সারা দিনটা এই অচলাই আজকাল তাকে সঙ্গ দেয়। স্নেহ-মমতার একটা দুর্লভ ভাণ্ডার আছে। ওর। সহজেই চোখ ছলছলিয়ে ওঠে, অল্প কারণেই উদ্বিগ্ন হয়। লাবু এখন একটু বড় হযেছে। ঠিক বেবিসিটারের দরকার আর ওর নেই। অচলা তাই প্রীতমকে দেখাশোনা করে নিজের গরজেই। কেউ ওকে বলেনি। একজাতের মেয়ে আছে, যারা প্রেমিকা বা স্ত্রী হিসেবে তেমন কাজের নয়। কিন্তু ভারী ভাল মা হতে পারে। অচলা ঠিক সেই জাতের।
ছেলেবেলায় মা ছাড়া প্রীতম আর-কোনও মেয়েকে চিনতই না। বড় হয়ে চিনল বিলুকে। সারা জীবনে নিজের মা, বোন, বউ আর মেয়েএই ছিল প্রীতমের ঘনিষ্ঠ মহিলা-জগৎ। এর বাইরে যারা তাদের কাছে প্রীতমের ভারী লজ্জা, সংকোচ, বুক দুরুদুরু ভয়। এখন সেই ছোট্ট চৌহদ্দিতে কবে অনায়াসে ঢুকে গেছে অচলাও।
প্রীতম বলল, তোমার দোষ হবে না। ভয় নেই।
অচলা মৃদু হেসে বলে, আচ্ছা দেখব দোষ হয় কি না। আজকাল তো বোজ আপনার জন্য আমি বউদির বকুনি খাই।
কেন? আমার জন্য তুমি বকুনি খাবে কেন? বিলুর তো ভারী অন্যায়।
ঠিকই করেন। সেদিন আপনি বাথরুমের ঠান্ডা জলে চান করলেন, পরশুর আগের দিন বিন্দুকে দিয়ে রাস্তার আলুর চপ আনিয়ে খেলেন, গত সপ্তাহে পাপোশে পা আটকে পড়ে গিয়েছিলেন। আপনার ওই সব দুষ্টুমির জন্য বকুনি তো আমারই খাওয়ার কথা।
প্রীতম প্রশ্ন করল না, কিন্তু চোখে প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে বইল।
অচলা এবার স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে বলল, বউদি কী বলেছেন জানেন? বলেছেন, এ বাড়িতে বাচ্চা কিন্তু একটি নয়, দুটি। এ বাড়ির কর্তার চার্জও তোমার। এমনকী দুটো বাচ্চা দেখাশোনার জন্য আমার মাইনেও বউদি পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন।
তাই বলো!–প্রীতম মাথা নাড়ল।
এবার বুঝেছেন, কেন আপনার কিছু হলে আমার জ্বালা!
বুঝেছি। কত বেশি পাও বললে?
পঞ্চাশ টাকা।
মাত্র? আমি তোমাকে কিছু ঘুষ দিতে রাজি অচলা।
আচলা হেসে ফেলে বলে, আমার আর বেশি চাই না। বলুন, কী করতে হবে?
কিছু নয়। শুধু সব কথা তোমার বউদিকে বোলো না।
বলব না। কিন্তু সব কি লুকোতে পারবেন? বিন্দু আছে, লাবু আছে। ওরা ঠিক বলে দেবে। আর আমিও তো আপনাকে যা-খুশি-তাই করতে দিতে পারি না।
আমি কি খুব যা-খুশি-তাই করি?
ওই যে বইপত্র নিয়ে বসেছেন। এখন কি মাথা খাটানো ভাল? আমি ভয়ে কিছু বলি না, পাছে আপনি রেগে যান। আজ বলছি, রুগিদের বইপত্র নিয়ে পড়ে থাকা উচিত নয়।
প্রীতম খানিকক্ষণ শূন্যে চেয়ে থেকে বলল, তোমার বউদি তা হলে আমার ভার তোমার হাতেই ছেড়ে দিল?
