দীপনাথ বেরিয়ে আসে। আজকাল মন ভাল থাকে কমই। তবু আজ বিকেলে যেন আরও ভরাড়ুবি হল। খুব আনমনে সে নিউ আলিপুরে যাওয়ার একটা ভিড়ঠাসা বাসে উঠে পড়ল। বহুদিন বোস সাহেবের বাড়িতে যায়নি।
বাসে আচমকাই বেলফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ এল নাকে। এই এক গন্ধই মনের বিষাদকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আজ বোধহয় বিয়ের তারিখ।
৩২. টালিগঞ্জ ফাঁড়িতে নামবার মুখে
টালিগঞ্জ ফাঁড়িতে নামবার মুখে দুটো জিনিস টের পেল দীপনাথ। এক হল, বাইরে হঠাৎ তেড়েফুড়ে প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমেছে, সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। দু’ নম্বর হল, তার প্যান্টের হিপ পকেট থেকে মানিব্যাগটা খোয়া গেছে। দুটোই দুঃসংবাদ। দুটোর ওপরেই দীপনাথের কোনও হাত নেই। এই প্রচণ্ড ভিড়ের বাসে মানিব্যাগটা উদ্ধারের চেষ্টা পণ্ডশ্রম। বাইরের এই ঝড়বৃষ্টিতেই তাকে নামতেও হবে।
একেবারে কর্পদকহীন দীপনাথ বেকুবের মতো ভিড়ের বাস থেকে বৃষ্টির মধ্যে খসে পড়ল। দৌড় দৌড়। মোড়ের সিনেমা হলের লবি পর্যন্ত পৌঁছাতেই জামাপ্যান্ট ভিজে চুপসে গেল। ছাদের নীচে নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে সে রুমাল দিয়ে মাথা, ঘাড় মুখ মুছছিল যতখানি সম্ভব। মানিব্যাগটার জন্য রাগে গা চিড়বিড় করছে। খুব বেশি ছিল না, মেরেকেটে গোটা ত্রিশেক টাকা হবে। কিন্তু এখন মেসে ফেরার পয়সাটাও তার নেই। বোসের কাছ থেকে ধার করতে হবে।
কলকাতা শহরকে সে কতখানি ঘেন্না করে তা এই হঠকারী বৃষ্টির সন্ধ্যায় ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিল। নিজের ওপর রাগে ভিতরে ভিতরে ফুঁসে উঠছিল। হিপ পকেটে মানিব্যাগ রাখাটাই এক নম্বরের বোকামি। তার ওপর সে ভিড়ের বাসেও গাড়লের মতো অন্যমনস্ক ছিল। সেটা দু’নম্বর বোকামি।
বৃষ্টির তোড় কমে আসছিল, দীপনাথের রাগও ঠান্ডা হচ্ছিল ক্রমে। মনটা তেতো, বিরক্ত। কলকাতায় তার কম দিল হল না, তবু এখনও সে এ শহরে বাস করার যোগ্যতা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।
ঘণ্টাখানেক বাদে যখন বৃষ্টি থামল তখন বাসে এত ভিড় যে কাছে যাওয়াই মুশকিল। তার ওপর খালের ওপর ব্রিজের মুখে এক নিশ্চল জ্যাম জমে গেছে। বাসে উঠবার পয়সা দীপনাথের নেই, উঠলেও সহজে পৌঁছানো যাবে না। সুতরাং দীপনাথ হাঁটা ধরল।
বোস সাহেবের বাড়ি পৌঁছবার পর তার দুঃখের ভরা পূর্ণ হল। রাঁধুনি নোকটা দরজা খুলে জানাল, মিস্টার বা মিসেস কেউই বাড়ি নেই। কখন ফিরবে বলা যাচ্ছে না।
এই অঞ্চলে দীপনাথের চেনাজানা কেউ নেই। একমাত্র উপায় হল বোস সাহেব বা মণিদীপার জন্য অপেক্ষা করা কিংবা রাঁধুনির কাছেই কিছু ধার চাওয়া। লোকটা দীপনাথকে চেনে।
দীপনাথ বলল, তা হলে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। জরুরি কাজ আছে।
