তাতে কী?
ওটা না হলে মানুষের মনের আড় ভাঙে না।
শুধু সেই জন্য?
না, আমি ভাবছিলাম, আপনি তো আমার বন্ধু হলেন, বন্ধুর একটু সেবা দিই।
বীথি কি ভাড়াটে মেয়ে?
ঠিক তা নয়। কথাটা ঠিক বুঝবেন না। ও একটু ওইরকম, কিছু মানে-টানে না।
টাকাপয়সা নেয়?
কেন, আপনার কাছ থেকে নিয়েছে নাকি?–বলে জিভ কেটে সুখেন বলল, ছিঃ ছিঃ।
না, আমার কাছ থেকে নেয়নি।
নেওয়ার কথা নয়।
আপনি বোধহয় ওর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রেখেছিলেন।
সুখেন লাজুক হেসে বলে, তাই।
কিন্তু ওর সঙ্গেই আপনার বিয়ের কথা আছে না?
আছে।
এরকম মেয়েকে জেনেশুনে বিয়ে করবেন?
সেইজন্যই তো আপনার পরামর্শ চেয়েছিলাম।
আমি পরামর্শ দেওয়ার মালিক নই।
আলবত মালিক। আমি আপনাকে বুজম ফ্রেন্ড হিসেবে মানি। যা বলবেন তা-ই হবে।
এ ব্যাপারে আমার কিছু বলা সাজে না। আমি কিছু বুঝতেই পারছি না। প্রস নয়, চাকরি করে, দেখতে সুন্দর, বড়সড় ছেলে আছে, স্বামী জেল খাটছে, সব মিলিয়ে মহিলা খুবই অদ্ভুত। আমি হলে বিয়ে করার সাহস পেতাম না।
হ্যাঁ, একটু অন্যরকম।
খুবই অন্যরকম। ওর সঙ্গে আপনি জুটলেন কী করে?
জুটে যায়।–উদাস গলায় বলে সুখেন।
বীথি এত সহজে অচেনা লোককে শরীর দেয় কী করে? ওর ঘেন্না করে না? ভয় করে না?
আপনাকে ঘেন্না?–অবাক হয়ে সুখেন বলে, আপনার মতো এরকম ভদ্রলোক ও আর পেয়েছে নাকি? আজ সন্ধেবেলাই তো আপনার কত প্রশংসা করছিল।
রাগে তেতে উঠলেও প্রশংসার কথায় একটু থমকে গেল দীপনাথ। বলল, কীরকম?
আপনার সম্পর্কে আমি যা ভেবেছি ওরও ধারণা তাই। আজ অনেকক্ষণ আপনার কথা হল।
আমি তো কিছুই নই। একটা লম্পট চরিত্রহীন।
ছিঃ ছিঃ, ওকথা বলবেন না। পুরুষমানুষের কোনও কলঙ্ক নেই।
ওটা আপনার ধারণা, আমার নয়।
তা হলে বরং আমার কান মলে দিন।-বলে বাস্তবিকই মাথাটা এগিয়ে দিল সুখেন।
সুখেনের সঙ্গে পারা যায় না। কাজেই হাল ছেড়ে দিল দীপনাথ। বীথির সঙ্গে সেই সম্পর্কের কথা ভেবে আজও সে কোনও সুখ পায় না। বরং নিজের ভিতরটা কোনও মহামূল্যবান হারানোর দুঃখে হাহাকারে ভরে ওঠে।
আর কোনওদিন সে বীথির কাছে যাবে না।
রোদের রাস্তায় আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সে ঘটনাটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিল। এই রহস্যময় নোংরা শহর তার ভাল লাগছে না। একদম ভাল লাগছে না।
৩১. হুইলচেয়ারে
তুই হুইলচেয়ারে কেন রে?
আমাকে সবাই যে রুগি বানিয়ে রাখতে চায়, কী করব বলো তো সেজদা!
তুই তো একটু-আধটু হাঁটতে পারছিলি।
এখনও কি পারি না? পারি। দেখবে?
থাক গে। বসে আছিস বসেই থাক।
সারাদিন বসে থাকি। তুমি কতকাল পরে এলে।
সময় পাই না রে। মনটাও ভাল নেই।
তোমার মনের আবার কী হল? চাকরি যায়নি তো!
না, চাকরিটা আছে।
পার্মানেন্ট হয়েছ?