তা কেন? বউদিও দেখাশোনা করবেন, আমিও করব। আমি নার্সিং জানি তো, তাই রুগির দেখাশোনা অনেকের চেয়ে ভাল পারি।
প্রীতম একটু গম্ভীর হয়ে বলল, খুব ভাল। কিন্তু বিলু ব্যাপারটা আমাকে জানাল না কেন?
ওমা! আপনি রাগ করলেন নাকি?
প্রীতমের আজকাল বুকভরা অভিমান হয়েছে। বেশিদিন রোগে ভুগলে বুঝি এ রকমই হয়। পাছে অভিমানের ব্যাপার অচলা ধরে ফেলে সেই ভয়ে একটু ক্লিষ্ট হাসি হাসল সে। বলল, না। রাগের কিছু নেই।
সত্যিই নেই। বউদি আপনাকে কত ভালবাসেন। আমি অনেক পরিবারে কাজ করেছি। আপনাদের মতো ভাল সম্পর্ক খুব বেশি পরিবারে দেখিনি।
প্রীতম একটা ছোট শ্বাস ফেলে। বলে, আমি কারও কাছে ভার হতে চাইনি কখনও।
ওই দেখুন! আপনি ঠিক রাগ করছেন।
প্রীতম নিজেকে সামলে নেয়। ঠাট্টার গলায় বলে, দাঁড়াও, দাঁড়াও। আমি একটু ভেবে দেখি, আমার জন্য তোমাদের কী কী করতে হয়। তারপর চেষ্টা করে দেখব, সেগুলো নিজেই পারি কি না।
অচলা উদ্বেগের গলায় বলে, নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু পুরুষমানুষ বলে কথা, মেয়েমানুষ থাকতে তারা কেন সব কাজ করতে যাবে? আমি বাড়ি ফিরলে এখনও আমার কর্তা এক গেলাস জল নিজে গড়িয়ে খান না। কেন খাবেন?
প্রীতম হেসে ফেলে। বলে, সবাই কি তোমার কর্তার মতো? পৃথিবীতে আমার মতো হতভাগাও কিছু আছে।
আপনি কেন এরকম বলুন তো! কী ব্যথা থেকে কোন কথায় চলে গেলেন।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, বিলুর জন্য নয়, তোমার কথা ভেবেই আমার মনটা খারাপ লেগেছিল, অচলা। আমি ভেবেছিলাম, আমার ওপর বুঝি তোমার মন একটু নরম হয়েছে, তাই যেচে সেধে আমার সেবা করা আজকাল। কিন্তু তা তো নয়, তুমি তো আসলে চাকরি করছ। তাই না?
এ কথায় অচলা থেমে গেল। কী বলবে? তার মানসিকতা একটা বিশেষ স্তর পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার ওপরে যাওয়া তো সম্ভব নয়। পৃথিবীর খানাখন্দ, অন্ধকার সে কিছু কম চেনে না। মানুষের ভিতরকার ইতর জন্তুর মুখোমুখিও সে কয়েকবার হয়েছে। মাত্র বছরখানেক আগে এক অসুস্থ, দারুণ সুন্দরী মহিলার নার্সিং করছিল সে। স্বামী মস্ত চাকরি করে। দ্বিতীয় রাত্রিতেই সেই সুপুরুষ সবল লোকটি তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল শোওয়ার ঘরে। এসব নিয়ে হইচই করা বোকামি জেনেই সে কিছু করেনি। আগেব অভিজ্ঞতাও কিছু আছে। দিন-রাতের নার্সিং বা বেবি-সিটিং করতে গেলে চোখের সামনে তরতাজা যুবতী মেয়েকে পেয়ে লঘু-প্রেমের ইচ্ছে কত পুরুষের জেগে ওঠে। কিন্তু প্রীতমকে সে চোখে দেখার কিছু নেই। এই এক পুরুষ যে অন্যরকম। সম্পূর্ণ অন্যরকম। এ মানুষ প্রেমে পড়ে না, কিন্তু মা চায়। এর দৃষ্টিতে কখনও পাপের ছোয়া দেখেনি। অচলা। এ যেন তার ছেলেরই এক ভাই। টাকা পায় বটে, কিন্তু টাকার জন্য তো এ মানুষটার জন্য। তার এত দরদ নয়। কিন্তু সে কথা বোঝানোর মতো ভাষা জানা নেই অচলার।
