অরুণ কে তা জিজ্ঞেস করল না তৃষা। অরুণের কথা সে জানে। শুধু বলল, শহুরে লোকরা যা-ই ভাবুক, আমরা গেঁয়ো লোক ওসব মানি। বিলু অফিস থেকে কখন ফিরবে বলুন তো!
আজ রাত হবে বলে গেছে। অফিসের এক কলিগের বিয়ে।
তা হলে আমি তো আজ আর বেশিক্ষণ বসতে পারব না। শ্বশুরমশাই আমাকে কিছুক্ষণ না দেখলেই অস্থির হয়ে পড়েন।
আর-একটু বসুন বউদি। আপনার সঙ্গে কথা বললেই ভাল লাগে।
বসল তৃষা। কয়েকবার চা খেল। খাবারও খেতে হল। লাবুর জন্য একটা সোনার হার এনেছিল। লাবু ওঠার পর সেটা তার গলায় পরিয়ে আদর করল একটু। সন্ধের বেশ কিছু পরে যখন উঠল, তখন প্রীতমকে খুবই উজ্জ্বল এবং আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। তৃষা বলল, তাড়াতাড়ি রোগটাকে মেরে তাড়িয়ে দিন।
আবার কবে আসছেন?
আসব। শিগগিরই আসব। গিন্নিটাকে তৈরি থাকতে বলবেন। এবার এসে একবেলা থেকে খেয়েদেয়ে যাব।
বিশ্বাস হয় না। তবে শুনতে ভাল লাগল।-বলে প্রীতম স্নিগ্ধ হাসে।
দেখবেন।-বলে তৃষা উঠে পড়ে।
রতনপুরে গাড়ি থেকে তৃষা আর সনিং যখন নামল তখন রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেছে। রিকশা তৈরি ছিল। উঠে পড়ল দুজনে।
তেমাথা পেরিয়ে রিকশা যখন সাঁই সাঁই করে ছুটছে তখন বটতলায় একটা ভিড় দেখে তৃষা বলল, ওরে, রিকশা থামা! থামা!
বটতলার বাঁধানো চত্বর ঘিরে অন্তত জনা কুড়ি লোক বুঝকো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। একটা লোক চত্বরের ওপর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে, ওই মাগিকে যতক্ষণ না দেশছাড়া করতে পারছ ভাইসব, ওর ভাইটাকে যতক্ষণ না চিতায় তুলছ ততক্ষণ তোমরা সব শুয়োরের বাচ্চা…
সরিৎ মৃদু স্বরে বলল, জামাইবাবু।
জানি। তুই নেমে যা।
কিছু করতে হবে?
না, শুধু কী বলছে শুনে আসবি। আমি চললাম।
রিকশা চলে গেল। সরিৎ চিতাবাঘের পায়ে গিয়ে বটতলার ভিড়ে মিশে গেল।
৩০. বোসোহেবের মুখে খুব ছেলেমানুষি হাসি
আজ বোসোহেবের মুখে খুব ছেলেমানুষি হাসি দেখল দীপ। একটা ভোলা টাইপ করা চিঠি টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে বোস বলে, ম্যানেজমেন্ট আমার প্রোপোজাল মেনে নিয়েছে।
দীপ চিঠিটা ভদ্রতাবশে তুলল, তাকিয়ে দেখল, কিন্তু পড়ল না। তার দরকারও নেই। চিঠিটা আবার টেবিলে রেখে দিয়ে বলল, তা হলে বাঙ্গালোরে?
ইটস ড্রপড ন্যাচারেলি।
ভাল।—খুব উদাস গলায় বলে দীপনাথ।
খুশি হলেন না?
