসে-যাওয়া মস্ত উঠোনে দাঁড়িয়ে দীপনাথের মনে হয়, এ বাড়িতে যেন বিষাদ ঘনিয়ে আছে। বাবা কি তা হলে নেই!
বউদি! ও বউদি!
বড় ঘর থেকে তৃষা বেরিয়ে আসে, ওমা! বড় ঠাকুরপো! এসো, এসো।
শঙ্কিত চোখে তৃষার দিকে চেয়ে দীপনাথ বলে, বাবা! বাবা কোথায়?
বাবা বেড়াতে গেছেন। সারাদিন বসে থাকেন তো। আজকাল তাই বিকেলের দিকে রিকশায় করে বেড়াতে পাঠিয়ে দিই। বোসো, এক্ষুনি এসে যাবেন।
খুব বিশেষ মানুষ ছাড়া তৃষা নিজের ঘরে কাউকে বসায় না। দীপনাথকে বসাল। বলল, এতদিন পরে মনে পড়ল?
মনে রোজই পড়ে। সময় হয় না।
কলকাতার লোকদেরই যত সময়ের অভাব। না?
কথাটা মিথ্যে নয়। আচ্ছা বউদি, বাড়িটা আজ এরকম লাগছে কেন বলো তো?
কীরকম?
ঠিক বোঝাতে পারব না। খুব আনহ্যাপি যেন।
যাঃ। আনহ্যাপির কী আছে!
বাচ্চাগুলো কোথায়?
এ সময় ওরা বাড়িতে থাকে নাকি? খেলতে-টেলতে গেছে। ওসব কী এনেছ অত?
দেখো তো এই শাড়িটা কেমন?–বলে তৃষার শাড়িটা পলিথিনের প্যাকেট থেকে বের করে দীপনাথ।
বাঃ, বেশ শাড়ি। কার জন্য কিনলে?
তুমি পরবে।
আমি! আমি কি আজকাল রঙিন শাড়ি পরি নাকি! পাগল কোথাকার।
কেন, রঙিন শাড়ি পরলে কী হয়?
যাঃ, ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে না। তা ছাড়া তোমাকে এসব পাকামি করতে কে বলেছে? আমার জন্য শাড়ি আনার কী দরকার পড়ল হঠাৎ বলো তো? বিয়ে-টিয়ে ঠিক হয়েছে নাকি?
না, তবে বিয়ের পথ পরিষ্কার হয়েছে। আমি একটা দেড় হাজারি চাকরি পেয়েছি।
ওমা! তাই নাকি! তা হলে পাত্রী দেখি?
দীপনাথ স্মিতমুখে চেয়ে বলল, তোমার হাতে অনেক পাত্ৰী আছে জানি। ধীরে সুস্থে দেখো। আগে রঙিন শাড়ির প্রবলেমটা মিটুক। তুমি রঙিন শাড়ি পরবে না কেন?
বয়স হচ্ছে না!
লাজুক ভাব করে তৃষা বলে। মল্লিনাথ ছাড়া বোধহয় দীপনাথই একমাত্র পুরুষ যাকে খুব কাছের লোক বলে ভাবতে পারে তৃষা। এই দেওরটির মুখোমুখি হলে তার সব কঠোরতা কোমল হয়ে আসে, বুকের জ্বালাগুলো মিইয়ে যায়।
তোমার কত বয়স?
কে জানে বাবা! শুধু জানি, ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে, আমিও বুড়ি হচ্ছি।
তোমার দ্বিগুণ বয়সের মহিলারা কত ঝলমলে শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে, দেখো না?
কলকাতায় ওসব কেউ মাইন্ড করে না। কিন্তু এ তো কলকাতা নয়! গা গ্রামকে তো জানো না! এখানে নিন্দে রটে।
সেটা তোমার ইমাজিনেশন। গা গ্রামও আর আগের মতো শরৎচন্দ্রের যুগে পড়ে নেই। বুড়োমিটা একটু কমাও। যাও গিয়ে শাড়িটা পরে এসো।
আচ্ছা আচ্ছা হবে ’খন। আগে জিরিয়ে নাও, চা করতে বলে আসি।
ভ্রুকুটি করে দীপনাথ বলে, আগে শাড়ি পরবে, তারপর আমি এ বাড়িতে জলগ্রহণ করব। যাও।
তৃষা হাসে না। মলিন এক মুখ করে খানিকক্ষণ দেওরের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর মৃদু স্বরে বলে, আচ্ছা, পরছি।
তৃষার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ কষ্ট হল দীপনাথের। বউদিকে সে কোনওদিন ঠিক এরকম বিষাদ-প্রতিমা দেখেনি। তৃষা কোথাও কখনও হার মানে না, ভেঙে পড়ে না।
সে বলল, তোমার কী হয়েছে বলো তো!
কিছু না গো।–বলে তৃষা জোর করা হাসি হেসে চলে যেতে যেতে দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল, রঙিন শাড়ি পরে আসছি, তখন দেখো কেমন ঝলমলে আর হাসিখুশি দেখায়।
বলেই চলে গেল।
মল্লিনাথের ঘরটায় একা বসে চারদিক দেখে দীপা খাটের পাশেই বন্দুক রাখার র্যাকে মল্লিনাথের পুবনো বন্দুকটা ফিরে এসেছে। কৌতূহলী দীপনাথ উঠে গিয়ে বন্দুকটা তুলে নেয়। ঘঁাচা ইস্পাতের সিকিম জিনিস। প্রচণ্ড ভারী। ঘোড়ার কাছে লোহার ওপর নানা কারুকার্য করা। কুঁদোর গায়ে একটা খোদাই করা পেতলের পাতে ইংবিজিতে লেখা এম এন চ্যাটার্জি। বন্দুকটা ভেঙে ব্যারেলের ফুটোয় চোখ রাখে দীপনাথ। সদ্য পরিষ্কার করা বর্তুল আয়নার মতো ইস্পাতে ঝকমকিয়ে উঠল আলো আর প্রতিবিম্ব।
