আমি কিন্তু এতকাল টের পাইনি।
তা হলে আপনি আমাদের দিকে মনোযোগ দেননি কখনও।
তা হবে।
আমাদের সমস্যাটা খুবই আন-ইমোশনাল। হার্ড ফ্যাক্ট। এর কোনও সমাধানও হয় না।
তা হলে কী হবে?
ডিভোর্স হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। আমরা হয়তো চিরকাল এমনি থেকে যাব। কিছুই বলা যায় না।
ডিভোর্স করলে মিসেস বোস কী করবেন? ওঁর পক্ষে তো আবার বিয়ে করা সম্ভব নয়।
অসম্ভব কিছু নয়। তবে আমার বিশ্বাস ডিভোর্স করলে উনি পুরোপুরি ওঁর রোমান্টিক পলিটিকস নিয়ে মাতবেন।
তারপর?
তারপর কী হবে তা নিয়ে একদিন চলুন লটারি করব।
বোসোহেব কথাটা বলেই হেসে ফেলে। সঙ্গে দীপও। বোসোহেব মাথা নেড়ে বলে, বাইরে থেকে কিছুতেই ঠিক বোঝা যায় না মিস্টার চ্যাটার্জি। আপনি ওয়েলউইশার, কাজেই আপনি তো ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করবেনই। আই নো ইউ টু বি এ ভেরি নাইস ম্যান। দুনিয়াতে ভাল লোকের খুব অভাব। আপনি সেই দুর্লভদের একজন।
দীপ একটু লাল হয়। মনে মনে ভারী ছোট হয়ে যায় নিজের কাছে। ভিতরটা ছটফট করে তার। কিছুদিন আগেও সে নিষ্কলঙ্ক ভাল লোকই ছিল। মনে পাপ থাকলেও কাজে কখনও বেচাল কিছু করেনি সে। হঠাৎ সেদিন–
মানুষ কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার সময় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলে ঠিকই, কিন্তু আমার এ কথাটা মোটেই বাড়াবাড়ি নয় দীপনাথবাবু।
বলে বোস একটু স্মিত চোখে দীনাথকে দেখে। তারপর বলে, আমি খুব ব্রড-মাইন্ডেড। মিসেস বোস যদি আমাকে অ্যাকসেপ্ট করতে পারেন তা হলে আমি সব মেনে নেব। কাজেই আমাকে কিছু বোঝাতে হবে না। আপনি বরং মিসেস বোসকে একটু ট্রাই করুন। ওই খুঁটিটাকেই নড়ানো শক্ত। তবে আপনি পারলেও পারতে পারেন। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আপনাকে পছন্দ করি। মিসেস বোসও সেদিন বলছিলেন—
অসময়ে রসভঙ্গ হল। বোসের চেম্বারের দরজা খুলে বেয়ারা ঢুকে স্লিপ দিল। ভিজিটার।
মিসেস বোস তার সম্পর্কে কী বলেছে তা শোনা হল না দীপনাথের। উঠল।
চলে যেতে যেতেই দীপনাথ একটু থমকে সংকোচ ঝেড়ে চোখ বুজে জিজ্ঞেস করল, তা হলে আমিও এই অফিসেই থাকছি তো?
বোস বিস্মিত মুখ তুলে বলে, অফ কোর্স। কোথায় আর যাবেন?
না, জিজ্ঞেস করলাম আর কী।
এ ফানি কোশ্চেন। এই অফিস তো এখন আপগ্রেডেড। আমার ক্ষমতাও বেড়েছে। আপনি অন্য কোথাও চেষ্টা করবেন না। আমি আপনার কেসটা উইথ টপ প্রায়োরিটি দেখছি।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। পাশ কাটিয়ে কোট-প্যান্ট পরা একজন ভিজিটার ঢুকে গেল চেম্বারে।
দীপনাথের আজকাল কাজ নেই। বোস ইচ্ছে করেই কাজ দিচ্ছে না। বসিয়ে বসিয়ে ভাউচারে প্রায় আটশো টাকা পাইয়ে দিয়েছে গত মাসে। হয়তো এটা তাকে খুশি রাখার চেষ্টা। তবে একজন বস-মার্কা লোকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে একটু বাধো বাধো লাগে দীপের।
সে গিয়ে আবার রঞ্জনের মুখোমুখি বসে। রঞ্জনেরও কাজ নেই। খুটখাট করে ঢিমাতালে কী যেন একটু টাইপ করছিল। দীপ বসতেই অভ্যাসবশে হাত মুঠো করে মুখের সামনে মাউথপিসের মতো ধরে বলল, কোম্পানি তা হলে জাতে উঠল?
