প্রীতম ভ্রু কুঁচকে বলে, অন্য সব কথা ছেড়ে এ কথাটাই বা মনে রাখলে কেন তুমি?
প্রতিদ্বন্দ্বী ইচ্ছা কাকে বলে তা বুঝতে পেরেছি বলে।
তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী ইচ্ছা কিছু হয়?
সকলেরই হয়।
প্রীতম মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর আবার ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবে। খানিক বাদে বলে, আমার মাথা পর্যন্ত এখনও রোগটা পৌঁছয়নি। যতদিন না পৌঁছয় ততদিন আমি সব বুঝতে পারব সেজদা। কিন্তু আমার আজকাল কিছু বুঝতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় রোগটা তাড়াতাড়ি মাথায় পৌঁছে গেলে বুঝি ভাল হয়।
দীপনাথ একটু অবাক হয়ে বলে, সে কী? তুই যে নেগেটিভ চিন্তা করতে ভালবাসতি না! তুই যে আমাকে রোগের কথাটাও উচ্চারণ করতে বারণ করেছিলি?
এখন আর বারণ করছি না।
হাল ছেড়ে দিচ্ছিস?
তোমরা সংসারটাকে বেঁচে থাকার যোগ্য করে রাখোনি। এখানে কি কারও বাঁচতে ইচ্ছে করে? কদিন আগেও তো এই পৃথিবীটাই ছিল। হঠাৎ রাতারাতি তো পালটে যায়নি।
বড় পৃথিবী না পালটাক, মানুষের নিজস্ব জগতের নিজস্ব সংসারের পৃথিবী তো পালটে যেতে পারে।
তোর পৃথিবীর আবার কী অদলবদল হল?
প্রীতম ভ্রু কুঁচকে রোগা হাতে নিজের নীচের ঠোঁটটা টেনে ধরে চুপ করে থাকে। জবাব দেয় না।
খুব গাঢ় স্বরে এবং বুকে ভয় নিয়ে দীপনাথ জিজ্ঞেস করে, কিছু হয়েছে রে?
প্রীতম হঠাৎ খুব স্পোর্টসম্যানের মতো হেসে ওঠে। সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে বলে, হলেই বা কী? আমার তো কিছুই যায় আসে না।
দীপনাথের মনে পড়ে বিলুর সাজগোজ, অরুণ ওকে মাঝে মাঝে গাড়িতে লিফট দেয়। অক্ষম প্রীতম পড়ে থাকে ঘরে। বিলু টাটকা যুবতী।
দীপনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কী জানি কী হল!
দুনিয়া পালটে যাচ্ছে সেজদা।
হুঁ। কিন্তু পালটানোর কারণটা তো বলবি!
সব কি বলা যায়? তোমার কথাই কি তুমি আমাকে বলতে পারো? পারো না।
আমার বলার মতো কিছু নেই।
কে জানে! হয়তো আছে। হয়তো নেই।
প্রীতম, তুই কেন খামোখা আমাকে নিয়ে ভাবিস?
খামোখা নয় সেজদা। আমি একা একা সারাদিন সকলের কথা যদি না ভাবি তবে আমার সময় কাটবে কী করে?
শুধু সময় কাটানোর জন্য হলে বই পড়িস না কেন?
আমি তো নাটক নভেল ভালবাসি না। ঘরে তেমন বই নেইও কিছু। বিলু কখনওই বইটই পড়ে। আমারও ভাল লাগে না। তার চেয়ে বরং জ্যান্ত মানুষদের নিয়ে ভাবলে অনেক বেশি ভাল লাগে।
ভাল আর লাগছে কই? আমরা তো কেউ তোর মনের মতো ভাল নই!
প্রীতম হাসে না। গম্ভীর মুখেই বলে, কথাটা মিথ্যে নয় সেজদা, তোমরা কেউ আমার মনের মতো ভাল নও। কিংবা হয়তো আজকাল আমার ভালর সঙ্গে তোমাদের ভাল মিলছে না।
তা নয় রে ঘরে বসে থেকে তুই তো বাইরের সঙ্গে সম্পর্ক বেশি রাখিস না। তাই হয়তো ঠিকঠাক সব জিনিস বুঝিস না।
প্রীতম একটু হাসে। বলে, তুমি এখনও আমাকে সেই শিলিগুড়ির বাচ্চা প্রীতম বলে ভাবো বোধহয়।
কেন, তাই বললাম বুঝি?
শোনো সেজদা, আমি বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মিটিয়েছি। শিগগিরই আমার ঘর-সংসারের সঙ্গে যে সম্পর্কটুকু আছে তাও মিটে যাবে। তখন তোমাদের ভাল নিয়ে তোমরাই একটা বিচার করে দেখো।
বহুবচনে বলছিস কেন রে? আমার সঙ্গে কাকে জড়াচ্ছিস?
