একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে দীপ। পিঙ্গল আকাশে হঠাৎ রুপোলি প্লেনটা দেখা যায়। লাউডস্পিকারে শেষবারের মতো সিকিউরিটি চেক-এর জন্য যাত্রীদের ডাকা হচ্ছে। দীপ লাউঞ্জে এসে দেখে তার কিটব্যাগটা অনাদরে পড়ে আছে চেয়ারের পাশে। মিসেস বা মিস্টার বোসকে দেখা যায় না। সে একবার রেস্টুরেন্টে উঁকি দিল। নেই। সিকিউরিটির বেড়া ডিঙিয়ে ওরা সামনের লাউঞ্জে চলে গেছে নিশ্চয়ই। নিশ্চিত হয়ে সে সিকিউরিটির কাঠের খাঁচায় গিয়ে ঢোকে।
প্লেনে উঠে বোস আর তার বউ একটু ইতস্তত করছিল। তারপর যা হওয়ার তাই হল। বোস গিয়ে আলাদা সিটে বসল। দীপকে বসতে হল মিসেসের পাশে। স্বভাবতই মিসেস বোস জানালা দখল করেছেন।
যাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। প্লেনের অর্ধেক সিটও ভরতি হয়নি। প্লেনের ভিতরে মৃদু সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে। লাউডস্পিকারে একঘেয়ে ঘোষণার শেষে নিয়মমাফিক মিউজিক বাজতে থাকে এবং খাবারের ট্রে হাতে আসে হোস্টেস। ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় প্লেন নিয়মমাফিক নামবে দমদমে। এই একঘেয়েমির হাত থেকে কচি মুক্তি পায় মানুষ। এই যে কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে আকাশের হৃদয়ে ঢুকে পড়া তা মানুষ টেরই পায় না এইসব আধুনিক বিমানে। মিউজিক, এয়ার হোসটেস, খাবার, চা বা কফি, নরম কুশন ইত্যাদি দিয়ে কেবলই অন্যমনস্ক করে রাখা হয় যাত্রীদের। এক-আধবার নিয়ম ভেঙে প্লেনে আগুন লাগে, ইঞ্জিন বিগড়োয়, আর তখন মৃত্যুভয়ে হিম হয়ে যায় মানুষ। কিংবা কখনও-সখনও বেপরোয়া কোনও হাইজ্যাকার বন্দুক বার করে প্লেনকে নিয়ে যায় কোনও অচেনা দুর-দুরান্তে। সেসব বিরল ঘটনা। নইলে দুনিয়াভর অধিকাংশ বিমানই নিয়ম মাফিক ওড়ে এবং নামে। নিয়ম ভেঙে আজ অন্তত একজন হাইজ্যাকার উঠে দাঁড়াক বন্দুক হাতে। বলুক, এ প্লেনকে সোজা নিয়ে চলো কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে।
এক কাপ কফি ছাড়া দীপ আর কিছুই খেল না। কফি ভাল করে শেষ হওয়ার আগেই পায়ের নীচে চলে এল কলকাতা। দিগন্তে আর কোনও পাহাড়ের চিহ্নও রইল না।
এয়ারপোর্টে বোসের বশংবদ ড্রাইভার সহ গাড়ি অপেক্ষা করছিল। কিন্তু গাড়িতেও ওরা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ঝগড়াকে জানান দিতে আলাদা বসে। সামনে বোস, পিছনে তার বউ আর দীপ। দীপের মাথা থেকে পাহাড় খসে গেছে, এমনকী বোসের বউয়ের গা থেকে আসা সুবাসটিও সে টের পাচ্ছে না। ট্রলি থেকে লাগেজ বুটে মাল তোলার সময় সে লক্ষ করেছে মস্ত ফাইবার গ্লাসের বিদেশি সুটকেসটার একটা কবজা ভাঙা। আজকাল প্লেনে মাল নেওয়াটাই আহাম্মকি। এয়ারপোর্টের পোর্টাররা দুমদাম করে সেগুলো আছড়ে ফেলে বা তোলে। কোনও