কেন বলল ওকথা?
ওর ধারণা সারাদিন ইচ্ছাশক্তির ব্যায়াম করলে আমার মন ক্লান্ত হয়ে পড়বে। মাথাও বিগড়ে যাবে।
দীপনাথ একটু হেসে বলে, তাতেই বা কী? ও যদি বলেই থাকে তো বলুক না। তুই কান দিস কেন?
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, কান দিই কারণ কথাটা ওর নিজের নয়। আর কেউ ওর মুখে কথাটা বসিয়েছে। বিলু আধুনিক বিজ্ঞানের খবর রাখে না, ইচ্ছাশক্তির কার্যকারণও ওর জানা নেই।
হয়তো হঠাৎ ভেবে ফেলেছে, জেনে ফেলেছে!
তা নয়। আমার অনুভূতি তোমাদের চেয়ে এখন অনেক বেশি প্রখর। আমি তো বাইরে যাই না। তাই চারদিকের সঙ্গে ঘষা খেয়ে খেয়ে আমার অনুভূতি ভোতা হয়ে যায়নি। আমি নিজেকে নিয়ে থাকি, মনে শান দিই, যুক্তি দিয়ে সবকিছুকে বিশ্লেষণ করার অবসর পাই।
বুঝলাম। বল।
আমি যে মরতে চাই না এটা বিলুর চেয়ে আর বেশি কে জানে বলল! আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে আমার লড়াই চালাচ্ছি। আমার আশা ছিল, বিলু অদ্ভুত সে লড়াইতে আমাকে সাপোর্ট দেবে। কিন্তু সেই প্রথম দিককার বিলুকে যেমন ঠান্ডা আর পর মনে হত, আজকাল বিলু যেন তাই হয়ে গেছে। কোনওদিন আমার ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে বিলু তো একমত ছিল না। মাঝখানে একটু হয়েছিল। আবার এখন সেই আগেকার বিলু।
তোর কী ধারণা?
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, অন্য কেউ বিলুর ভাবনা-চিন্তাকে প্রভাবিত করে এটা আমার পছন্দ নয় সেজদা।
অন্য কেউটা কে? অরুণ?
তার আমি কী জানি! আমি তো ওদের দুজনের মধ্যে কী কথা হয় তা জানি না।
দীপনাথের বুকের ভিতরটা ফাঁকা লাগছিল। এরকম কিছু হবে তা তো সে জানতই। মুখে অবশ্য বলল, বিলুর কথা নিয়ে তুই মাথা ঘামাস না।
একেবারে উদাসীনও থাকতে পাবি না। বললাম যে মৃত্যুর সঙ্গে আমার লড়াই একেবারেই আমার নিজস্ব। ওষুধ বলো, ডাক্তার বলো, কেউ তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। হয়তো আমার ইচ্ছাশক্তিরও তেমন ক্ষমতা নেই। কিন্তু তা বলে লড়াইটায় এত সহজে হেরে যাব? কেউ আমার লড়াইটাকে বুঝবে না?
বিলু ভুল করেছে। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।
প্রীতম মাথা নাড়ে, তার চেয়ে তুমি আমার বাড়িতে একটা চিঠি লিখে দাও। শতম এসে আমাকে নিয়ে যাক।
শিলিগুড়িতে যাবি?–হঠাৎ উৎসাহে একটু চেঁচিয়ে ওঠে দীপনাথ।
প্রীতম ম্লান মুখে ক্লিষ্ট একটু হাসি ফুটিয়ে দীপনাথের দিকে চেয়ে বলে, তুমি ভুলে গেছ সেজদা?
কী ভুলেছি?
তোমাকে বলিনি কখনও আমাকে আমার মায়ের কথা, ভাইদের কথা, শিলিগুড়ির কথা বোলো! ওসব মনে পড়লে আমি হাল ছেড়ে দিই, আমার লড়াই করার জোর থাকে না। বলিনি?
দীপনাথ একটু অবাক হয়ে বলে, কিন্তু এখন যে তুই নিজেই বললি!
কেন বললাম তা তো ভেবে দেখলে না সেজদা!
কেন?
