ছুটির দিনে বিলু সারাদিনই ঘরে থাকে। চাকরি করে বলে আজকাল সপ্তাহের অনেক কাজ জমে থাকে ছুটির দিনটির জন্য। কাচাকুচি, ভোলা ঝাড়া, একটু-আধটু রান্না। রবীন্দ্রসদনে বাচ্চাদের একটা ফাংশনে যাওয়ার জন্য অনেক দিনের বায়না ছিল লাবুর। আজ মায়ে-মেয়েতে সক্কালবেলা রবীন্দ্রসদনে গেল। দুপুরে ফিরবে। বিলুর খুব ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু লাবুর মুখ চেয়ে যেতে হল। একা ভাল লাগছিল না প্রীতমের। একা কাজ ছাড়া কখনওই ভাল লাগে না। আজ তাই বালিশে হেলান দিয়ে সে পারা না-পারার কথা ভাবতে থাকে।
সুস্থ শরীরের একজন মানুষ কতটা পারে তার কোনও হিসেব হয় না। মানুষের পারার কোনও শেষই নেই। কেবলমাত্র ইচ্ছের জোরেই না মানুষ দক্ষিণ মেরুতে গেছে, সিঁড়িহীন দেয়ালের মতো খাড়া আকাশের মতো উঁচু পাহাড়ে উঠেছে, খড়ের নৌকোয় পাড়ি দিয়েছে সমুদ্র। ক’মাস আগেই তো খবরের কাগজে পড়েছে, আমেরিকার এক ছোকরা ব্যথাহরা ট্যাবলেট খেয়ে তারপর নিজের শরীরে ছুরি চালিয়ে এক মস্ত অপারেশন প্রায় সাঙ্গ করে এনেছিল। মানুষ কি আসলে মানুষ? অনেক মানুষ আছে যারা আসলে দৈত্য, দানব, রাক্ষস বা দেবতা।
ইচ্ছাশক্তির ওপর বিলু বা অরুণের আস্থা নেই। ওদের কখনও ঠিক এরকম প্রয়োজন না পড়লে, এরকম বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার সমস্যা দেখা না দিলে, নিরন্তর রোগজীবাণুর সংক্রমণ টের না পেলে ইচ্ছাশক্তির ওপর ওদের আস্থা আসবেও না।
কেবল ইচ্ছের জোরে প্রীতম পারবে তো? তার শরীর শুকিয়েছে বটে, কিন্তু রোগ এখনও তার মগজকে স্পর্শ করেনি। হয়তো দীর্ঘ দিন করবেও না এখনও। অডিটের সব আইনকানুন তার মনে আছে।
অচলা!–হঠাৎই ডাকল প্রীতম।
রান্নাঘরে বিন্দুর সঙ্গে বসে কিছু খাচ্ছিল বোধহয়। ভরাট মুখে সাড়া দিল, যাই।
মেয়েটাকে খুব ভাল লাগে প্রীতমের। আগে সহ্য করতে পারত না। মনে হত, বাইরের একজন মানুষ এসে অন্দরমহলে অনধিকার প্রবেশ করেছে। অন্যায় কৌতূহলে চেয়ে চেয়ে দেখছে তার শুকনো শরীর। অস্বস্তি হত। আজকাল হয় না। অচলাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা আর ভাবেও না প্রীতম।
কিছু বলছেন?
চাকাওলা চেয়ারটা কই? দেখছি না তো!
ও ঘরে বাধহয় লাবু নিয়ে গাড়ি-গাড়ি খেলছিল কাল। এনে দিচ্ছি।
অচলা হুইলচেয়ারটা সামনের ঘর থেকে টেনে আনলে প্রীতম বিরসমুখে বলল, থাক। শোওয়ার ঘরের রক-এ অ্যাকাউন্টেন্সির কয়েকটা বই আছে, সঙ্গে খাতা। এনে দাও তো। একটা ডটপেন বা কলম দিয়ো, আর পেনসিল।
অচলা এনে দিল। বলল, একটু চা করে দিই?
