আজই, এই মুহূর্তে মণিদীপাকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য দীপনাথ আচমকা পয়সাগুলো ছুড়ে দিল লাইনের দিকে। ঠুং ঠাং শব্দ হল অদূরে। দু’-একজন অন্ধকারে মুখ তুলল শব্দের দিকে। লাইনের ওপর গাড়ির আলো এসে পড়ল তখন।
গাড়িতে কোনও ভিড় নেই, বরং অস্বস্তিকর রকমের ফাঁকা। দীপনাথ উঠল এবং ফাঁকা বেঞ্চে খুব হাত পা ছড়িয়ে বসল।
দীপনাথ!
উঁ!
এবার একটা বিয়ে করো।
আমি অপদার্থ, অপদার্থের বিয়ে করতে নেই।
বিয়ে করো দীপনাথ, তা হলে অন্তত সন্ধেবেলা ফিরে যেতে ভাল লাগবে। মেসবাড়িতে ফেরা তো ঠিক ফেরা নয়।
কথাটা ঠিক। প্রতিদিনই মনে হয়, কোথাও ঠিক ফিরে যাচ্ছি না। কিন্তু শুধু ওটুকুর জন্য অতটা রিস্ক নেওয়া কি ভাল?
তবে কী ভাল দীপনাথ? পরকীয়া?
পরকীয়া? ছিঃ ছিঃ, তা কেন?
তবে বিয়ে করো দীপনাথ। জীবনে একজনের কাছে অন্তত পুরোপুরি উন্মােচন করতে পারবে নিজেকে। এখন এটা তোমার দরকার।
ভাবছি। বরং আর-একটু ভাবি।
তুমি ভাবতে বড় ভালবাসো। অত ভেবে ভেবে ঘুঘু পাখি হয়ে যেয়ো না। সঙ্গে কিছু করো।
বিয়ে করলে খাওয়াব কী?
বোস তো চাকরি দিচ্ছে।
যদি দেয়। বোসকে তো ঠিক বোঝা যায় না।
বলো কী! বোস যে তোমার বন্ধু!
তবু বোস সাহেবের মতো লোককে বিশ্বাস নেই হে, হয়তো এ জীবনে বিয়েটা ঘটেই উঠবে না।
কীরকম মেয়ে হলে হবে তোমার দীপনাথ?
খুব সুন্দর কিছু নয়। মিষ্টি চেহারাটা হবে। খুব ভালবাসতে জানবে আর… আর কী!
আর কিছু নয়?
আর খুব বিশ্বস্ত হবে। খুব বিশ্বস্ত।
বাঃ।
তবে একটু ভয় করে। ভয় করে।
কেন বলো তো!
আমার মেজদা শ্রীনাথ আর মেজোবউদির মধ্যে তো দেখছি। বিলু আর প্রীতমের মধ্যেও দেখছি। বোস সাহেব আর মণিদীপার ব্যাপারও জানি। তাই ভয় করে।
যদি মণিদীপাকে বোস সাহেব ডিভোর্স করে তা হলে কখনও তাকে বিয়ে করতে পারবে দীপনাথ?
পারব। নিশ্চয়ই পারব।
ভেবে বলল। ভাল করে ভেবে দেখো।
পারব। বলছি তো। তবে সেটা ঘটবে না।
যদি ঘটে?
ঘটবে না। মণিদীপা কি আমাকে ভালবাসে?
ভালবাসার কথা থাক, দীপনাথ। আমি বলি বিশ্বস্ততার কথা। একটু আগেই বলছিলে না যে, মানুষের ঘর-সংসার খাঁ খাঁ হয়ে যাবে!
বলছিলাম।
বিশ্বস্ততার কথা বলছিলে?
হুঁ। তা-ও।
মণিদীপাকে বিশ্বাস করতে পারবে?
পারব না কেন?
কী করে পারবে? সে যে বিশ্বাসের ঘরে আগুন দিয়েই আসবে, যদি আসে।
আসবে না। এরকম কিছু ঘটবে না।
যদি ঘটে?
বলেছি তো, যদি আসে তবে বিনা প্রশ্নে তাকে নেব।
তবে একটু আগে তাকে যে বড় বিসর্জন দিলে!
আমার মনে হয় ওরা বিয়ে ভাঙবে না। যদি না ভাঙে তবে মণিদীপার ভালর জন্যই ওকে মন থেকে বিসর্জন দেওয়া আমার উচিত।
তা হলে প্রতিমা ভাসান হয়ে গেল বলছ! আর ওকে নিয়ে ভাববে না?