প্রীতম ঠোঁটকে রবারের মতো টেনে হাসিটা বজায় রাখল। বলল, তার মানে তো দাঁড়ায়, আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি, লড়াইয়ে হেরে গেছি। এখন আমার মন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।
দীপনাথের কপালে ভাজ পড়ে। বহুকাল বাদে সে আজ খুব সিরিয়াস হয়। গম্ভীর গলায় বলে, শোন প্রীতম, বিলুর সামান্য কথায় তোর এত কিছু হয়নি। তুই আমার কাছে কিছু লুকোচ্ছিস। বল তো কী হয়েছে।
না, না…
বলতে বলতে কোনওদিন যা হয় না তা আজ হল। আচমকা প্রীতমেব গলা ভেঙে বসে গেল। চোখ দুটো পলকে রাঙা হয়ে উঠল। সে দু’হাতে মুখ ঢাকল।
প্রীতম! প্রীতম! এই পাগলা! ওরকম করছিস কেন?
প্রীতম সাড়া দিল না। মুখ ঢেকে কয়েকটা হেঁচকি তুলল। তারপর গোঁজ হয়ে স্থির হয়ে রইল অনেকক্ষণ। যখন মুখ তুলল তখন সে মুখ পাথরের মতো হয়ে গেছে।
দীপনাথ ওকে একটা ঝাকুনি দিয়ে বলল, বলবি না তো বলিস না। আমি কিছু শুনতেও চাই না। কিন্তু দোহাই আমার মুখ চেয়ে অন্তত ভেঙে পড়িস না। আর কেউ চাক বা না চাক, আমি চাই তুই বেঁচে থাক। আমি তোর ইচ্ছাশক্তির জয় দেখতে চাই। আমি নিজে ইচ্ছের লড়াইতে মার খেয়ে গেছি। আই হ্যাভ নো মর্যালিটি। কিন্তু আমার চোখের সামনে তুই তো আছিস!
প্রীতমের মুখের পাথর নরম হল। একটু হাসলও সে। বলল, সেজদা, তুমি কোনওদিন সাবালক হবে না। ওসব কী বলছ? আমি তোমার আইডিয়াল?
দীপনাথ একটু ধাতস্থ হয়। একটু লজ্জাও পায়। তারপর ক্ষোভের সঙ্গে বলে, একটু ইমোশন এসে গিয়েছিল। তুই এরকমভাবে কথা বলিস কেন?
ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু আমি তো বলতে চাইনি। তুমিই তখন থেকে বলতে বলছ।
দীপনাথ গম্ভীর হয়ে বলে, কিছু কথা আছে না শোনাই ভাল। ওগুলো চাপা থাকলে শান্তিতে থাকব।
আমিও তাই বলি।
দীপনাথ ঘড়ি দেখে বলে, সাতটা বাজতে চলল, বিলু এখনও এল না? লাবুই বা কোথায়?
লাবু পাশের ফ্ল্যাটে ওর সমবয়সি একটি মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাজি টিচারের কাছে প্রাইভেটে পড়ে।
অচলা? বিন্দু?
বিন্দু রান্নাঘরে আছে। অচলার ছেলের অসুখ বলে ক’দিন আসছে না।
তুই তা হলে একা?
ঠিক একা নই। আমার সঙ্গে হাজারও ভূতের ভাবসাব। তারা আছে।
দীপনাথ হেসে বলে, তোর সঙ্গী ভূত ছাড়া আর কে হবে? অত পাগলামি সইবে কে?
তুমি কি এখনই যাবে?
দীপনাথের একটু কাজ আছে। ঘড়ি দেখে বলল, রাত হল।
যাবে তো যাও।
একটু বসি। বিলুর সঙ্গেও দেখাটা হয়ে যাবে।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, না, যাও সেজদা! আমি এখন একটু একাই ভাল থাকব। আমার মনে মনে কিছু হিসেব কষতে হবে।
কর তা হলে। কিন্তু হিসেবের অঙ্কে মাইনাস বসাস না। সব প্লাস।
ঠিক আছে। চেষ্টা করব। অন্তত একজন তো আমাকে বেঁচে থাকতে দেখতে চায়।
অনেকেই চায়। তুই জানিস না।
