দীপনাথ অস্বস্তি বোধ করতেই থাকে। স্বস্তি বোধহয় রাজনীতির ব্যাপারে খুব সচেতন। এলেবেলে লোকের সঙ্গে ও নিয়ে কথা বলতে চায় না। দীপনাথ তাই নিরুত্তাপ প্রশ্ন করল, বাইরে থেকে এলেন?
ওয়াই এম সি এ-তে টেবিল টেনিস খেলতে গিয়েছিলাম। খেয়েই আবার বেরিয়ে যাব।
কোথায়?
আমি একটা নাইট স্কুল করেছি। বেলেঘাটায়।
খুব ভাল।
দীপনাথ আলগা গলায় বলে। কিছুতেই এই ছেলেটিকে তার বীথির মতো নষ্ট মহিলার গর্ভজাত বলে মনে হয় না। সে জিজ্ঞেস করে, আর কী করেন?
স্বস্তি মাথা নেড়ে বলে, সংগঠন ছাড়া খুব বেশি কিছু করা একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই একটা অর্গানাইজেশন করে তুলছি।
কী করতে চান?
অনেক কিছু। টু মেক পিপল কনশাস৷ সোশ্যালি অ্যান্ড পলিটিক্যালি।
জনসাধারণকে নিয়ে ভাবা বা দেশের জন্য কিছু করার কথা দীপনাথ বহুকাল হল ভুলে গেছে। এই গ্রীষ্মের রাতে এখন সে এক কামার্ত শুকনো পুরুষ, প্রায় বিগত-যৌবনা এক সুন্দরীর বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করছে। তার দেশ নেই, দেশবাসী নেই, দায়দায়িত্ব নেই। নিজের জন্য কি একটু লজ্জা হচ্ছিল দীপনাথের?
লজ্জা থেকে মুক্তি দিতেই বুঝি স্বস্তি উঠে পড়ে বলল, আমি একটু আগেই খেয়ে নিচ্ছি। স্কুলে ওরা অপেক্ষা করবে। কিছু মনে করবেন না।
না, না। আপনি কাজে যান।
স্বস্তি চলে গেল। পাশের খাবার পরে চেয়ার টানার শব্দ হল।
চুপচাপ বসে দীপনাথ নিজের ভিতরকার অস্বস্তি ভোগ করতে থাকে। এই যে এরা, এই স্বস্তি এবং তার না, এরা কারা, সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ, ভাল না মন্দ তা কিছুই বুঝতে পারে না সে। ভারী রহস্যময় এরা। হয়তো অকপট, হয়তো সংস্কারমুক্ত, তবু মন থেকে এদের স্বীকার করে নিতে পারছে না দীপনাথ।
নিজের মায়ের ঘৃণ্য জীবনে কি অভ্যস্ত হয়ে গেছে স্বস্তি? তার প্রতিবাদ নেই? বিপ্লব নেই?
