দীপনাথ চমকে উঠলেও ঘাবড়ে যায়নি। এ মেয়েটাকে খোঁচা দেওয়া যে বিপজ্জনক তা সে জানে। কিন্তু খোঁচা যখন দিয়েই ফেলেছে তখন পিছু হটাও বোকামি। তাই সে মৃদু স্বরে বলল, সর্বহারার সবরকম কোয়ালিফিকেশন আমার আছে। অন্তত আজ এই মুহূর্তে আমি সর্বহারা।
মণিদীপা দুই বিশাল চোখে তাকে ভস্ম করে দিতে দিতে বলে, তার মানে?
একটু আগে বাসে আমার পকেটমার হয়েছে। মেসে ফেরার বাসভাড়া পর্যন্ত নেই।
দীপনাথ ভেবেছিল মণিদীপা হাসবে। কিন্তু হাসল না। চোখের দৃষ্টিতে ভসনা মিশিয়ে একটু তাকিয়ে থেকে বলল, কত গেছে?
বড়লোকের চোখে বেশি নয়। তবে গরিবের অনেক। প্রায় ত্রিশ টাকা।
কবে যে আপনাকেও চুরি করে নেয়! টাকাটা কোথায় ছিল?
হিপ পকেটে।
পুলিশে জানিয়েছেন?
দীপনাথ একটু অবাক হয়ে বলে, পকেটমার হলে কেউ পুলিশে যায় নাকি? এ রকম তো শুনিনি। গিয়েও লাভ হয় না।
তবু পুলিশকে জানানোটা নিয়ম।
খামোখা সময় নষ্ট। আমি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছি। হয়তো এক গরিবের পকেট কেটে আর এক গরিবের কিছু উগকার হচ্ছে।
পকেটমাররা গরিব হবে কেন? ওদের বিরাট অর্গানাইজেশন থাকে। আপনি খুব সহজেই সব কিছু মেনে নেন। ওটা একদম ভাল নয়। প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ যত সামান্যই হোক তার একটা মূল্য আছে, এটা মানেন তো?
আমাদের দেশে নেই।
কে বলল নেই?
আমিই বলছি!
আপনি কখনও প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করেছেন জীবনে? না করলে বুঝবেন কী করে? প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের ক্ষমতা থাকলে এই ঝড়-বাদলের সন্ধেবেলা এত দূরে বসের বাড়ি বয়ে আসতেন না।
দীপনাথ একটু অধৈর্যের গলায় বলে, বোস সাহেবের কাছে তো আমি আসিনি! গরজটা আমারই।
কিসের গরজ?
আপনি সত্যিই বিয়েটা ভেঙে দিচ্ছেন?
মণিদীপা এ কথায় বোধহয় একটু হকচকিয়ে যায়। তারপর ভীষণ তেতো আর বিরক্ত গলায় বলে, এটা কি অন্যের ভীষণ পার্সোনাল ব্যাপারে হাত দেওয়া নয়?
দীপনাথ এ কথাটার জবাব তৈরি রেখেছিল। সে বলল, বিয়ে করা বা বিয়ে ভাঙা কোনওটাই খুব পার্সোনাল বিষয় হতে পারে না, মিসেস বোস। যদি হত তা হলে বিয়েতে সোশ্যাল গ্যাদারিং, পুরুত, ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বা সাক্ষীর দরকার হত না।
আমি ওসব জানি না। প্রসঙ্গটা আমার কাছে ভাল লাগে না।
আমারও লাগে না। তবে আমি আপনাদের ভাল চাই বলেই জিজ্ঞেস করছি, বিয়েটা বাচানো কোনওভাবে সম্ভব কি না?
বোধহয় না।
কেন, মিসেস বোস?
বিয়েটা আমরা কেউই ভাঙছি না বোধহয়। আপনিই ভেঙে যাচ্ছে।
দীপনাথ আচমকা জিজ্ঞেস করল, সেদিন আপনি টেলিফোনে আমাকে বলেছিলেন, স্নিগ্ধদেবের কথা মিস্টার বোস জানেন না। কিন্তু কথাটা সত্যি নয়, মিসেস বোস। স্নিগ্ধদেব তাপনাদের এ বাড়িতে একসময়ে আসতেন। বোস সাহেবের সঙ্গে তার পরিচয়ও ছিল।
মণিদীপা হঠাৎ একটু অস্বস্তি বোধ করে। বিরক্তির ভাব দেখিয়ে ঠোঁট উলটে বলে, হতে পারে। আমার অত মনে নেই। তবে এর মধ্যে আবার স্নিগ্ধকে কেন?