দীপ একটু অবাক হয়ে বলে, আমার খুশি-অখুশির ব্যাপার তো নয় বোসোহেব।
কিন্তু আপনি বোধহয় চেয়েছিলেন আমি বাঙ্গালোরে না যাই।
দীপ মাথা নেড়ে বলে, ঠিক তা নয়। তবে আমি নিজে যেতে চাইনি।
বোস একটু যেন ম্লান হয়ে বলে, তাই হবে। আমিই হয়তো ভুল ভেবেছিলাম।
দীপ স্থির চোখে চেয়ে বলে, আর-একজনও বোধহয় চাননি। মিসেস বোস।
ওর কথা বাদ দিন। ওদিকটা নিয়ে আমি ভাবছি না। মিসেস বোসও আপনার মতোই। আমি যাই ক্ষতি নেই, তবে উনি যাবেন না।
দীপনাথ এসব কথায় খুশি হচ্ছে না। বোস সাহেব বলেছিল, কোম্পানি আপগ্রেডেড হলে তাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার করা হবে। সে বিষয়ে বোস এখনও কিছু বলেনি। দীপ চক্ষুলজ্জায় নিজেও মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। সে শুধু বলল, আপনি বাঙ্গালোরে না গেলে মিসেস বোসের সঙ্গে আপনার ব্রিচটা আবার মিলে যাবে।
থ্যাংকস ফর ইয়োর ইনফরমেশন, মিসেস বোসের সঙ্গে আমার কোনও ব্রিচ নেই।
যাক, দাম্পত্য কলহ তা হলে মিটেছে। দীপ নিশ্চিন্ত হয়ে একটু শ্বাস ছাড়ে।
কলহও মেটেনি। যারা কখনও কোনওদিন জোড়া লেগেছিল তাদের মধ্যেই ব্রিচ হয়। আমরা কোনওদিনই’ ততটা ঘনিষ্ঠ নই।
দীপনাথ এর কী জবাব দেবে? তবু ভেবেটেবে বলে, মনের মিলটা তো স্বর্গ থেকে হয়ে আসে না। ওটাও আমার মনে হয় প্র্যাকটিসের ব্যাপার।
বোসোহেব মিসেস বোসের প্রসঙ্গ আজকাল একদম পছন্দ করে না। তবু এ কথায় খুব কৌতুকের মুখ করে বলে, সেটা কীরকম?
এক সময়ে ভালবাসা হত প্লাবনের মতো, ঝড়ের মতো চোখাচোখি হতে না হতেই প্রেম। কিন্তু সে যুগ তো আর নেই। এখন কেউ চোখ বুজে ভাবাসে না। তবে ভালবাসার চেষ্টা করতে করতে একদিন হয়তো বেসে ফেলে।
কথাটার মধ্যে একটা হয়তো থেকে যাচ্ছে দীপনাথবাবু!
তা থাকছে। আজকাল খবরের কাগজে এত বউ খুনের কথা পড়ি যে ভালবাসার মধ্যে একটা হয়তো আপনা থেকেই এসে যায়।
বউ খুনের ঘটনা পড়েন। কিন্তু বর খুনের কথাও যে আছে। সেটা খবরের কাগজে বেরোয় না। আর সত্যিকারের ফিজিক্যাল খুনও ঘটে না। কিন্তু এক ধরনের মানসিক স্লো-পয়জনিং ঘটে। তাতে পুরুষদের ভিতরটা আস্তে আস্তে মরে যায়।
বলে বোস একটু হাসে। খুবই ম্লান, মড়ার মুখের হাসির মতো হাসি। এয়ার কন্ডিশনারের মৃদু শব্দটা না থাকলে এখন ঘরখানা খুবই নিস্তব্ধ লাগত দীপনাথের। কারণ তার নিজের ভিতরটাও এ সময়ে বড় নিস্তব্ধ। মুখে কোনও কথা আসছে না।
অনেকক্ষণ বাদে বোস সাহেব বলল, আপনি তা জানেন? জানেন না। আপনি তো আবার বিয়ে করেননি, এসব অভিজ্ঞতাও নেই।
দীপনাথ মৃদু স্বরে বলে, আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে অবশ্য আমার নাক গলানো উচিত নয়।
বোস মাথা নেড়ে বলে, ইউ আর এ ফ্যামিলি-ফ্রেন্ড, দেয়ারফোর ইউ আর উইদিন আওয়ার ফ্যামিলি। নাক গলালে দোষ দেব না। কিন্তু মুশকিল হল, আমাদের প্রবলেমটার মধ্যে কোনও মিষ্ট্রিও নেই। একদম খোলাখুলি গরমিল। কোনও প্যাঁচওয়ার্কও নেই। বয়-বেয়ারা-বাবুর্চি থেকে শুরু করে বাইরের লোকও সবাই জানে।
