হুঁ। তবে বাংগালোর নিয়ে তো আমার কোনও প্রবলেম ছিল না। আমার প্রবলেম যেটা সেটা রয়েই গেল।
কী?–দীপু ঝুঁকে বসে।
মণি। আমার স্ত্রী।
আমরা কিছুই করতে পারি না মিস্টার বোস?
বোস মাথা নাড়ে, না। নেক্সট মানথ উই আর গোয়িং টু কোর্ট।
কোর্ট, বোস সাহেব? কোর্ট?
কোর্ট। মিউচুয়াল করে নিচ্ছি। তারপর কোম্পানির কাজে একটু বাইরে যাব। শীতের আগেই।
কোথায়?
মিডল ইস্ট। তারপর আমেরিকা। লম্বা টুর। ভালই হবে। দি উন্ডস উইল বি হিলড।
দীপনাথ এবার চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখে।
বোস হাসে হঠাৎ। বলে, ইজ দি পেমেন্ট অলরাইট?
খুব ভাল। আনএক্সপেক্টেড।
বোস সাহেব মাথা নেড়ে বলে, দ্যাটস ফুলিশনেস। আমার কাছে বললেন ভালই, খবরদার আর কাউকে বলবেন না। নাথিং ইজ টু গুড অ্যাজ ফার অ্যাজ ইউ ক্যান স্ট্রেচ দেম।
আপনাকেই বলছি।
আমাকেও নয়। আমি ম্যানেজমেন্টের লোক।
দীপনাথ হাসে।
বোস সাহেব মুখটা একটু গম্ভীর করে বলে, একটা কথা বলে রাখি। আপনার কোয়ালিফিকেশন খুব জেনারেল ধরনের বলে আপনার পে অন্য তিনজনের চেয়ে খানিকটা কম। বাকি তিনজন বেসিক স্যালারি পাবে রাউন্ড অ্যাবাউট টু থাউজ্যান্ড।
পাক, আমার অভিযোগ করার কিছু নেই।
থাকলেও আপাতত কিছু করা যেত না। আমি বেশি চাপাচাপি করিনি। তা হলে ম্যানেজমেন্ট অন্যরকম সন্দেহ করত।
ঠিক আছে।
বোস মাথা নেড়ে বলে, ঠিক নেই। আমি জানি। তবে আমি তো থাকছিই। বছর খানেকের মধ্যেই সকলের স্ট্যাটাস সমান করব। কথা দিচ্ছি।
দীপনাথের কাছে চাকরির আনন্দ অনেকটাই বিস্বাদ হয়ে গেছে। বোস আর মণিদীপার বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, সেটা তার চাকরি পাওয়ার চেয়েও গুরুতর ঘটনা।
দীপনাথ বলে, আমি মিসেস বোসের কাছে শেষবারের মতো একটু যাব?
বোস অবাক হয়ে বলে, নিশ্চয়ই যাবেন। ইউ নিড নো পারমিশন। কিন্তু কেন?
আর একবার চেষ্টা করব।
বোস হাসে। নিজের মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে স্নান ও সুন্দর হাসিটি ঝুলিয়ে রেখেই বলে, ড়ুয়িং গুড টু আদারস? ইউ আর রিয়েলি ইম্পসিবল। আপনাকে তো বলেইছি, প্রবলেমটা ইমোশনাল নয়। হার্ড ফ্যাক্ট।
জানি। খানিকটা বুঝতেও পারি। কিন্তু আমার মনে হয় প্রবলেমটা তেমন জটিল কিছু নয়। হয়তো আপনাদের সম্পর্কের একটা ছোট্ট কোনও আনঅ্যাডজাস্টমেন্ট আছে। আর সেইটেই এখন ফেঁপে ফুলে উঠেছে।
বোস আনমনে মধ্য-দুরত্বের শূন্যে চেয়ে কী যেন ভাবছিল। দীপনাথের কথাটা শুনে বলল, হতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী, আমি কাজকর্ম নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে, নিজের স্ত্রীকে নিয়ে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করার সময় পাইনি। চিন্তা করার দরকার হয়নি এতকাল।
এখন কি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন মিস্টার বোস?
