দীপনাথ গুছিয়ে বলতে পারবে না জানে। তবু কিছু কথা তার বুকে ঠেলাঠেলি করছে। সে মৃদু স্বরে বলল, বিয়ে ভাঙলে বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়।
তার মানে?
ডিভোর্সের চলন বেশি হলে ভবিষ্যতে স্বামী বা স্ত্রী কেউ কারও ওপর নির্ভর করতে পারবে না। অবিশ্বাস এসে পড়বে। কেউ সখী হবে না।
ডিভোর্স না করেও তো অমেকেই সুখী নয়।–মণিদীপার মুখে মৃদু শ্লেষের হাসি।
তা বটে। কিন্তু আপনি যদি বোস সাহেবকে সইতে না পারেন তবে ভবিষ্যতে যে অন্য কাউকে সইতে পারবেন তার তো গ্যারান্টি নেই। হয়তো সামান্য সওয়া বওয়ার অভাবে একটার পর একটা বিয়ে ভেঙে যাবে। মানুষের ঘবদোর খাঁ খাঁ করবে। অফিস থেকে ফেরার সময় একজন মানুষ ঠিক ঠিক বুঝতে পারবে না, ঘরে তার বউ আছে কি নেই।
হাউ ট্র্যাজিক!–বলে মণিদীপা একটু শব্দ করে হেসে ফেলে।
দীপনাথ গোঁয়ারের মতো তবু বলল, কাজটা ভাল হচ্ছে না মিসেস বোস।
মণিদীপার ঝলমলে মুখের ভ্রু-টা হঠাৎ কুঁচকে যাওয়ায় ভীষণ থমথমে হয়ে গেল। তেমনি গম্ভীর গলায় বলল, বোস পদবিটা কি আমার গায়ে লেগে আছে? আপনি আজ পর্যন্ত আমার নাম ধরে ডাকার সাহস পাননি। ভারী আশ্চর্য!
দীপনাথ অধৈর্যের গলায় বলে, ওসব ইররেলেভেট ব্যাপার। আপনার নাম ধরে ডাকতে আমার এখনও একটু সংকোচ আছে। আমি চট করে ফ্রি হতে পারি না।
তাই দেখছি।–মণিদীপার ভ্রু আবার সটান হল এবং মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। বেশ আবার ঝলমলে দেখাল তাকে। মৃদু স্বরে বলল, আপনি সত্যিই খুব ভাল লোক। কিন্তু আমার বিশেষ কিছু অলটারনেটিভ নেই। আপনি যখন অনেকখানিই জেনে ফেলেছেন তখন আপনাকে আর-একটু জানাতে বাধা নেই। শুনুন, ডিভোর্সের পর আমি আর কাউকে বিয়ে করতে যাব না, স্নিগ্ধর সঙ্গে অবৈধ প্রেম করব না। এমনকী আপনার সঙ্গেও নয়।
যাঃ, কী যে বলেন!
মণিদীপা মন্তব্যটা যেন শুনতে পায়নি এমন উদাসীনভাবে বলল, আপনাকে আগেও বলেছি, আমার ধ্যানধারণার সঙ্গে মিস্টার বোসের কোনও মিল নেই। আমরা জাস্ট চুক্তিবদ্ধ স্বামী-স্ত্রী। আমাদের সম্পর্কটা এখন একদম স্টেলমেট হয়ে গেছে।
আপনি কি খুব অহংকারী?
মণিদীপা একটু চেয়ে থেকে গম্ভীর মুখেই মাথাটা ওপরে নীচে নেড়ে বলল, ভীষণ। আমি সহজে কারও কাছে মাথা নিচু করতে পারি না।
হতাশার গলায় দীপনাথ বলে, মিস্টার বোসও তাই। সমস্যা হল দু’জন অহংকারীকে কী করে বশে আনা যায়। একজন একটু মাথা না নোয়ালে তো হয় না।
মণিদীপা গাঢ় এক দৃষ্টিতে দীপনাথকে দেখছিল। এ মেয়েটা বেশ অকপটে চোখে চোখে তাকাতে পারে। সম্ভবত ওর মনে পাপ নেই। মণিদীপা না হেসেই বলল, আপনি তো বিয়ে করেননি, স্বামী-স্ত্রীর এই প্রবলেমটার কথা জানলেন কী করে?
