ভাষার অভাবে অচলার তাই চোখে জল এল। মুখটা ফিরিয়ে ধরা গলায় বলল, গরম জল হয়ে গেছে। এখন স্পঞ্জ করে দেব। তৈরি থাকুন।
আমি তোমার কাছে স্পঞ্জ করব না। বিলু আসুক।
নার্স-ডাক্তারদের কাছে লজ্জা করতে নেই।
না, না।–বলে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে প্রীতম। সে পারবে না। ভারী লজ্জা।
আচ্ছা, তা হলে বউদিই আসুক।
অচলা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে প্রীতম। মেয়েটা কি দুঃখ পেল? পৃথিবীর কাউকেই তার এতটুকু দুঃখ দিতে ইচ্ছে হয় না।
কাল রাতে খুব বৃষ্টি গেছে। আজ এত বেলাতেও মেঘলার আঁধার ছেয়ে আছে চারদিকে। এরকম দিনে কিছু ভাল লাগে না। মনটা বড় সঁাৎ স্যাৎ করে। বিলু কেন আসছে না এখনও?
স্পঞ্জ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল প্রীতম। কিছু যায় আসে না, অচলাই স্পঞ্জ করুক। অচলাকে ডাকতে যাচ্ছিল প্রীতম, হঠাৎ ভীষণ চমকে উঠল।
তার শোওয়ার ঘরের দরজায় পাঠানের মতো বিশাল চেহারাব দাড়িওয়ালা একটা লোক দাঁড়িয়ে, তার কাধে মস্ত এয়ারব্যাগ। চোখে হালকা রঙিন কাচের বোদ-চশমা।
অবাক হয়ে চেয়ে ছিল প্রীতম। অস্ফুট গলায় জিজ্ঞেস করল, কে?
ব্যাগটা মেঝেয় নামিয়ে রেখে শতম এগিয়ে এসে বিছানার ধারে বসে।
চিঠি পাওনি? আসব বলে চিঠি পোস্ট করেছি পরশু।
প্রীতম ওঠে। বুক কাঁপছে, অস্তিত্ব কাপছে।
কোন গাড়িতে এলি?
দার্জিলিং মেল, আর কোন গাড়ি!
এত দেরি যে!
চোরাই চাল নিয়ে হুজ্জতি হল ডানকুনিতে। সেখানে ঠায় আড়াই ঘণ্টা লেট। বউদি, লাবু সব কোথায়?
বেরিয়েছে একটু। আসবে এক্ষুনি। বোস।
বিন্দু আছে?
আছে।
দাঁড়াও, ওকে একটু চা করতে বলে আসি।
উঠতে হবে না। এখান থেকেই শুনতে পাবে। অচলা! অচলা!
অচলা কুণ্ঠিত পায়ে আসে। মুখে হাসি নেই।
একগাল হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে প্রীতম বলে, এই আমার মেজো ভাই। এইমাত্র শিলিগুড়ি থেকে এল। একটু চা করতে পারবে?
মাথা নেড়ে অচলা আবার ধীরে চলে গেল। সেদিকে একটু চেয়ে থাকে প্রীতম! মেয়েটাকে সুযোগ মতো একটু মন-ভোলানো কথা বলতে হবে। বেচারা দুঃখ পেয়েছে।
শতম তার গায়ের টি-শার্টটা খুলে ফেলল। গলায় কালো সুতলিতে বাঁধা ধুকধুকি। হাতে পাঞ্জাবি বালা। গালে ঘেঁষ দাড়ি, মস্ত গোঁফ। একদম চেনা যায় না। তার ওপর সম্প্রতি চেহারাটাও ভাল হয়েছে। এই বড়সড় স্বাস্থ্যবান যুবকটি তার ভাই এ কথা ভাবতেই ভাল লাগে।
পরশু চিঠি ড্রপ করেছিস বললি?
শতম বলে, হ্যাঁ। পাওনি তো?
পাওয়ার কথা নয়। দু’দিন তো মিনিমাম লাগে। বারো-তেরো বছর আগে মা সকালে চিঠি পোস্ট করলে আমি বিকেলে এখানে পেয়ে গেছি কতবার।
আসাটা হঠাৎ ঠিক হল। তাই আগে খবর দেওয়া যায়নি।
তাতে কী? খবর না দিলেও তো কোনও অসুবিধে নেই।
না, তবু ভাবলাম তোমরা যদি কোথাও চেঞ্জে-টেঞ্জে যাও।
কোথায় আর যাচ্ছি।
যা গরম তোমাদের কলকাতায়!
