বউদি চাকরি করে, সুতরাং তুমি রুগি মানুষ সারাদিন একা পড়ে থাকো। শোনার পর থেকেই মা খুব অস্থির। নার্স বা আয়ার হাতে তো ঠিক যত্ন হয় না। মা বলে পাঠিয়েছে, শিলিগুড়ির বাড়িতে তোমার সবরকম ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা হবে। আমরা সবাই আছি। এখানে এরকম অসহায় থাকবে কেন?
প্রীতম কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সেটা কি ভাল হবে? বিলু কী ভাববে?
বউদি তো তেমন কিছু ভাবছে না। নইলে এরকম অবস্থায় তোমাকে রেখে চাকরি করছে কেন? তোমার টাকার দরকার হলে একটা পোেস্টকার্ড ছেড়ে দিলেই আমরা টাকা পাঠাতে পারতাম। বউদির চাকরি করার দরকার ছিল না।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, তা জানি। টাকাটা কোনও কথা নয়, আমি গেলে বিলু আর লাবুর গার্জিয়ান কে থাকবে?
সেটা তুমি বউদির সঙ্গে কথা বলে ঠিক করো! মত হলেই আমি প্লেনের টিকিট কাটব।
তুই স্নানে যা। বিলু আসুক। আমি একটু ভেবে দেখি।
প্রীতম চোখ বুজে থাকে। সংসারে একটা বিরোধ এতকাল চাপা পড়ে ছিল। এখন কি সেটা বেরিয়ে আসবে প্রকাশ্যে? একটা লড়াই শুরু হল নাকি তাকে নিয়ে? শতমের মুখচোখে ওরকম একটা কাঠ-কাঠ শক্ত ভাব কেন? ভিতরে যেন গনগনে রাগের আগুন!
শতম বাথরুমে গেল। দরজার শব্দ শুনল প্রীতম। সংসারে ঝগড়াঝাটিকে বড় ভয় পায় প্রীতম। অশান্তির ভয়ে সে চিরকাল চুপ করে থেকেছে। বহু অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনি, অনেক ন্যায্য কথা বলতে চেয়েও বলেনি।
ভিতরে ভিতরে বড় অস্বস্তি হচ্ছিল প্রীতমের। তাকে নিয়েই এখন এই টানা-হ্যাঁচড়ার সূত্রপাত ঘটবে।
ঠিক এই সময়ে কপালে একটা ঠান্ডা নরম করতল কে যেন রাখল। ছোট হাতখানা।
প্রীতম চোখ খুলে দেখে, পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয় মুখখানা ঝুঁকে আছে মুখের ওপর।
ঘুমোচ্ছিলে বাবা?
না। ফাংশন কেমন হল?
খুব ভাল। আমি কিন্তু রাস্তার মোড় থেকে গলিটা হেঁটে একা একা বাড়িতে এলাম।
কেন, তোমার মা?
মা তো অরুণমামার সঙ্গে কথা বলছে। সেই মোড়ে।
অরুণমামা গিয়েছিল নাকি তোমাদের সঙ্গে?
হ্যাঁ তো। আমরা যে অরুণমামার গাড়িতেই গেলাম মোড় থেকে।
ও। ভাল, খুব ভাল।–বলে লাবুর হাতখানা মুঠোয় চেপে চোখ বোজে প্রীতম। তারপর গাঢ়স্বরে বলে, তোমার কাকা এসেছে। শতাকাকা। শোনো মা, আমি যদি শিলিগুড়ি চলে যাই তা হলে কি তোমার খুব কষ্ট হবে?
আমিও যাব।
তোমার যে স্কুল! তোমার মাও এখানে থাকবে।
ইস! তুমি গেলে আমার যে কান্না পাবে।
৩৫. চেম্বারে ঢুকতেই বোস সাহেব
পরদিন চেম্বারে ঢুকতেই বোস সাহেব হাসিমুখে বলে, উড ইউ লাইক এ ট্রিপ টু নর্থ বেঙ্গল?
দীপনাথ একটু হকচকিয়ে যায়। শিলিগুড়ি! এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?