বোস সাহেব চমক্কার করে হাসল। ইদানীং বোসের হাসিতে একটা বিষাদ যুক্ত হওয়াতেই বোধহয় হাসিটা ফোটে ভাল।
বোস সাহেব বলে, ইন ফ্যাক্ট, আমার কাছে ডোমেস্টিক অ্যান্ড কনজুগাল প্রবলেমগুলো ভীষণ ফরেন। দীপা এমন সব প্রবলেম তৈরি করে যেগুলো আমি বুঝতেই পারি না। ম্যাজিসিয়ানরা যেমন শুন্যে টুপি থেকে খরগোশ বের করে, দীপাও তেমনি আউট অফ নাথিং ক্রাইসিস তৈরি করতে পারে।
কীরকম ক্রাইসিস?
বলতে গেলে মহাভারত। আমার অত মনেও থাকে না। আই হ্যাভ মোর ইমপর্ট্যান্ট থিংস টু থিংক অ্যাবাউট। বিয়ে করুন, আপনিও জানতে পারবেন।
বিয়ে সবাই করে, কিন্তু সকলের তো আপনাদের মতো প্রবলেম দেখা দেয় না।
সেটাও সত্যি। আমরা বোধহয় একটু বেশি আপ-স্টার্ট।
না, না, তা নয়। আপনারা চমৎকার একটি দম্পতি। আমি তো জানি।
বাইরে থেকে বোধহয় ভালই দেখায় আমাদের। যাকগে, ওসব কথা থাক। ডিভোর্স হলে আমি বা দীপা কেউই বোধহয় খুব কিছু লুজ করব না।
বিয়ে ভেঙে-যাওয়াটা একটা সোশ্যাল স্ক্যান্ডাল, আপনিই সেদিন বলেছিলেন।
নিশ্চয়ই। স্ক্যান্ডাল এড়ানোর জন্য আমি দীপার সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ যেতে চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, লেট আস লিভ টুগেদার লাইক কো-টেনান্টস।
উনি কী বললেন?
দীপা গায়ে জ্বালা ধরানো হাসি হেসেছিল। কিন্তু চ্যাটার্জি, আমার অনেক কাজ আছে। এসব এখন থাক।
দীপনাথ উঠল। বলল, আমি নতুন পোস্টে কবে জয়েন করব?
আজই।
নর্থ বেঙ্গল কবে যেতে হবে।
তিন-চার দিনের মধ্যেই।
আসছি বোস সাহেব।
শুনুন, আপনি আজ জয়েন করলেও আজই আপনাকে কোনও কাজ দেওয়া হবে না। আপনি এখন চলে যেতে পারেন। সামনের মাস থেকে কাজের প্রেশার বাড়বে। ততদিন একটু বিশ্রাম করে নিতে পারেন।
আচ্ছা। একটা কথা, আমি কি আমার আত্মীয় এবং বন্ধুদের জানাতে পারি যে, আমি এ চাকরিটা পেয়েছি?
নিশ্চয়ই। আপনার চাকরি একদম পাকা।
থ্যাংক ইউ।—বলে দীপনাথ বেরিয়ে আসে।
একটু অন্যমনস্ক ছিল বলে অফিসের চারদিকে লক্ষ করেনি। বেরোবার মুখে রঞ্জন এসে ধরল, কী দাদা! কতবার যে ইশারা করলাম, দেখতেই পেলেন না?
দীপনাথ থতমত খেয়ে বলে, একটু অন্য কথা ভাবছিলাম।
সে তো বুঝতেই পারছি। খবর কী বলুন তো? আমরা তো শুনছি আপনি কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হচ্ছেন।
হ্যাঁ। আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেলাম।
অভিনন্দন না কী যেন জানাতে হয়! তাই জানাচ্ছি।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। আজ একটা কাজ আছে রঞ্জন, চলি।
আমার কেসটা একটু দেখবেন। এখন তো আপনি টপ-বসদের একজন।
নিশ্চয়ই। পরে কথা হবে।
বেরিয়ে এসে নীচের ফটকে দাঁড়িয়ে দীপনাথ দেখে, বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। দরজায় ভিড় জমে আছে। বেরোনো যাবে না। কিন্তু অফিসেও ফিরে যেতে ইচ্ছে করল না তার। চুপচাপ ভিড়ের একটু পিছনে দাঁড়িয়ে রইল। মনে অজস্র কথার ঝড়।