এই কথায় হঠাৎ প্রীতমের ঠোঁট দুটো কি কেঁপে উঠল? টপ করে মাথা নোয়াল কেন? চোখে জল এল নাকি? একটু দূরে চেয়ারে বসেছিল দীপনাথ। কাছে উঠে এসে প্রীতমের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল, আমাকে বিশ্বাস হয় না তোর?
হয়।—খুব ক্ষীণ গলায় বলে প্রীতম, একমাত্র তোমাকেই হয়।
তা হলে সব বল। শুনি। কী হয়েছে?
প্রীতম আবার মুখ তোলে। একটা খাস ছেড়ে বলে, বাদ দাও। ওসব কিছু নয়। দুনিয়ায় সম্পর্কটার কোনও মানে নেই। এ দুনিয়ায় কে কার ভাই, কে কার বউ, তা দিয়ে কী হয় বলো তো? মারা গেলে কোন অসীম অন্ধকারে হারিয়ে যাব সবাই, কে কার থাকবে?
এ কথাটার মানেও বুঝলাম না। সহজ করে বুঝিয়ে দে।
কিছু বোঝানোর নেই।
বিলু কি তোর দিকে নজর দিচ্ছে না?
প্রীতম এ কথাটার জবাব চট করে দিল না। একটু অস্থির হল যেন। দুটো হাত বারবার কোল থেকে হাতলে, হাতল থেকে চাকায় স্থানান্তরিত করল। চোখের পলক ফেলল ঘন ঘন। তারপর বলল, বিল বিলুর মতোই।
বুঝিয়ে বল।
প্রীতম খুব আস্তে করে বলল, মাঝখানে ক’দিন বিলু খুব আপনজন হয়ে উঠেছিল। ঠান্ডা বিলুর ভিতর খানিকটা উত্তাপ টের পেতাম। তুমিও হয়তো লক্ষ করেছ। আমি ইচ্ছাশক্তির কথা বলতাম। ও সেটা বিশ্বাসও করত।
চমৎকার। তারপর কী হল?
ও আমাকে অন্য চোখে দেখতে লাগল হঠাৎ। খুব বেশি নজর রাখত, খুব বেশি ভাবত আমাকে নিয়ে। তারপরই চাকরিতে ঢুকে গেল। গোটা একটা ছবিই যেন ভেঙে পড়ে গেল আচমকা।
চাকরিতে ঢুকলে মেয়েদের একটু বদল হয়। সারাদিন খাটে, ঘরে এসে আবার সংসারের ঝামেলা পোয়ায়।
আমার সেই কনসিডারেশন নেই ভাবছ? থাকলে ভালই তো।
মেয়েদের চাকরি করা আমি পছন্দ করি না ঠিকই। কিন্তু যখন বিলু চাকরিতে ঢুকল তখন থেকেই আমি মনকে প্রস্তুত করেছি। মন নিয়েই তো আমার সারাদিন কাটে। সারাদিন তো শরীরের লড়াইতে হেরে যাচ্ছি, তাই মনকে খুব শাসনে রাখি। যে-কোনও অবস্থার জন্য আমার মন তৈরি থাকে।
তা হলে অসুবিধেটা কোথায়?
বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যাবে না, সেজদা। ছোটখাটো অনেক ব্যাপার ঘটে যায়।
কীরকম? একটু খুলে বল।
বিলু চাকরি করতে যাওয়ার পর প্রথম-প্রথম সবই ঠিক ছিল। কোনও কিছুই পালটায়নি! শুধু ও না থাকলে বাড়িটা ফাঁকা লাগে মাত্র। সারাদিন বিলুর জন্য অপেক্ষা করতাম। বিলুও ফিরত আমার জন্য আকুলি ব্যাকুলি হয়ে। তারপর ক্রমে ক্রমে বিলুর বোধহয় ক্লান্তি এল। অনেকদিন ধরে এক রুগি-স্বামীর ঘর করছে। ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। সঙ্গে অফিসের খাটুনিও যোগ হয়েছে। কিন্তু সে ক্লান্তি একরকম। অন্যদিকে আর-একটা ক্লান্তিও আছে। সেটা হল আশা বা ভরসার ক্লান্তি। ও আমাকে একদিন বলল, ইচ্ছাশক্তির জোরে মানুষ সবকিছুকে জয় করতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞানে ইচ্ছাশক্তির কোনও দাম নেই। তুমি ঠিকমতো ওষুধ খাও, চিকিৎসা করা হচ্ছে, ঠিক সেরে যাবে।
