অচলা মৃদু হেসে বলে, চা খেয়ে নিন। আমি ততক্ষণে ভিতরের ঘরটা গুছিয়ে নিচ্ছি। নইলে তো আপনি আবার রাগ করবেন।
এ কথায় মেয়েটিকে ভাল লেগে গেল তৃষার। সে মুখ টিপে একটু হেসে বলল, হ্যাঁ। অগোছালো দেখলে আমার খুব রাগ হয়। ঘরদোরের সিজিল মিছিল থেকে সে ঘরের লোকেরা কেমন তা বোঝ যায়।
তা তো ঠিকই। তবে আমার কাজ শুধু বাচ্চা রাখা। ঘরের কাজের জন্য অন্য লোক আছে।
তা তো থাকবেই। তবে কাজের লোক রাখলেই তো হয় না। লোককে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতেও জানা চাই। সেটা সবাই পারে না। তোমার দোষ দিচ্ছি না। তবে বাপু তোমাকেই বলি, এ বাড়িতে যখন কাজে ঢুকেছ তখন তুমিও এ বাড়ির লোক। আপন মনে করে একটু চারদিকে নজর রেখো। শুধু মাইনের কেনা লোক হয়ে থাকলে কোনওদিন কোথাও ভালবাসা পাবে না।
এসব কথা অন্যে বললে অচলা হয়তো চটে যেত। সে বহু বাড়িতে বাচ্চা রাখার কাজ করেছে, বহু গিন্নিকে চরিয়ে খেয়েছে। কিন্তু এই বউদির কথাগুলোর মধ্যে এমন একটা জোর আর ভালবাসা আছে যে অচলার রাগ তো হয়ই না, বরং ভক্তি এসে পড়ে। সে শুনেছে রতনপুরের বউদির অনেক সম্পত্তি, অনেক টাকা। কিন্তু দেখে তা মনে হয় না। সাদা খোলের সাধারণ শাড়ি পরা, মুখে রূপটান নেই। কালো হলেও চেহারাখানা কী! এত সুন্দর যেন অচলা জীবনে দেখেনি। কথা বলার ঢঙটাও এত ভাল যে, বকলেও শুনতে ইচ্ছে করে।
চা খেতে খেতে তৃষা অচলার মুগ্ধ ভাব লক্ষ করছিল। সারা জীবনে তৃষা এইসব মানুষের ভালবাসা অঢেল পেয়েছে। এখনও যেসব কাজের লোক তার বাড়িতে আছে তারা এক কথায় তার জন্য প্রাণ দিতে পারে। বৃন্দাকে ডবল মাইনে দিয়ে নিতে চেয়েছিল বাজারের পুরনো মহাজন পোদ্দাররা। বৃন্দা তো যায়ইনি, তার ওপর ক্যাট ক্যাট করে দু’ কথা শুনিয়ে দিয়ে এসেছে। কিন্তু এসব লোকের ভালবাসা পেলেও তার জীবনে কোথাও একটা ভালবাসার অভাবও কি নেই? তৃষা জানে, তার তিন মেয়ে আর ছেলে তাকে ততটা ভালবাসে না যতটা স্বাভাবিক নিয়মে ছেলেমেয়েদের মাকে ভালবাসা উচিত। এই অভাববোধটা এতকাল তাকে কষ্ট দেয়নি। আজকাল মাঝে মাঝে কথাটা মনে হয়। নিজের পরিবারের কারও ভালবাসাই বোধহয় তৃষা কোনওদিন পাবে না। তাকে একমাত্র সত্যিকারের ভালবেসেছিল একজন। সেই তার একমাত্র প্রেমিক, একমাত্র উপাস্য, যার কথা ভাবলে আজও মন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। সে মল্লিনাথ।