সকাল থেকে কিছু খেয়েছিস?
খেয়েছি।
বাড়ির সবাই ভাল? মা?
ওই এক রকম। মা তোমার জন্য কী সব যেন পাঠিয়েছে।–বলে শতম উঠতে যাচ্ছিল।
প্রীতম বলল, থাক না। বোস। পরে বের করিস।
তুমি কেমন আছ?
ওই এক রকম। তুই অনেকদিন বাদে এলি।
ঠেকায় না পড়লে কে কলকাতায় আসতে চায় বলো? এ তো নরক। দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে শহরটা। বউদি কোথায় গেছে বললে?
একটা ফাংশনে।
ওই মেয়েটা কে?
ও অচলা। লাবুর দেখাশোনা করে।
বউদি চাকরি করছে, না?
হুঁ। না করে উপায় ছিল না।
আমি মেয়েদের চাকরি করা সাপোর্ট করি। তবে বাড়িতে সবাই হয়তো পছন্দ করে না।
স্নান করবি না?–প্রসঙ্গটা পাশ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করে প্রীতম।
বাথরুমে জল আছে তো? তোমাদের কলকাতায় খুব জলের ক্রাইসিস বলে শুনি।
প্রীতম বলে, জল আছে।
অচলা ধীর পায়ে ট্রেতে চা নিয়ে এল। সঙ্গে কিছু নোনতা বিস্কুট। এক গেলাস জলও। বুদ্ধি আছে। কারণ শতম প্রথমেই জলের গেলাস নিয়ে এক চুমুকে শুষে নিল।
অচলা বলল, আর-এক গেলাস দেব?
না। কলকাতার জল ভীষণ নোনতা। খাওয়াই যায় না। খুব তেষ্টা ছিল বলে এক গেলাস খেলাম।
অচলা মৃদু হাসল।
বিস্কুট লাগবে না। চায়ের সঙ্গে আমি কিছু খাই না। বলে কাপটা ট্রে থেকে তুলে নেয় শতম।
আপনি ডিম খাবেন তো? আজ ডিম হয়েছে।
ডিম? না, আমি ওসব খাই না। মাছ মাংস ছেড়ে দিয়েছি। শুধু ডাল হলেই চলবে।
ওমা! সে কী?
শতম একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ডিম ছাড়া কিছু হয়নি?
তা হয়েছে। কিন্তু মাছ মাংস খান না কেন?
ওঃ, সে একটা ব্যাপার আছে।–বলে লাজুক হাসি হাসে শতম।
অচলা বলে, তা হলে ছানাব ডালনা করে দিতে বলি। ছানা আছে।
শতম জবাব দিল না। খাওয়া নিয়ে তার বেশি ভাবনা আসে না।
প্রীতম মাছ মাংস নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভরসা পেল না। শতম হয়তো জবাব দিতে চাইছে। ভাই বড় হয়েছে, এখন তাকে আর জেরা করা যায় না তো। যদি নিজে থেকে কারণটা কখনও বলে তো বলবে।
প্রীতম বলে, তুই আজকাল খুব মোটরসাইকেল দাবড়াস শুনি।
এখানে সেখানে যেতে হয়।
সাবধানে চালাস তো!
হ্যাঁ হ্যাঁ, ও নিয়ে ভেবো না।
মা বারণ করেনি মোটরসাইকেল কিনতে?
ও বাবা! সে অনেক ঝামেলা গেছে। এখন তেমন কিছু বলে না।
আমার নিজের একটা মোটরসাইকেল বা স্কুটারের খুব শখ ছিল।
না কিনে ভাল করেছ। কলকাতার রাস্তায় ওসব চালানো ভয়ংকর রিস্কি।
তা অবশ্য ঠিক।
শোনো দাদা, বউদি আসার আগেই তোমাকে একটা ইমপর্ট্যান্ট কথা বলে নিই। আমি এবার কেন এসেছি জানো?
কেন?
তোমাকে নিয়ে যেতে।
আমাকে নিয়ে যাবি?–প্রীতম কেমন দিশেহারা বোধ করে। কী বলছে শতম তা যেন ঠিক বুঝতে পারে না। আবার বলে, নিয়ে যাবি?