খুব অল্প সময়ে খাওয়া শেষ করে খালি গায়ের ওপর একটা ভঁজহীন হাওয়াই শার্ট চড়াতে চড়াতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্বস্তি যখন তার দিকে চেয়ে হেসে গেল তখনও দীপনাথ তার মুখ দেখে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু হঠাৎ স্বপ্লোঞ্ছিতের মতো উঠে সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় স্বস্তিকে ধরল, শুনুন, আমি আপনার নাইট স্কুলটা একটু দেখব।
স্বস্তি অবাক হলেও কোনও আবেগ প্রকাশ করল না। শান্ত গলায় বলল, মা আজ আপনাদের নেমন্তন্ন করেছে শুনেছি। ততক্ষণ ওয়েট করা তো সম্ভব নয়।
আমার নেমন্তন্নের চেয়ে নাইট স্কুলটা দেখাই বেশি দরকার।
পরে দেখবেন। কিছু তেমন দেখার মতো ব্যাপার নয়। মা অপেক্ষা করছে। আপনি যান, আমিও চলি।
দীপনাথ নিজেকে সামলাতে না পেরে হঠাৎ বলল, আপনার মা নন, আপনাকেই আমার বেশি দরকার। আমি আপনার কাছে কিছু শিখতে চাই।
স্বস্তি হয়তো সন্দেহ করল, দীপনাথ মদ-টদ খেয়েছে। তাই সামান্য হেসে বলল, শেখার কথা বলছেন কেন? ওসব ইমোশনের কথা।
হতে পারে। কিন্তু এখন আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই।
স্বস্তি একটু স্থির চোখে তার দিকে চেয়ে খুবই আবেগহীন ভদ্র গলায় বলল, মায়ের বন্ধুদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালই, কিন্তু আমি তাদের কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হই না, অন প্রিনসিপ্ল। মাফ করবেন।
স্বস্তি চলে যাওয়ার পরও তার গম্ভীর, গভীর, বেতারঘোষকের মতো সুন্দর কণ্ঠস্বরটি অনেকক্ষণ কানে লেগে রইল দীপনাথের।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে একবার ভাবল, এখান থেকেই মেসে ফিরে যাবে।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে দুর্গের ফটক ভেঙে যে ঘোড়সওয়ার ঢুকেছে সে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে নীতিবোধ, আব্রু এবং প্রতিরোধ।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছিল দীপনাথ। মাঝপথ পর্যন্ত উঠেই থামল। বাইরের ঘরে নয়, কিন্তু ভিতরের ঘরে কোথাও তীব্র স্বরে বীথি কিছু বলছে। বলছে বোধহয় সুখেনকেই। সুখেনের গলাও শোনা গেল। দু’জনের বোধহয় ঝগড়া হচ্ছে।
ঝগড়ার শব্দটা দীপনাথকে সাহায্য করল অনেক। তার নিজের ভিতরের উত্তেজনা হঠাৎ স্তিমিত হয়ে এল। অনিচ্ছে জাগল।
কাউকে কিছু না বলে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এল দীপনাথ। ধীরে সুস্থে হেঁটে গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল।
৩৪. দৈহিক দিক থেকে পঙ্গু
দৈহিক দিক থেকে পঙ্গু দক্ষ একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বাড়িতে বসে যে-কোনও রকম ট্যাক্স রিটার্ন, হিসাব তৈরি এবং অ্যাকাউন্টস সংক্রান্ত সবরকম পরামর্শ দিতে প্রস্তুত। প্রথম শ্রেণির ফার্মে চাকরির অভিজ্ঞতা আছে।
এই বিজ্ঞাপনটা একটি চেক সহ কিছুদিন আগে পাঠিয়েছিল প্রীতম। রোববারের কাগজে বিজ্ঞাপনটা বেরোল। পার্সোনাল কলমে বিজ্ঞাপনটার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে সে। কাজটা ঠিক হল কি না বুঝতে পারছে না। অরুণ বা বিলু টের পাবে না। বিজ্ঞাপনে ঠিকানা নেই, বক্স নম্বরে আছে। তবে যদি খুঁটিয়ে দেখে এবং দুইয়ে দুইয়ে চার করে তবে প্রীতমের ধরা পড়ার সম্ভাবনা যে একেবারে নেই তা নয়। অরুণের ক্ষুরধার বুদ্ধিকেই তার ভয়। অবশ্য যদি সত্যিই প্রীতম কোনও কেস হাতে নেয় তবে ওদের কাছে শেষ পর্যন্ত কিছুই গোপন থাকবে না।
কাগজটা রাখতে গিয়েও আবার দুইয়ের পাতায় বিজ্ঞাপনটা দেখে নেয় প্রীতম। ওটা চোখে পড়ার পর থেকেই তার রক্তস্রোত কিছু দ্রুত হয়েছে, শ্বাসের উষ্ণতা বেড়েছে। বহুকাল পরে উত্তেজক কিছু ঘটল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ক্লায়েন্ট সত্যিই আসে তবে সে পারবে কি না! এই পারা না-পারার প্রশ্নটিই তার কাছে সবচেয়ে বড়।