উঠল বলেই তো মনে হচ্ছে।
আমাদের গ্রেড কী হবে শুনেছেন কিছু?
না। মোটে তো চিঠি এল। আরও ফর্মালিটি আছে।
কিছু একটা হলে বাঁচা যায়।
বিয়ে করবে নাকি?
না, না, ওসব নয়। বিয়ে একটা ফালতু জিনিস। উটকো ঝামেলা।
তবে?
তবে আবার কী? মাইনে বাড়লে সংসারের কিছু সুবিধে হবে।
সে তো বটেই।
রঞ্জন শুকনো মুখ করে বলল, চাকরি পাওয়ার পরই মা একটা ইনসিয়োর করিয়েছে দশ হাজার টাকার। সঙ্গে ব্যাংকে একটা রেকারিং ডিপোজিটও। মা তো জানে না, প্রিমিয়াম বা মান্থলি ডিপোজিট দেওয়া কত কষ্টের। ভাবছিলাম, দুটোই ছেড়ে দেব।
মাইনে তো বাড়বেই। ছেড়ো না। একটু ধৈর্য ধরো।
রঞ্জন মুঠোর আড়ালে হাসল, ওই একটা জিনিস আর শেখাতে হবে না দাদা। ধৈর্য জিনিসটা শিখেই মায়ের পেট থেকে পড়েছি। নইলে এতদিন বেঁচে আছি কী করে?
আচমকাই দীপ জিজ্ঞেস করে, তুমি কখনও পলিটিকস করোনি রঞ্জন?
আমি? না তো? তবে ছাত্র ছিলাম যখন, তখন একটু-আধটু করতাম। সেটা কিছু না। কেন বলুন তো?
এমনি আজকালকার ছেলেরা তো করে।
রঞ্জন আবার একটু হাসল। বলল, করে বটে, তবে কেরিয়ারের জন্য। আমার বয়সি ছেলেদের বেশিরভাগেরই কোনও সত্যিকারের পলিটিকস নেই। নকশালদের শুধু ছিল। আর তো সব–
কথাটা রঞ্জন শেষ করে না। বোধহয় দীপনাথের রাজনীতির বোধ সম্পর্কে কিছু জানে না বলেই সতর্ক হয়ে গেল।
দীপনাথ বলে, পলিটিকস করলে সিরিয়াসলিই করা ভাল। নইলে একদম ওটাকে এড়িয়ে চলতে হয়।
হঠাৎ পলিটিকসের কথা তুললেন যে!
আজকাল যারা পলিটিকস করে তাদের মধ্যে খুব মহৎ মানুষ কাউকে দেখতে পাই না কেন বলো তো? ভারতবর্ষে এতগুলো নেতা আছে অথচ তাদের কারও ওপব ভক্তি হয় না। এটা ভেবে খুব অবাক লাগছিল বলে তোমাকে জিজ্ঞেস করছিলাম।
ভক্তি হবে কী করে? আমি তো আপনাকে বললামই যে পলিটিকস আজকাল কেরিয়ার ছাড়া কিছুই নয়। আই এ এস বা ডব্লু বি সি এস-এর মতো, কিংবা তার চেয়েও খারাপ।
একটু অন্যমনস্কভাবে দীপনাথ বলে, কিন্তু ছদ্মবেশে কেউ নেই তো? হয়তো তেমন কোনও নেতা আছেন যিনি এখনও আমাদের কাছে তেমন পরিচিত নন, হঠাৎ দুম করে একদিন বেরিয়ে গোটা দেশের খোলনলচে পালটে দেবেন।
দাদা কি নেতাজির কথা বলছেন নাকি?
আরে না। ভাবছি, তেমন কেউ সত্যিই আছে কি না।
নেই। ওরকম কেউ থাকলে এদ্দিন চুপ করে বসে থাকত না।