দীপনাথ সামান্য ম্লান একটু হেসে বলল, আজকাল বারবারই কেন যেন স্নিগ্ধদেবের কথা আমার মনে হয়। ভাবি, মিঙ্গই হয়তো আমাদের আগামী দিনের নেতা, মুক্তিদাতা, দেশের হৃদয়।
মণিদীপা এ কথায় রাগ করবে না হাসবে তা ঠিক করতে সময় নিল। তারপর হেসেই ফেলল। বলল, হতেও পারে! ঠাট্টার ব্যাপার নয়।
আমি ঠাট্টা করিনি। যিনি আড়াল থেকে এত চোখা চালাক হাজির-জবাব একটি মহিলাকে চালাতে পারেন, তার ক্ষমতা অনেক।
দাঁতে দাঁত পিষে মণিদীপা বলে, আপনাকে এ খবর কে দিয়েছে যে, স্নিগ্ধ আমাকে চালায়?
আমাকে স্নিগ্ধদেবের ঠিকানাটা দেবেন?
কেন?–বড় চোখে চেয়ে সন্দিগ্ধ গলায় মণিদীপা জানতে চায়।
আমি তার সঙ্গে দেখা করব।
কেন দেখা করবেন?
আমি জানতে চাই কেন আপনাদের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।
স্নিগ্ধ তা কী করে বলবে? আপনার কি সন্দেহ যে, আমি স্নিগ্ধর সঙ্গে লুকিয়ে প্রেম করি?
না। প্রেম করার হলে আপনি প্রকাশ্যেই করতেন।
এটা কি কমপ্লিমেন্ট?
ধরে নিতে পারেন।
বেশ ধরলাম। তা হলে আপনি বা আপনার স্পাইনলেস বস ভাবেন না যে, আমি স্নিগ্ধর সঙ্গে প্রেম করি?
না, ভাবি না।
তা হলে ডিভোর্সের ব্যাপারেই বা স্নিগ্ধর কী করার থাকতে পারে?
উনি আপনার প্রেমিক না হলেও আপনার নেতা।
তা হতেই পারে।
তিনি প্রভাব বিস্তার করলে আপনি হয়তো বোস সাহেবকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা পালটাবেন।
নেতারা আজকাল এসবও করেন নাকি?
আমরা তাঁকে অনুরোধ জানাব।
আমরা মানে? আপনার সঙ্গে আরও কেউ আছে নাকি?
দীপনাথ একটু বাধা পেল। ভাবল। ভেবে বলল, না, আমি একাই যাব।
তাই বলুন। আমরা শুনে আমি চমকে গিয়েছিলাম।
আপনি কী ভেবেছিলেন?
ভাবছিলাম, আপনার সঙ্গে বোধহয় বোস সাহেবও আছেন।
না, বোস সাহেবের আত্মসম্মান বোধ একটু বেশি।
মণিদীপা তীব্র শ্লেষের হাসি হেসে বলে, বোস সাহেবের ঘটে আপনার চেয়ে বুদ্ধিও কিছু বেশি আছে। উনি বোকা নন বলেই স্নিগ্ধর কাছে যাওয়ার কথা ভাবেন না।
আমি কি স্নিগ্ধদেবের কাছে গেলে খুবই বোকামি করব?
খুবই বোকামি করবেন।
আমি কি খুবই বোকা?
এখন পর্যন্ত তেমন বুদ্ধির কোনও পরিচয় দেননি।
দীপনাথ প্রাণপণে ভাবার চেষ্টা করছিল। তার বুদ্ধিবৃত্তি এখন ঠিকমতো কাজ করছে না। মাথাটা এলোমেলো, বিভ্রান্ত। একটু ঘাবড়েও যেন যাচ্ছে সে। ভেবেচিন্তে বলল, হয়তো আমি বোকাই। তবু আমি আপনাদের ভাল চাই।
কী ভেবে বুঝলেন যে, বোস সাহেবের সঙ্গে বিয়েটা না ভাঙলেই ভাল হবে?