দাও।
বই খুলে প্রীতম একটার পর একটা এন্ট্রি দেখে যায়। হরেক রকমের প্রবলেম জল করে দিতে থাকে। এখনও মগজ শতকরা একশো ভাগ ক্রিয়াশীল।
অচলা!–আবার ডাকে প্রীতম।
চা নিয়ে যাচ্ছি। অচলা জবাব দেয় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আসে।
বলুন।
শোনো। আজ থেকে এক সপ্তাহ কেটে গেলে তুমি একটু সজাগ থাকবে। আমার কাছে কেউ কেউ আসতে পারে। তারা বিভিন্ন কোম্পানির লোক। তোমার বউদি যেন ব্যাপারটা টের না পায়।
কোম্পানির লোক কেন আসবে?
তারা কাজ নিয়ে আসবে। কাজ করাতে আসবে।
আপনি য়োগা শরীরে কাজ করবেন?
রোগা শরীর বলেই কাজ বন্ধ করে দেওয়াটা কি উচিত হবে? শোনোনি, অনেক সময় কাজ করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়?
আপনাদের তো অভাব নেই, তবে কেন কাজ করবেন?
টাকার জন্যে নয়। বেঁচে থাকার জন্য।
অসুখ হলে শুয়ে থাকতে হয়। ডাক্তাররা বলেন, অ্যাবসোলিউট রেস্ট।
এতকাল তো আমি ডাক্তারদের অবাধ্য হইনি। কিন্তু ডাক্তারদের ওষুধে আমার কাজও হয়নি। তাঁদের কথা শুনে আর কী হবে?
কাজ হয়নি কে বলল? আপনাকে আমি প্রথম এসে যেরকম দেখেছিলাম এখন তার চেয়ে ভাল দেখি।
প্রীতম হাসল। বলল, সত্যিই ভাল দেখোনা কি রুগিকে ওরকম বলতে হয় বলে বলছ?
ভাল দেখছি। চা খান, ঠান্ডা হয়ে যাবে।
প্রীতম তার দু’হাতে প্লেটসুদ্ধ চায়ের কাপ তোলে। কম করেও দু-তিন কেজি ভারী মনে হয় কাপটাকে। একটু একটু কঁপে, চা ছলকায়। তবু পারে প্রীতম আজকাল। চা খেতে ডাক্তার তেমন কিছু বারণ করেনি, কিন্তু সম্প্রতি বিলু তার চা বন্ধ করেছে। বিলু না থাকলে লুকিয়ে অচলা করে দেয়। চা আজকাল বড় প্রিয় হয়েছে প্রীতমের।
চায়ে চুমুক দিয়ে প্রীতম বলে, আমি ভাল আছি। লোকে বিশ্বাস করুক বা না করুক, আমি কিন্তু ভাল আছি।
ভাল হয়ে যাবেন। কিন্তু তা বলে এখনই কাজ-টাজ করতে যাবেন না। কমপ্লিট রেস্ট নিন।
কমপ্লিট রেস্ট বলে কিছু নেই, জানো না? মন যদি অস্থির থাকে, তবে কী করে বিশ্রাম হবে? কারও যদি রাতের বেলা বিছানায় শুয়েও ঘুম না আসে তবে কেবল শুয়ে থাকাটাই তো ঘুমের অলটারনেটিভ হতে পারে না। বরং শুয়ে থাকলে আরও অশান্তি। তার চেয়ে বই-টই পড়ে সময় কাটিয়ে দেওয়া ভাল।
বউদি যে আপনাকে ভাবনা-চিন্তা করতে বারণ করেছেন। কাজ করতে গেলেই তো মাথায় চাপ পড়বে!
কাজ না করলেও পড়ে। সারাদিন কত চিন্তা করি।
অচলা সামান্য হেসে বলে, আপনি নাকি ভীষণ মনের জোর খাঁটিয়ে অসুখ সারানোর চেষ্টা করেন?
সেটা কি দোষের?
জানি না। তবে বউদি বলেছিলেন ওতেও মাথার ওপর চাপ পড়ে।
উদাস গলায় প্রীতম বলে, তোমার বউদি আমার সবটুকু তো জানে না। সে কী করে বুঝবে আমি কীসে ভাল থাকি?
প্রীতমের এই হঠাৎ উদাসীনতা লক্ষ কবে অচলা তাড়াতাড়ি বলল, আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। কাজ করলে যদি ভাল থাকেন তবে না হয় আমি বউদিকে কিছু বলব না। কিন্তু পরে যেন দোষ না হয়।