মায়াদয়া দায়িত্ববোধ নেই। কবজা ভাঙার জন্য সে দায়ী নয় বটে কিন্তু সুটকেসটা সারানোর দায়িত্ব তার ওপর পড়তে পারে ভেবে একটু তটস্থ বোধ করছিল দীপ। এসব ছোটখাটো জিনিস লক্ষ করাই আসলে তার কাজ। দীপ আজকাল ধরেই নিয়েছে, সে হল বোসের মোসাহেব, হেড চাকর, বাজার সরকার। এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংযোগ-রক্ষাকারী দালাল। তবু নিজের ওপর তেমন কোনও গভীর ঘেন্না হয় দীপের। কারণ সে জানে, একদিন এইসব তুচ্ছতা থেকে সে মুক্তি পাবে। যেদিন পাহাড় ডাকবে।
বোস গণেশ অ্যাভেনিউ অফিসের সামনে নেমে গেল।
দীপ একবার ভাবল, সামনের সিটে গিয়ে বসবে। কিন্তু সেটা কেমন দেখাবে তা বুঝতে না পেরে তার নড়তে চড়তে সাহস হচ্ছিল না। বোস নেমে যেতেই মিসেস বোস চাপা স্বরে বলেন, হামবাগ। কাজ না আরও কিছু! জাস্ট অ্যাভয়েড করার জন্য অফিসের নাম করে কেটে পড়ল।
দীপ কথা বলে না। বলার নেই। মাঝে মাঝে তাকে কেবল শুনে যেতে হয়। কলকাতায় পা দিয়েই বোসের বউ একটা মস্ত রোদ-চশমা চোখে দিয়েছেন। বাইরের দিকে চেয়ে থেকেই দীপকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনার কি অন্য কোনও কাজ জোটে না, দীপনাথবাবু? ওই গরিলাটার সঙ্গে লেগে থেকে নিজের ফিউচারটা নষ্ট করছেন কেন? হি উইল ড়ু নাথিং ফর ইউ।
দীপ চালাক হয়েছে। সে জানে এসব দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে মিস্টার বোস সম্পর্কে একটিও নিন্দের কথা তার বলা ঠিক হবে না। একদিন বোস আর তার বউ আমে-দুধে মিশে যাবে, আর সেদিন এই নিন্দের কথা বাঁশ হয়ে ফিরে আসবে। তাই সে খুব উদাসভাবে বলে, বোস সাহেবের ওপর আপনি খুব চটেছেন। রেগে গিয়ে কাউকে ঠিক বিচার করা চলে না।
একটু অধৈর্যের গলায় মিসেস বলেন, প্লিজ! আমার লাইফটা নষ্ট হয়েছে, আপনারটাও নষ্ট করবেন না।
দীপ কঁচুমাচু হয়ে বলে, আসলে দেশে চাকরির খুব একটা স্কোপও তো নেই দেখছেন।
ওসব বাজে কথা। ভাববেন না যে, আমি একজন হামবাগ মানিসেন্ট্রিক একজিকিউটিভের স্ত্রী বলে কোনও খবর রাখি না! ইন ফ্যাক্ট আমি নিতান্ত মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। সোসাইটিতে কী হচ্ছে।
হচ্ছে সব খবর রাখি। মাত্র কয়েক বছর আগেও আমি লেফটিস্ট ছিলাম, অ্যাকটিভ পলিটিকস করতাম।
দীপ একটু অবাক হয়ে নতুন করে মিসেস বোসের দিকে তাকায় এবং কথাটা মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
মিসেস বোসের রোদচশমাটার জন্য তেমন কিছু বুঝতে পারছিল না দীপ। খুব কৌতুকের সঙ্গে সে প্রশ্ন করে, এসব কথা কি মিস্টার বোস জানেন?
ঠোঁট উলটে মেয়েটা বলে, আমি ওকে কিছু বলিনি। জানলে জানে। আমি পরোয়া করি না। কিন্তু আমার প্রশ্ন, আপনি এভাবে ওর সঙ্গে লেগে আছেন কেন? আফটার অল আপনার তো কাজের কিছু এক্সপেরিয়েন্স আছে বলে শুনেছি।
