হয়তো আছে। তুমি জানো না, আমিও জানি না।
থাকলে আছে। ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আপনার কী হয়েছে বলুন তো?
আপনার চাকরির কী হল? বস কথা দেয়নি? দিয়েছে। বলেছে হবে।
ওঁকে বিশ্বাস করবেন না। আমার দাদা হলেও বলে দিচ্ছি, ও মাল অত সহজ নয়। যা করতে চান কাগজে কলমে লিখিয়ে নেবেন।
সেইরকমই কিছু করতে হবে দেখছি।-আনমনে দীপনাথ বলে।
হ্যাঁ, ডেফিনিটলি করাবেন। আপনি একটু ভোলেভালে টাইপের আছেন। কিন্তু মনে রাখবেন আপনার বস এমন একখানা চিজ, যে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে রং পালটে ফেলবে।
দীপনাথ নিজের সম্পর্কে রঞ্জনের মন্তব্যটা শুনে সামান্য করুণার হাসি হাসে। ভোলেভালে কাকে বলে তা অবশ্য সে জানে না। তবে যদি হদা বোঝায়, তবে বলতে হবে, দীপনাথ হাঁদা নয়, আবার খুব চালাকও নয়। তার মগজের চেয়ে হৃদয় বেশি ক্রিয়াশীল, এটাই যা ঝামেলার। যথেষ্ট লোভ বা আকাঙক্ষা তার নেই। আর থাকলেও সে খুব বেশি স্বার্থপর হতে কখনও পারে না। নির্লজ্জ হতেও নয়।
রঞ্জন বলল, সেদিন হঠাৎ এক কাণ্ড হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখি সন্ধেবেলা মণিদীপা বউদি একখানা ঝরঝরে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাসায় হাজির।
দীপনাথ মণিদীপা নামটির আকস্মিক উচ্চারণে হঠাৎ কেমন স্থবির হয়ে গিয়েছিল। সামলে নিয়ে বলল, তাই নাকি?
আমরা তো সব হাঁ! জীবনে কখনও আসেনি, একমাত্র বিয়ের পর একদিন জবরদস্তি নিমন্ত্রণ খেতে আসা ছাড়া। আমাদের ঠিকানাও ওর জানার কথা নয়।
কী বলল?
সে অনেক কথা। বাবার জন্য ফল-মিষ্টি সব এনেছিল। তারপর আমাকে ডেকে খুব সেধে সেধে কথা বলল। কত মাইনে পাই, কতদিন চাকরি, পার্মানেন্ট কি না, অফিসে ইউনিয়ন আছে কি না। ফালতু বাত সব। শেষমেশ হঠাৎ আপনার কথা তুলল।
দীপনাথের গলার কাছে অস্বস্তি হতে থাকে। সে অস্পষ্ট স্বরে বলে, আমার আবার কী কথা?
প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, আমি আপনাকে চিনি কি না। চিনি বলায় জানতে চাইল, আপনি কত মাইনে পান, চাকরি পার্মানেন্ট হয়েছে কি না। এতসব ফালতু কথা। তবে শেষে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি লোকটা কেমন।
বলো কী? তুমি কী বললে?
যা সত্যি তাই বললাম। বললাম, দীপনাথ চাটুজ্জের কোনওকালে উন্নতি হবে না। লোকটার অ্যামবিশন নেই। উনিও দেখলাম কথাটা মেনে নিলেন।
দীপনাথ হাসল। মানুষ নার্ভাস হলে যেমন হাসে। তারপর বলল, আমি যে অপদার্থ এটা দেখছি সবাই জেনে গেছে। তোমার বউদি আর কী বলল?
অনেক পলিটিক্যাল পয়েন্ট তুলল। মনে হল আমাকে ওর দলে ভেড়াতে চাইছে। যাহোক ভ্যাজর ভ্যাজর অনেকক্ষণ শুনতে হল। বস কাম দাদার বউ, চটাতে তো পারি না। মনে মনে হাসছিলাম। বড়লোকদের পক্ষে গরিবদের জন্য দুঃখ বোধ করা কত সোজা। আমি নিজে গরিব হয়েও কিন্তু গরিবদের পছন্দ করি না।
দীপনাথ খামোখা লজ্জা পেল। বলল, তোমার বউদি আমার সম্বন্ধে আর কিছু বলেনি তো!
