মিসেস বোস চকোলেট থেকে পেপারব্যাক পর্যন্ত বিস্তর জিনিস ইতিমধ্যেই কিনে ফেলেছেন। হাতের মস্ত হাতব্যাগটা খুলে অত্যন্ত অসাবধানে এবং অগোছালো হাতে অন্তত গোটা কুড়ি-পঁচিশ একশো টাকার নোট এক খামচায় বের করে এনে দাম দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু টাকাগুলো গোছানো অবস্থায় ছিল না বলে দু-একটা নোট পড়ে গেল মেঝেয়। মিসেস বোস নিচু হয়ে কুড়োতে যাচ্ছিলেন, দীপ তা করতে দিল না। অত্যন্ত স্মার্ট ভঙ্গিতে নিজেই কুড়িয়ে দিল। নিচু অবস্থায় খুবই কাছাকাছি হল দু’জনের মুখ। মিসেস বোস বললেন, থ্যাংক ইউ।
দীপ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খুব দয়ালু হাতে মিসেস বোসের নোটগুলো সাজিয়ে ভাঁজ করে দেয় এবং বলে, প্লেন লেট। কফি খাওয়ার সময় আছে।
আমি এখন খাব না। ওই গরিলাটা আগে বেরোক, তারপর দেখা যাবে।
মিসেস বোস লম্বায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট। অর্থাৎ দীপের চেয়ে মাত্র ইঞ্চি তিনেক খাটো, রংটা তেমন পরিষ্কার নয়, কিন্তু ভারী ঢলঢলে আহ্লাদী এবং সুশ্রী চেহারা। বয়স নিতান্তই কম বলে একটা সতেজ আভা শরীর থেকে বিকীর্ণ হয়। দীপ জানে মিসেস বোসের অনেকগুলো মারাত্মক দোষ আছে, কিন্তু গুণের মধ্যে এই সতেজ ভাবটুকু অবশ্যই ধরতে হবে। যতবারই সে এই মেয়েটির কাছাকাছি হয় ততবারই তার অনুভূতি হতে থাকে, হাতের নাগালে একটা সাংঘাতিক হাই-ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক তার দুলছে। ছুঁলেই ঘঁাত করে মেরে দেবে। দীপ তার নিজের স্বাসের পরিবর্তন টের পায়। খাস কিছু গাঢ় ও ঘন এখন। সে বলল, উনি এখনই বেরোবেন বলে মনে হয় না, বিয়ার নিয়ে বসেছেন। কিন্তু রেস্টুরেন্টে একজন খুব ইন্টারেস্টিং লোক রয়েছেন। তেনজিং নোরকে। দেখবেন তাকে?
দ্যাট এভারেস্ট হিরো? ওঃ, ওকে আমি দেখেছি।
বলে মিসেস বোস তাঁর মস্ত হাতব্যাগটা খুলে কেনা জিনিসগুলো ভরবার চেষ্টা করতে থাকেন। স্বভাবতই দীপকে হাত লাগাতে হয়। মিসেস বোসের হাতব্যাগে জিনিস ভরে দিতে দিতে সে আনমনে তেনজিং-এর কথা ভাবছিল। বহু বছর আগে পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতে উঠেছিল লোকটা। আজ পরের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ব্যাপারটাকে অতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। তেনজিং-এর পর এভারেস্টে আরও অনেকে উঠেছে। কে তেনজিং-এর কথা অত করে মনে রাখবে? এভারেস্টের সেই মহিমাও তো আর নেই।
মিসেস বোস লাউঞ্জের একটা চেয়ারে বসে বলেন, এর আগের বার যখন এসেছিলাম, মনে আছে? আমাদের সঙ্গে প্লেনে বম্বের তিন-চার জন ফিলমস্টার ছিল? শিলিগুড়ির কোন ফাংশনে আসছিল যেন!
দীপ পাশের চেয়ারটা ফাঁক রেখে পরের চেয়ারটায় বসেছে। বলল, শিলিগুড়িতে ওরা প্রায়ই আসে। এখানে বছরে দশ-বারোটা ফাংশন হয়। কলকাতার চেয়েও বম্বের ফিলমস্টাররা শিলিগুড়িতে বেশি আসে।
ও। তা হলে এবার তারা নেই কেন?