সে কোনও জবাব দেওয়ার আগেই বোস সাহেব বলে, এবার অবশ্য একদম ইন্ডিপেডেন্ট ট্যুর। সঙ্গে আমি থাকছি না।
তবে?
তবে আবার কী? আপনার দায়িত্ব বাড়ছে। আমি আর আগের মতো ট্যুরে যেতে পারছি না। অফিসটাকে ঢেলে সাজাতে হবে অ্যান্ড আই অ্যাম ডগ টায়ার্ড! টুর এখন থেকে আপনার।
সব ট্যুর?
সব না হলেও কিছু।
নর্থ বেঙ্গল আমার ফেবারিট–
বোস হাত তুলে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তাকে থামায়। বলে, আমি জানি। নর্থ বেঙ্গলে যেতে পারলে যে আপনি কত খুশি হন তা আপনার চোখমুখ দেখেই বুঝেছি।
থ্যাংক ইউ।
ইটস অল ইন দি জব। আমার কোনও কেরামতি নেই। আরও তিনজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আসছেন। আমি তাদের রিক্রুট করিনি, করেছে কোম্পানি। তাবা গুজরাট, পাঞ্জাব এবং কেরালার লোক। বাঙালি কেবল আপনি।
আমি? আমি তো এখনও–
বোস সাহেব আবার হাত তোলে, কথাটা এখনও শেষ হয়নি চ্যাটার্জি। যা বলছিলাম। আপনিই চারজনের মধ্যে একমাত্র বাঙালি এবং মোস্ট প্রোবলি একমাত্র ইনএফিসিয়েন্ট লোক।
দীপনাথ এটা ঠাট্টা কি না না-বুঝে একটা গাড়লের হাসি হাসল।
তবে এও জানি অন্যে যখন টু্যরের নামে দু’হাতে টাকা লুটবে তখন আপনিই একমাত্র পাইপয়সারও ডিটেলস হিসেব দেবেন। তাই বলছি আপনার ইনএফিসিয়েন্সির তুলনা হয় না।
এটা কি কমপ্লিমেন্ট বোস সাহেব?
না।–বলে বোস তার বাঁ ধারে আলাদা করে রাখা একটা সাদা খাম তুলে তার হাতে দিয়ে বলে, এটা কমপ্লিমেন্ট নয়। জাস্ট দি রিকগনিশন।
দীপনাথ খামটা খুলল। আমেদাবাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস তাকে কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার করেছে। খবরটা বহুবার বোস সাহেবের কাছে শুনেও তেমন বিশ্বাস হয়নি। বাংগালোরের ফাঁকড়া থাকায় বরং কথাটা শুনলে মন খারাপ হত। কিন্তু এখন চিঠিটা হাতে পেয়ে তার সমস্ত শরীর মন মাথা ভেসে যাচ্ছে আনন্দে শিহরনে। মোটামুটি বড় একটা কোম্পানির সে জোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। মাইনে দেড় হাজার এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধে।
এতটা আশা করেনি দীপনাথ। বিভ্রান্তভাবে সে বোস সাহেবের দিকে চেয়ে থাকে।
বোস সাহেব বলে, বসুন।
দীপনাথ পুতুলের মতো বসে।
বোস সাহেব তার কাচের গেলাস থেকে খানিকটা জল খেয়ে একটা খাস ছেড়ে বলে, আমি জানি, গতকাল পর্যন্তও আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করতেন না। ভাবতেন আই অ্যাম জাস্ট টেকিং ইউ টু এ ট্র্যাপ।
দীপনাথ কিছু বলতে যায়, বোস সাহেব আবার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, অ্যান্ড আই ডিজার্ভড দ্যাট। আমি আপনার সঙ্গে কথার খেলাও কিছু কম খেলিনি।
দীপনাথ চুপ করে থাকে। হাতের চিঠিটার দিকে আর-একবার তাকায়, ভাজ করে পকেটে রাখার কথা মনে হয় না। কেবল চেয়ে থাকে। তারপর বলে, বাংগালোের কি তা হলে ক্যানসেলড?