এবার হয়তো হয়ে যাব।
প্রীতম খুব সুন্দর একরকম হেসে বলে, অবশ্য সেটা জেনেই বা আমার কী হবে? জাগতিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আজকাল ভাবি না।
না ভাবাই ভাল। জগৎটা তো ভাল কিছু নয়। তোর মাথায় কোনওকালেই বিষয়বুদ্ধি ছিল না। তুই ছিলি আনমনা, ফিলজফার টাইপের।
প্রীতম একমুখ হাসি নিয়ে বলল, তার মানে তো হাঁদা।
একটু লজ্জা পায় দীপনাথ। ছেলেবেলায় অন্যমনস্ক প্রীতমকে সে নিজেই হাঁদা বলে ডাকত। তাই থেকে পাড়ায় তার নামই হয়ে গিয়েছিল হাঁদা। বলল, হাঁদা থাকাই ভাল।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, এ সমাজে হাঁদার জায়গা নেই সেজদা। চার চৌকো না হলে টেকা যায় ‘না।
দীপ স্মিতমুখে বলে, তা যদি বলিস তবে আমিও তোর চেয়ে কম দা নই। তুই তবু একটা ভাল চাকরি করছিলি। আমার মতো ওপরওয়ালার ফাইফরমাশ খাটতে হয়নি তোক।
প্রীতম একটু থমকে গিয়ে বলে, ওপরওয়ালা কি তোমাকে ফাইফরমাশ করে?
বেফাঁস কথাটা বলে ফেলেছে দীপনাথ। প্রীতম তাকে এতটাই ভালবাসে যে, তার আর বোস সাহেবের আসল সম্পর্কটা জানলে দুঃখ পাবে। তাই সে তাড়াতাড়ি বলল, চাকরি করতে গেলে ওরকম একটু আধটু করতে হয় রে।
প্রীতম মাথা নেড়ে বলে, ঠিক বুঝলাম না। বুঝিয়ে বলো।
বোঝানোর কিছু নেই। ফাইফরমাশ মানে তো আর সেরকম কিছু নয়।
আগেও তুমি এরকম কিছু কথা বলেছ। তখন গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু আজ তোমার মুখ দেখে অন্যরকম লাগছে।
অন্যরকম লাগবার কী? আমি ঠিক আছি। চাকরি পাকা হলে সবই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
প্রীতম অনেকক্ষণ গুম হয়ে রিল। আস্তে হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে মেঝের ওপর খানিকটা গড়িয়ে গিয়ে ফিরে এল। বলল, শুধু চাকরিই নয়, আরও কিছু ব্যাপার ঘটেছে সেজদা। তোমার চোখ অন্যরকম।
মনে মনে প্রীতমের নজর থেকে রেহাই চাইছিল দীপনাথ। আগে ওর নজর এত তীক্ষ্ণ ছিল না। রোগে ভুগলে কি মানুষের অনুভূতি বাড়ে? বাড়ে হয়তো। দীপনাথ জানে, টি বি রোগীদের মধ্যে অনেকেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি বা শিল্পী হয়েছে। হয়তো শরীরের ক্ষয় অন্যদিকে স্নায়ুকে স্পর্শকাতর করে তোলে। সে একটু অস্বস্তিতে ভরা গলায় বলল, কিছুই পালটায়নি। তুই ভুল দেখছিস।
তুমি নিজে কিছু টের পাও না?
না তো! কী টের পাব?
আশ্চর্য! যদি সত্যি টের না পেয়ে থাকো তবে এখন থেকে খুব সাবধান হোয়ো সেজদা।
কিসের জন্য সাবধান করছিস?
প্রীতম মৃদু স্বরে বলল, যে মানুষ নিজের বশে থাকে না সে নানা অবস্থার চাপে পড়ে নানারকম মানুষের একটা সমষ্টি হয়ে দাঁড়ায়।
দূর! কথাটার মানেই বুঝলাম না।
তোমাকে কি আমি বোঝাতে পারি? তুমি চিরকালই আমার চেয়ে সবকিছু বেশি বোঝে।
চিরকালই তোর মাথায় অদ্ভুত সব কথা আসে। একবার যেন কোন মহাপুরুষের একটা কথা তুলে শুনিয়েছিলি, শয়তান আর কেউ নয়, শয়তান হল মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী ইচ্ছা। কথাটার মানে অনেক ভেবে ভেবে শেষকালে বের করেছি। অদ্ভুত কথা।