বাইরের চেহারায় তৃষার কোনও ভাবপ্রবণতা নেই, আবেগ নেই, আদিখ্যেতা নেই। তার জীবনে। ভালবাসার চর্চাও তেমন কিছু নেই। কিন্তু ভিতরে ওই একটা জায়গায় সে আজও দুর্বল। রতনপুরের বাড়িতে প্রকাশ্য জায়গায় মল্লিনাথের কোনও ছবি নেই। বেশি ফটোগ্রাফ মল্লিনাথের ছিলও না। অনেক কুড়িয়ে বাড়িয়ে গোটা দশেক ছবি জোগাড় করতে পেরেছে তৃষা। আলাদা একটা অ্যালবামে সেঁটে সেগুলো নিজস্ব স্টিলের আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছে। এখনও মাঝে মাঝে গোপনে বের করে দেখে। যত দিন যাচ্ছে তত ধীরে ধীরে মল্লিনাথের ওপর শ্রদ্ধা বাড়ছে তার। মৃত ভাসুর মল্লিনাথকে ভালবাসা পাপ কি না কে জানে। তবে এই পাপটুকু তৃষা করে যাবে।
ভিতরের দরজার পরদা হঠাৎ সরে যেতেই তৃষা চায়ের কাপ রেখে উঠে গিয়ে প্রীতমের হাত ধরল, অনেকক্ষণ বাইরের মানুষের মতো বৈঠকখানায় বসে আছি। আর নয়, এবার অন্দরমহলটায় ঢুকতে দিন।
প্রীতম স্নিগ্ধ হাসিতে মুখ আলো করে বলল, আপনার কথা এত ভাবি কী বলব! আজকাল সকলের কথা ভাবি।
যাক, আর বানিয়ে বানিয়ে খোশামোদ করতে হবে না নন্দাইমশাই। চলুন কথা বলি।
প্রীতমকে তার বিছানায় বসিয়ে পাশে বসে তৃষা। বলে, কবে রতনপুর যাবেন বলুন তো? দিন ঠিক করুন, আমি নেওয়াবার ব্যবস্থা করব।
নিয়ে কী হবে? আমার যে চিকিৎসা চলছে। গিয়েও তো থাকতে পারব না, বিলু আবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসবে।
আনবেই তো। অসুখ হয় কেন?
সে কি আমার দোষ?
সেসব জানি না। অসুখ শিগগির সারিয়ে ফেলুন।
সারাবার মালিকও কি আমি?
সব আপনি। মানুষ ইচ্ছে করলে সব পারে।
বউদির যে কেমন সব কথা!–বলে উজ্জ্বল মুখে একটু হাসে প্রীতম। এই একজন লোক, যে এ কথা বলল।
মেয়ে কোথায়?
পাশের ঘরে।
দাঁড়ান দেখে আসি।
বলে তৃষা উঠে গেল। ফিরে এসে বলল, অচলা ওকে ঘুম পাড়িয়েছে বুঝি। কপাল আমার, মটকা মেরে পড়ে চোখ পিট পিট করছে। আমাকে দেখেই চোখের পাতা টাইট করে বন্ধ করল।
প্রীতম হাসল। বলল, আপনি এলে কী যে ভাল লাগে! দাদাকে সঙ্গে আনলেন না?
বেশ বলেছেন ভাই। দাদাকে সঙ্গে আনব কী, বরং আপনার দাদার সঙ্গেই তো আমার আসার কথা।
ওই হল।
আমি তাঁর নাগালই পাই না। কলকাতায় চাকরি করতে আসেন কোন সকালে, ফেরেন রাত্রে।
একদিন আমাকে দেখতেও এলেন না।
মানুষটা একটু ওইরকম।
আপনি এতদিন বাদে দোষ কাটাতে এলেন?
তৃষা হেসে বলে, রতনপুরে চলুন, দেখবেন আমাকে সকাল থেকে সংসার কেমন নাকে দড়ি দিয়ে ঘোড়াচ্ছে। তখন উলটে বোধহয় আমার জন্য মায়া হবে।
প্রীতম খুশি হচ্ছিল। তৃষা বউদি একবারও তার শুকিয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে একটুও মন্তব্য করেননি। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আপনি ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাস করেন বউদি?
ওমা! কেন করব না? আমি নিজেই তো ভাই ইচ্ছের শক্তিতে চলি। আমার তো আর কোনও ক্ষমতা নেই।
বিমর্ষ মুখে প্রীতম বলে, কিন্তু বিলু করে না। বিলুকে অরুণ বুঝিয়েছে, অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তির কোনও দাম নেই।
