বাদলা ওয়েদারটা ছিল। জমত।
আমার মেজাজ ভাল নেই সুখেন।
সেইজন্যই তো আরও দরকার। বীথি মেজাজ ভাল করার ওষুধ জানে।
ভিতরে ভিতরে দীপনাথের প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছিল। দুর্গের ফটক ভেঙে ঢুকে আসছে অশ্বারোহী। বাদলা দিন, অবসাদ, একঘেয়ে মেসের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়া— এসবের মধ্যে তো কিছু রহস্য নেই। তা ছাড়া একবার যখন পদস্খলন ঘটেছে তখন দু’বারে আর বেশি কী হতে পারে? খুব শিগগিরই সে বিয়ে করে ফেলবে, তখন ভাল করে দুর্গের চারদিকে পরিখা কাটবে, মজবুত ফটক লাগাবে। শুধু আজকের দিনটা… একটা দিন…
দীপনাথ বলল, এটা আপনাদের খুব অন্যায়।
দীপনাথের কণ্ঠস্বরে দুর্বলতা ধরে ফেলে সুখেন উজ্জ্বল মুখ করে বলল, আপনার বন্ধুত্ব ছাড়া আমি সত্যিই অন্য কিছুকে তেমন মূল্য দিই না। লোকে শুনলে ভাববে আমি আপনার খারাপ বন্ধু, কু-পথে নিয়ে যাচ্ছি। মাইরি, তা নয়। আমি শুধু চাই, আপনার জীবনে আরএকটু আনন্দ আসুক।
দীপনাথ একটু ধমক দিয়ে বলে, কিন্তু এই-ই শেষ বার। বীথিকে কথাটা বলে দেবেন।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই! শুধু আজকের দিনটা।
আবার টানা রিকশা ভাড়া করে সুখেন। বলে, টানা রিকশার মতো এমন বাবুয়ানির জিনিস হয় না। ভারী আয়েসের গাড়ি। নিজেকে রাজা-রাজা লাগে।
দীপনাথ টানা রিকশা দু’চোখে দেখতে পারে না, তবু আনমনে বলল, হুঁ।
কী ভাবছেন?
কিছু না।
আজকাল আপনাকে আরও বেশি অন্যমনস্ক লাগে। অফিসে ঝামেলা চলছে নাকি?
না। এমনি নানা কথা ভাবি।
আমি একটু অন্যরকম। আমার মাথায় তেমন ভাবনা-চিন্তা আসে না। মন-টন খারাপ হলে আমি ফুর্তি করতে বেরিয়ে পড়ি।
ফুর্তি করাটাই তো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয় মানুষের।
করুণ মুখ করে সুখেন বলে, আমি খুব ভোঁতা ধরনের, বুঝলেন! পলিটিকস ভাল লাগে না, খেলাধুলো বুঝি না, দেশ কাল নিয়ে খামোখা মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে না। দুনিয়াটাকে নিয়ে আমার কোনও চিন্তা নেই। এমনকী নিজের পরিবার নিয়েও ভাবি না। ইন্দো-চায়না ওয়ারের সময় এক ভদ্রলোক আমাকে যুদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করায় আমি ভারী ফাঁপরে পড়েছিলাম। আবছা আবছা কানে এসেছিল বটে চিনের সঙ্গে ইন্ডিয়ার কী একটা গণ্ডগোল হচ্ছে, কিন্তু তার ডিটেলস কিছু জানতাম না। লোকটা আমাকে দেশদ্রোহী-ট্রোহী বলে খুব গালাগাল করেছিল। মাইরি, দেশদ্রোহী কি না আমি তাও ঠিক বলতে পারব না। আমার গণ্ডিটা বড়ই ছোট।
দীপনাথ হাসছিল।
সুখেন হাসি দেখে উদ্বেগের গলায় বলল, আমি লোকটা কি খুব খারাপ? আমাকে আপনার কেমন লাগে বন্ধু?
আপনি দারুণ লোক।
ঠাট্টা করছেন!
করলেই বা, অন্যের কথায় আপনার কী আসে যায়?