না, আর কী বলবে? আপনার কথা বলতে বলতে বিপ্লব-টিপ্লবের কথায় চলে গেল।
দীপনাথ মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হয়। মণিদীপা তাকে মুখের ওপর চুকলিখোর বলেছিল সেদিন টেলিফোনে। রঞ্জনকেও বলে দিতে পারত যে, তার সব কথা দীপনাথ মণিদীপাকে বলেছে। যা হোক এইটুকু করুণা মণিদীপা তাকে করেছে।
দীপনাথ উঠে পড়ল। বলল, বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
বাইরে আজ সাংঘাতিক রোদ। যা গরম পড়েছে!
কোনও কাজ নেই, ঘুরেই আসি। বস যদি খোঁজ করে তবে বোলো লাঞ্চের আগেই এসে যাব।
দীপনাথ বেরিয়ে এল এবং প্রচণ্ড রোদ আর গরম গলা টিপে ধরল তার।
কিন্তু শরীরের অস্বস্তি বা অসুবিধের কথা ভাবছিল না দীপনাথ। সে ভাবে তার পতনের কথা। এত সহজে তার পদস্খলন ঘটবে এটা সে কোনওদিন ভাবেনি। তার ভিতরে একটু ইস্পাত ছিল। অত প্রিয় সিগারেট সে ছেড়ে দিয়েছিল কেবল ইচ্ছাশক্তির জোরে। শরীরের জোর আসল নয়, আসল হল মনের জোর। সেদিন রাত্রে বীথির শোওয়ার ঘরে সেই জোরটা কোথায় গেল তা আজও আর খুঁজে পায়নি দীপনাথ।
ব্যাপারটার মধ্যে কোনও পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। সুখেনকেও খামোখা দোষ দিয়ে লাভ নেই। সুখেন তো আর বীথির দালাল নয়। সেই রাতের ঘটনার পর সুখেন আর ফিরে আসেনি বীথির বাসায়। একা বিকশা করে বোর্ডিং-এর ঘরে ফিরল দীপনাথ। সুখেন সে রাত্রে বোর্ডিং-এও ফিরল না। ফিরল পরদিন রাত্রে। প্রথম চোখে চোখে তাকাচ্ছিল না। দীপনাথও লজ্জায় ঘেন্নায় কেন্নো হয়ে যাচ্ছিল।
ভাগ্যি ভাল কলেজের পড়ুয়া ছেলেটা সেদিনই তার মেদিনীপুরের বাড়িতে গেছে। একা ঘরে সুখেনকে পেয়ে অনেক রাত্রে দীপনাথ বলল, ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করবেন?
সুখেন করুণ মুখ করে বলল, ব্যাখ্যার কিছু নেই। আপনার জন্য আমার খুব কষ্ট হত। তাই—
আমার জন্য কষ্ট হবে কেন? আমি কি দুঃখে আছি?
ঠিক তা বলা যায় না। তবে আপনি সেদিন বন্ধু হলেন তো! আমার আর কোনও বন্ধু নেই। আপনাকে বন্ধু পেয়ে সেদিন কী যে আনন্দ হচ্ছিল।
আমি তো তেমন কেওকেটা কেউ নই। বন্ধু হলেও অতি সাধারণ বন্ধু। রাস্তাঘাটেও এরকম আকছার বন্ধু মেলে।
যাঃ, কী যে বলেন! আপনি কত সুপুরুষ. স্মার্ট, কত সৎ মানুষ। এরকম লোক কই?
এই প্রশংসায় মোটেই খুশি হয়নি দীপনাথ। রূঢ় গলায় বলেছে, আমি যদি অত ভালই তা হলে আমাকে এরকম গাড্ডায় নিয়ে ফেললেন কেন?
বললাম যে আপনার জন্য কষ্ট হয়।
মানেটা একটু বুঝিয়ে বলুন।
সুখেন যে খুব ভাল বোঝাতে পারে তা নয়। একটু এলোমেলোভাবে বলল, দেখলেই বোঝা যায় এই বয়স পর্যন্ত আপনার মেয়েমানুষের অভিজ্ঞতা হয়নি।