রাঁধুনি বলল, বসুন, চা করে দিচ্ছি।
ভেজা জামাকাপড়ে দামি সোফাসেটে বসতে একটু দ্বিধা বোধ করে দীপনাথ। ভেবেচিন্তে সে একটা রেক্সিনে মোড়া চেয়ারে বসল। তারপর ম্যাগাজিন তুলে ছবি দেখতে লাগল।
নিজের মুখের ভাব কোনওদিনই গোপন করতে পারে না দীপনাথ। তার মন খারাপ থাকলে মুখের ভাবে অবশ্যই বিমর্ষতা ফুটে উঠবে। আরও ঘণ্টাখানেক বাদে যখন মণিদীপা ফিরল তখন দরজায় দাঁড়িয়েই তাকে দেখে উদ্বেগের গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
দীপনাথ খুব বেপরোয়া মতো একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল, কোথায় কী হয়েছে! কিছু হয়নি তো।
মণিদীপা গম্ভীর হয়ে বলে, না হলেই ভাল।
দীপনাথ একঝলক চেয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। বহুকাল বাদে মণিদীপার সঙ্গে দেখা। এত সুন্দর দেখাচ্ছে। বোস সাহেব একে ডিভোর্স করবে কোন প্রাণে!
মণিদীপা ভিতরে গেল না। দীপনাথের মুখোমুখি বাইরের ঘরেই বসল। আজ তার সাজগোজ তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। হলুদ লাল কালো ড়ুরের একটা তাঁতের শাড়ি পরনে। চুল এলোখোঁপায় বাঁধা। বসে আর-একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে লাগল।
দু’জনের মধ্যে একটা অস্বস্তি আর সংকোচের বলয়। কেউ সেটা ভাঙতে চায় না। দীপনাথ সমস্ত অপমান মনে রেখেছে, কিছুই ভোলেনি। এই মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলে বা টেলিফোনে এর গলার স্বর শুনলেও তার স্নায়ু দুর্বল হয়ে যায়। প্রতিশোধের কথা মনে থাকে না।
রান্নার লোকটা দীপনাথকে সযত্নে ট্রে-তে করে চা আর ঘরে তৈরি কেক দিয়ে মণিদীপার দিকে সসম্রমে চেয়ে বলল, টি মেমসাব?
মণিদীপা চোখ না তুলেই মাথা নাড়ল। খাবে না।
দীপনাথ সসংকোচে চায়ের কাপটার দিকে চেয়ে ছিল। কিছু বলার নেই, একটা জড়তা বোধ করছে।
মণিদীপা মাগাজিনটা মুখে ধরে রেখেই বলল, বোস সাহেবের সঙ্গে কোনও দরকার ছিল বুঝি?
ছিল একটু।
দরকারগুলো অফিসে মিটিয়ে নিলেই তো হয়। অফিস-আওয়ার্সের পরও কেন একজন লোককে এত দূর দৌড়ে আসতে হবে বুঝি না।
দীপনাথ বুঝতে পারল না, এটা মণিদীপার বিরক্তি না অনুকম্পা। হয়তো কোনওটাই নয়। সে বলল, অফিসের বাইরেও কাজ থাকে।
মণিদীপা ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনি চা খান, জুড়িয়ে যাচ্ছে।
খাচ্ছি।-বলে দীপনাথ কাঁপে চুমুক দেয়।
কোম্পানি জাতে ওঠার পর বোধহয় আপনার কাজ আরও বেড়েছে।
বোস সাহেবের হয়তো বেড়েছে।—দীপনাথ বলল।
আপনার বাড়েনি?
না। আমি তো জাতে উঠিনি।—এই প্রথম বুদ্ধিমানের মতো একটা মন্তব্য করতে পেরে খুশি হল দীপনাথ।
কোনওদিন উঠবেনও না।
উঠব। যেদিন সর্বহারাদের একনায়কত্ব হবে।
ম্যাগাজিনটা টেবিলের ওপর ফটাস করে আছড়ে ফেলে সোজা হয়ে মণিদীপা ফুঁসে ওঠে, ওসব কি ইয়ারকির কথা?
