দীপনাথ মাথা নিচু করে বলল, আমার ভাল লাগার প্রশ্নটা তো বড় নয়। আমার নিজের এক পিসির কথা খুব মনে পড়ছে। আমি সেই পিসির কাছে শিলিগুড়িতে মানুষ। পিসির দাঁত উঁচু ছিল, সাজগোজ করতে জানতই না, লেখাপড়ারও তেমন বালাই ছিল না। যাকে বলে ভয়েড অফ অল উওম্যানলি অ্যাট্রাকশন, কিন্তু পিসেমশাই তো তার সঙ্গেই একটা জীবন কাটালেন।
মণিদীপা গম্ভীর হয়ে বলে, ওসব বলে লাভ নেই। আমার মা-বাবাও একসঙ্গে এতকাল কাটিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রিলেশনও খুব ভাল। সেই আমলের বিয়েটা ছিল পারিবারিক। এখন ম্যান-উওম্যান রিলেশন। পৃথিবী তো থেমে নেই, দীপনাথবাবু।
থেমে নেই, কিন্তু তার গতিটা খুব মহৎ লক্ষ্যে হয়তো যাচ্ছে না।
সেটা আপনার ধারণা। আমি মনে করি কিছু কিছু জিনিসকে ভেঙে ফেলে ভিতরকার সত্যটিকে খুঁজে দেখা উচিত। রিভ্যালুয়েশনটাই বেঁচে থাকার বড় লক্ষণ।
দীপনাথ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বলল, আমাকে বাসভাড়াটা দিন। অনেক রাত হল।
মণিদীপা ঠোঁট দাঁতে চেপে একটু চেয়ে থেকে বলে, নাউ হুঁ ইজ বিয়িং রুড? কথার মাঝখানে বাসভাড়া চাওয়ার মানে কি আমাকে অপমান করা নয়?
দীপনাথ উঠে দাঁড়ায় এবং তেতো গলায় বলে, আপনাকে অপমান করার ইচ্ছে ছিল না। আমি তো অপমান করতে আসি না, অপমানিত হতেই আসি।
এটা থিয়েটারি সংলাপ হয়ে গেল। তবু মণিদীপা ঠাট্টা করল না। গম্ভীর মুখে নিজের করতলের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আচমকা উঠে গিয়ে মিনিট পাঁচেক বাদে ফিরে এসে নিঃশব্দে তিনটে দশ টাকার নোট সেন্টার টেবিলের ওপর ছাইদানিতে চাপা দিয়ে রাখল।
দীপনাথ তাকিয়ে বলল, অত টাকা দিয়ে কী হবে?
মণিদীপা জবাব দিল না।
দীপনাথ টাকাটা ছুঁল না, গোঁয়ারগোবিন্দর মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলল, আমার পকেটমারের পুরো টাকাটাই তো আপনার দেওয়ার কথা নয়। পঞ্চাশটা পয়সা পেলেই আমার হয়ে যাবে। আর সেটাও ধার হিসেবে। কালই ফেরত দেব।
মণিদীপা যেন চটকা ভেঙে বলল, ওঃ, তাই তো মনে ছিল না যে অহংকারী আমি একাই নই।
আমি অহংকারী নই। অহংকার করার কিছুই যে আমার নেই তা তো আপনি ভালই জানেন।
আপনার সবকিছু আমি জানি এ ধারণা কী করে হল? আমি কারও কিছু জানতে চাইও না।–বলে মণিদীপা আবার গিয়ে একটা আধুলি এনে টঙাস করে টেবিলে ফেলে দিল।
আধুলিটা অচল কি না দেখে নিয়ে দীপনাথ পকেটে ফেলে।
চলি তা হলে।
মণিদীপা জবাব দিল না। মেঝের দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল বাইরের ঘরে।
দীপনাথ আবার বলে, আসছি। বোস সাহেব এলে বলবেন, আমি এসেছিলাম।
মণিদীপা হঠাৎ ফুঁসে উঠে বলল, পারব না।
বলেই ঝাপটা দিয়ে ভিতরে চলে গেল।
৩৩. ট্রেনের কথা একদম খেয়াল থাকে না
ট্রেনের কথা একদম খেয়াল থাকে না দীপনাথের। অথচ কৌটো কোম্পানির মালিক নীলাম্বর ভদ্র তাকে শিখিয়েছিল, কলকাতায় এখানে সেখানে যাতায়াতের সময় যদি কাছাকাছি রেল স্টেশন থাকে তবে তাতেই যাতায়াত করবেন। কলকাতার বাসে-ট্রামে ওঠা মানে কিছুক্ষণ নরকবাস। তার চেয়ে ট্রেন ঢের ভাল।