জানি।
মণিদীপা অন্য মনে দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডারের দিকে চেয়ে বলল, বোধহয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রবলেম হল অহংকারের লড়াই।
আপনি কি তা মানেন?
মণিদীপা অবাক হয়ে বলল, মানি বলেই তো বলছি।
তা হলে তো প্রবলেমটা থাকে না। সভ হয়ে গেল।
হল না। একটা মানুষ কি সহজে নিজেকে বদলাতে পারে?
কিন্তু বদলালে যদি ভাল হয়?
ভাল হয় কি না তা দেখার জন্য তা হলে মানুষকে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হবে। হয়তো বারে বারে বদলাতে হবে। মানুষ তো পুতুল নয়।
তা হলে কী হবে?
কিছু হবে না। এসব প্রবলেম অত সহজে মেটে না। তার চেয়ে ডিভোর্স ভাল।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মণিদীপা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দাঁড়ান, আপনার বাসভাড়াটা এনে দিই।
দীপনাথ ম্লান মুখে বলল, চলে যেতে বলছেন তো?
মণিদীপা যেমন টপ করে দাঁড়িয়েছিল তেমনই টপ করে বসে পড়ল। অত্যন্ত ব্যথিত চোখে চেয়ে বলল, মানেটা বুঝি তাই দাঁড়াল?
তা জানি না। তবে হঠাৎ বাসভাড়া দেওয়ার কথা শুনে মনে হল আপনি আমার মধ্যস্থতার ব্যাপারটা তেমন পছন্দ করছেন না।
সে তো ঠিকই। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে অন্য কারও মতামত আমি পছন্দ করি না। কিন্তু তা বলে আপনাকে আমার অপছন্দ নয়।
দীপনাথের ফর্সা মুখ লাল হয় একটু।
মণিদীপা তাকে শিউরে দিয়ে বলল, বহুকাল আপনি আসেননি। হয়তো আমার ওপর রাগ করেছিলেন। কিন্তু আপনাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করেছিল ক’দিন। খুব ইচ্ছে করেছিল। বিশ্বাস করুন। আপনার ভালমানুমির একটা দারুণ অ্যাট্রাকশন আছে।
দীপনাথের একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তবু সে নিজের আবেগের ওপর উঠতে পারল প্রাণপণ চেষ্টায়। বলল, মিস্টার বোসের কি কোনও অ্যাট্রাকশনই নেই?
হঠাৎ বোস সাহেবের কথা উঠল কেন?–বলে মণিদীপা হেসে ওঠে। তারপর বলে, আপনার বোধহয় এখনও ধারণা, আমি আপনার প্রেমে পড়েছি।
না, না, তাই বললাম নাকি?–দীপনাথ আঁকুপাঁকু করে ওঠে।
মণিদীপা স্নিগ্ধ স্বরে বলে, বোস সাহেবের কিছু অ্যাট্রাকশন নিশ্চয়ই আছে দীপনাথবাবু। তবে সেগুলোর কোনও অ্যাপিল আমার কাছে নেই।
একটা মানুষের তো সবরকম সদ্গুণ থাকতে পারে না। তার যেটুকু আছে সেটুকুকে মূল্য দিলেও হয়।
আপনি আজকাল পুরোপুরি বোস সাহেবের দালাল হয়ে গেছেন। কিন্তু বোস সাহেব আপনাকে এ কাজের ভার দিয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ, ওর কাছে আমারও কোনও অ্যাট্রাকশন নেই।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, না, আমি বোস সাহেবের দূত হয়ে আসিনি। তবে আপনাদের দু’জনকে আমার বেশ লাগত। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে খারাপ লাগবে।
আপনার ভাল লাগার মতো কিছু যে করতে পারছি না তার জন্য দুঃখিত।