এবারও আছে। তিলক ময়দানে বিরাট ফাংশন হচ্ছে।
ইস, তা হলে আর-একদিন থেকে গেলে হত।
মিস্টার বোসকে বলুন না!
ঠোঁটটা খুব তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উলটে মিসেস বোস বলে, ওকে বলতে বয়ে গেছে। অদ্ভুত আনসোশ্যাল লোক একটা। আপনিই দেখলাম ওর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন, আমার তো অ্যাডজাস্ট করতে ভীষণ অসুবিধে হয়।
দীপ খুব উদার গলায় বলে, কেন? মিস্টার বোস তো বেশ লোক।
মিসেস বোস চকোলেট বারের রাংতা খুলতে খুলতে বলেন, পুরুষদের কাছে পুরুষরা তো ভাল হবেই। খারাপ যত মেয়েরা।
ঠিক তা বলিনি।–দীপ একটু দ্বিধার ভাব দেখায়।
মিসেস বোস টুকুস করে এক টুকরো চকোলেট দাঁতে কেটে বলেন, পুরুষদের আসল চেহারা বোঝা যায় বেডরুমে। বাইরে সে যত বড় একজিকিউটিভই হোক না কেন, বেডরুমে তার মুখোশ খুলে যায়। বাইরের লোক তো সেটা দেখতে পায় না।
কথাটা হয়তো ঠিকই। দীপ তাই এই বিপজ্জনক প্রসঙ্গ আর ঘাটে না। চুপ করে থাকে। বোসের অল্পবয়সি সুন্দরী স্ত্রটি চকাস-টকাস শব্দ করে চকোলেট খান বটে, কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা যায় চকোলেটের স্বাদ উনি একটুও উপভোগ করছেন না। ভদ্রমহিলার আসল ভ্রু বলতে কিছু নেই। লোমগুলো খুবই নিপুণভাবে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কপালের দিকে উঁচু করে কৃত্রিম ভ্রু আঁকা। ফলে চোখের ওপরে অনেকটা মাংসের ডেলা বেরিয়ে আছে। কাছ থেকে দেখলে দৃশ্যটা তেমন সুন্দর নয়। যা হোক, মিসেস বোস এখন তার আঁকা ভ্রু কুঁচকে খুব বিরক্তির সঙ্গে সামনের দিকে চেয়ে কিছু ভাবছেন। বোধহয় মিস্টার বোস সম্পর্কে খুবই খারাপ ধরনের কিছু কথা। দীপ একবার কার্পেটটার খোঁজ নেবে কি না ভাবল। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ঠিক সাহস পেল না।
লাউডস্পিকারে ফ্লাইট টু টুয়েন্টি টু-র যাত্রীদের সিকিউরিটি এনক্লোজারে যেতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। অর্থাৎ প্লেন আর খুব বেশি দেরি করবে না। ঘোষণাটি খুব নিরুত্তাপ মুখে শুনলেন মিসেস বোস, কিন্তু নড়লেন না। অবশ্য তাড়াহুড়ো নেই, হাতে এখনও অঢেল সময় আছে।
দীপ নিঃশব্দে উঠে গিয়ে বাইরে দাঁড়ায়। ওপাশের রানওয়ে দিয়ে পর পর এয়ারফোর্সের চারটে ন্যাট গোঁ গোঁ করে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে উড়ে গেল। তারপর ফাঁকা রোদে মাখা মস্ত মাঠটা পড়ে রইল উদোম হয়ে। উত্তরে নীলবর্ণ বিশাল পাহাড়ের সারি। কাঞ্চনজঙ্ঘার রং ধূসর সাদাটে হয়ে আকাশের পিঙ্গলতায় প্রায় মিশে গেছে। তবু তার ভাঙাচোরা শীর্ষদেশের একপাশে একটা সমতল ধারে সোনালি রোদ ঝলকাচ্ছে আয়নার মতো। মুহূর্তে সব ভুলে গেল দীপ। তার ভিতর থেকে আর-একজন দীপ বেরিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে পাহাড়ের দিকে দীর্ঘ চলা শুরু করল।