কিন্তু দীপনাথের একমাএ দূরে যাওয়ার কথা ভাবলেই ট্রেনের কথা মনে পড়ে। অথচ কলকাতায় লোকাল ট্রেন যে কত উপকাবী তা খেয়াল থাকে না।
আজ অবশ্য খেয়াল হল। মণিদীপার দেওয়া আধুলি পকেটে নিয়ে বেরিয়ে সে আজ প্রথম কালীঘাট স্টেশনের কথা ভাবল। মিনিট দশেক হাঁটলেই ট্রেনের নাগাল।
বাড়ির বাইরে এসে সে একবার দোতলার অন্ধকার বারান্দাটার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ততটা অন্ধকার নয় যাতে মণিদীপাকে দেখা যাবে না। চুপচাপ রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার আলো অতদুরে মৃদু হয়ে পৌঁছেছে, সঙ্গে একটা বড় গাছের চিকড়ি-মিকড়ি ছায়াও।
দীপনাথ স্টেশন পর্যন্ত দৃশ্যটাকে বয়ে আনল।
ফাঁকা স্টেশন প্ল্যাটফর্মে কুড়িয়ে বাড়িয়ে জনা পাচেক যাত্রী হবে। স্টেশনঘরে জিজ্ঞেস করে জানল ট্রেনের এখনও দেরি আছে।
সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার পর আজকাল কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে গেলে সময়টা বড় দেরিতে কাটে, অপেক্ষা দীর্ঘ মনে হয়। তবু সিগারেট ছেড়েছিল বলে দীপনাথ আজকাল নিজের পকেটে হাত দিয়ে পয়সার অস্তিত্ব টের পায়। দিনে কম করেও আড়াই থেকে তিন টাকা ছিল তার সিগারেট আর দেশলাইয়ের খরচ। একদিন খুব শান্তভাবে সে এই খামোখা খরচটার কথা ভাবল। পরদিনই সিগারেটের বদলে মেনথল দেওয়া লজেন্স কিনল এক ডজন। লজেন্স মুখে ফেলে মুখের সরস ভাবটা বজায় রাখল, সিগারেট আর ছুঁল না। কোনও কিছু ছাড়তে হলে এক কঁকিতেই ছাড়তে হয়, ধীরে ধীরে ছাড়া যায় না।
ঠিক সেই সিগারেটের মতোই সহজে যে সব ছাড়া যাবে তা তো নয়। স্টেশনের একটা বেঞ্চের কোনায় বসে দীপনাথ কেবলই যখন অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়ানো মণিদীপার কথা ভাবছিল তখন তার মনে হল, এটা ছাড়া যায় না। এটা ছাড়লে বাচার কোনও অর্থ থাকে না। জীবনের প্রতিটি মিনিটই তবে অসহনীয় এক-একটি ঘণ্টায় দাঁড়াবে।
আবার ভাবল, একটু আগেই না সে বিশ্বাসের কথা বলছিল!
মুশকিল হল দীপনাথের প্রিয় কোনও চিন্তা নেই, একমাত্র আজকাল মণিদীপাকে ভাবা ছাড়া। সে কী করে একা তার অবসরকে ভরে তুলবে।
বৃষ্টির জল এখানে সেখানে জমে আছে। প্ল্যাটফর্মের মোরম ভেজা। ভ্যাপসা একটা গরম থম–ধরা ভাব। স্টেশনের আলোর সংখ্যা এতই কম যে চারদিক ভাল করে দেখা যায় না। এই স্টেশন থেকে কোনওদিন গাড়ি ধরেনি দীপনাথ, কোনওদিন ট্রেন থেকে নামেওনি এই স্টেশনে। আজই প্রথম। আধুলি ভাঙিয়ে শিয়ালদার টিকিট কাটবার পর খুব অল্প কিছু খুচরোই অবশিষ্ট আছে পকেটে। পকেট থেকে পয়সাগুলো বের করে হাতের মুঠোয় ধরে থাকে দীপনাথ। আধুলিটায় মণিদীপার স্পর্শ ছিল। এই পয়সাগুলোয় বুকিং ক্লার্কের হাতের ছোঁয়া আছে মাত্র তবু এও তো মণিদীপারই স্পর্শের ভাঙানো খুচরো।