অন্যের কথায় আসে যায় না ঠিকই, কিন্তু আপনার কথায় আসে যায়। আমার জীবনে বলতে গেলে আপনিই সঠিক বন্ধু হলেন। আর কারও সঙ্গ আমার কখনও এত ভাল লাগেনি। আপনার জন্য আমার অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে।
আর কিছু করতে হবে না, মাঝে মাঝে রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদী বা রজনীকান্তের গান শোনাবেন তা হলেই হবে।
ঠিক আছে। যখনই ইচ্ছে হবে একবার মুখ ফুটে বলবেন, শুনিয়ে দেব।
রিকশা গড়পারে ঢুকতেই বুকটায় খামচা-খামচি শুরু হল দীপনাথের। বীথির মুখোমুখি হওয়াটাই ভারী লজ্জার হবে। জীবনে যে মহিলার সঙ্গে তার অতখানি ঘনিষ্ঠতা হল সেদিন তাকে সে ভাল করে চেনেও না।
দোতলার ঘরের দরজায় আজ দারুণ একটা ছাপ-ছক্করওয়ালা পরদা টাঙানো। পাল্লা দুটো খোলা। ভিতর থেকে ধূপকাঠির চন্দনগন্ধ আসছে। ঘরের ভিতরে রজনীগন্ধা ছিল আজ। নীলরঙা জিনস-এর ফুলপ্যান্ট আর খালি গায়ে তোয়ালে জড়ানোে স্বস্তি সোফায় বসে কী একটা চিঠি পড়ছিল। তারা ঘরে ঢুকতেই মুখ তুলে হাসল। কী সুন্দর হাসি! কোমল দাড়িতে মুখটা ভারী নরম যিশুখ্রিস্টের মতো দেখায়। মাথা ভরতি লম্বা চুল। অকপট চাউনি। চেহারাটা রোগাটে হলেও মাংসপেশিগুলো কঠিন। শরীরে লকলক করে জোরালো একটা ভাব।
কী খবর দীপনাথবাবু? অনেকদিন বাদে এলেন।
দীপনাথ খুব অস্বস্তির সঙ্গে হাসল। স্বস্তি কি জানে না যে, দীপনাথ বীথিব প্রেমিক? নিজের মায়ের কথা না জানাটা তার পক্ষে অস্বাভাবিক। স্বস্তির মুখে চোখে খরশান বুদ্ধির দীপ্তি। এ ছেলে সব জানে। তবে কী করে সহ্য করে?
দীপনাথবাবুকে বসিয়ে রেখে সুখেন ভিতরে গেল। স্বস্তি উঠে গেল না। বসে চিঠিটা পড়ে আবার ভাজ করে খামে ঢুকিয়ে পকেটে পুরল। তারপর বলল, একটু বসুন। মা বাথরুমে। এসে যাবে এক্ষুনি।
স্বস্তিকে আপনি বলবে না তুমি তা ঠিক করতে পারছিল না দীপনাথ। স্বস্তির বয়স খুবই কম, কিন্তু ওর নরম হাসির পিছনে একটা ঝাঁঝালো ব্যক্তিত্ব আছে বলে সন্দেহ হয়।
কেন জানে না, এর আগের দিন অস্পষ্টভাবে স্বস্তিকে দেখে যেন আর কারও কথা মনে হয়েছিল। আজও হল। কে? একটু ভাবল দীপনাথ। তারপরেই অবাক হয়ে দেখল, স্বস্তিকে দেখে তার কেন যেন অপরিচিত অদেখা, স্নিগ্ধদেবের কথা মনে পড়ে। স্নিগ্ধদেব কি এরকম? হয়তো কালো, মোগা, লম্বা এবং আরও পরিণত এবং ধীর স্থির। তবু স্বস্তির ভিতর যেন ওইরকম এক বিপ্লবীর গন্ধ আছে।
দীপনাথ বলল, আপনি কি পলিটিকস করেন?
স্বস্তি আবার সুন্দর হাসিটি হাসল। কিন্তু প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল না। নরম গলায় বলল, স্টুডেন্টস মুভমেন্ট করি কিছু কিছু। আপনি ইন্টারেস্টেড?
একসময়ে নর্থ বেঙ্গলে আমিও করতাম। তারপর যা হয়।
ও।–স্বস্তি আর কিছু বলল না।