না। যেভাবে সিগারেটের নেশা ছেড়েছিলাম ঠিক সেইভাবে ছাড়ব।
জানি সিগারেট ছেড়ে মেনথল দেওয়া লজেন্স খেতে। এখন কে তোমার লজে‡স হবে দীপনাথ? বীথি?
না, না! ওকথা বোলো না। ওই আমার একটা মাত্র পাপ, মাত্র একবারের পদস্খলন!
তাই তো বলি দীপনাথ, বিয়ে করো। তা হলে আর দুনিয়াটা এত গোলমেলে লাগবে না।
শিয়ালদা সাউথ স্টেশনে ঘরমুখো যাত্রীদের হাউড় ভিড়, গাড়ি থামতেনা-থামতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল কামরায়। ঠেলা গুঁতো খেয়ে, ঘষটে, চেপটে অতি কষ্টে নামে দীপনাথ। প্ল্যাটফর্মের থিকথিকে ভিড় কেটে ফটকের দিকে এগোয়।
সুখেন ঘরেই ছিল। পাজামা পাঞ্জাবি পরে যেন বেরোবার মুখে বসে আছে। দীপনাথকে দেখেই বলল, আমি আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। বাইরের জামা-কাপড় আর ছাড়বেন না। চলুন বেরোই।
কলেজের পড়ুয়া রুমমেটটি আজ ঘরেই আছে। খুব কম কথা বলে, একটু অভদ্র রকমের চুপচাপ থাকে। সে আজ খুব নিবিষ্ট মনে বইখাতা খুলে পড়াশুনো করছে।
দীপনাথ আড়চোখে তাকে দেখে নিয়ে বলল, কোথায়?
বাইরে চলুন বলছি।
দীপনাথ বিরক্ত হয়। সুখেনের বন্ধুত্ব আজকাল তার শাসরোধ করে দিচ্ছে। কিন্তু পাছে পড়ুয়া ছেলেটির সামনেই কাণ্ডজ্ঞানহীন সুখেন বোস কোনও কথা বলে ফেলে সেই জন্য সে ঘরের বাইরে এল।
রাস্তায় এসে সুখেন বলে, আজ বীথি আপনাকে নেমন্তন্ন করেছে।
একটু চমকে উঠে দীপনাথ বলে, কেন?
সেদিন আপনাকে ঠিকমতো কিছু খাওয়াতে-টাওয়াতে পারেনি বলে দুঃখ করছিল। আজ আমার অফিসে ফোন করে বলল, তোমার বন্ধুকে নিয়ে অবশ্যই আসবে। যত রাত হোক আমি অপেক্ষা করব।
দীপনাথ খুবই রেগে যাওয়ার চেষ্টা করে। তার মনে হয়, এই প্রস্তাবে তার বোমার মতো ফেটে পড়া উচিত। কঠিন প্রতিরোধ তৈরি করা উচিত। সুখেনকে প্রচণ্ড অপমান করা উচিত।
কিন্তু কোনওটাই পারে না দীপনাথ। ভিতরে একটা বোমার পলতেয় আগুন সে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু মিয়ানো বোমাটা ফাটল না। তবু যতদূর সম্ভব গলায় ঝঝ এনে সে বলল, না, আমি যেতে পারব না। আমি অসম্ভব টায়ার্ড।
আজ যে বড় জমাটি বাদলার ওয়েদার ছিল দীপবাবু!
বাদলার ওয়েদার তো কী হয়েছে?
ভারী অপ্রতিভ মুখে বোকাটে হাসি হেসে সুখেন বলে, আপনি ভারী তেজি মানুষ। মর্যালিস্ট। কিন্তু বীথি আজ কোনও দুষ্টুমি করবে না, কথা দিয়েছে। আপনি যে রেগে আছেন তা ওকে আমি বলেছি। আপনি জানেন না, বীথি ভারী ভাল মেয়ে। জীবনে অনেক ঘা খেয়ে
উদাসভাবে দীপনাথ বলে, খারাপ মেয়েদের সব গল্পই এরকম। বীথি ভাল মেয়ে হলেই বা আমার কী?
ব্যথিত মুখে সুখেন বলে, আপনি ভুল বুঝেছেন।
ওসব কথা থাক। আমি ইন্টারেস্টেড নই।
ও যে অপেক্ষা করবে।
অপেক্ষা করতে তো কেউ বলেনি। তবু যদি করে তো করবে।
